সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগের শরণখোলো চাঁদপাই রেঞ্জ এখন শিকারিদের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সুন্দরবনের মায়াবী হরিণ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী এদের কাছে হুমকির মুখে। উপকূলীয় এলাকার সংঘবদ্ধ শিকারি চক্র চোরাগুপ্তা পন্থায় আবার অনেকে জেলে সেজে পাস (অনুমতি) নিয়ে বনে ঢুকে ফাঁদ পেতে নির্বিচারে হরিণ শিকার করছে। শিকারিদের ফাঁদে শুধু হরিণই নয় আটকা পড়ছে বন্য শূকর ও বাঘ। গত মে ২০২৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ১০ মাসে বন বিভাগের কর্মীরা অভিযান চালিয়ে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩৫২টি ট্রলার ৭৫ হাজার ফুট হরিণ ধরার ফাঁদ, ২৪২ কেজি হরিণের মাংসসহ ৩১৪ জন অপরাধীকে ধরতে সক্ষম হয়েছে। বনরক্ষীরা শিকারিদের প্রতিহত করতে অভিযান অব্যাহত রেখেছেন।
জানা গেছে, গত ১০ মাসে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বনরক্ষীরা প্রায় ৭৫ হাজার ফুট হরিণ ধরার মালা ফাঁদ, ২৪২ কেজি হরিণের মাংস, ৩৫২টি ট্রলার ও নৌকা, ৮১৬ কেজি কাঁকড়া, ৫ হাজার কাঁকড়া ধরার চারু, ২৩১টি মাছ ধরার জাল, ২২ বস্তা শুঁটকি মাছ জব্দ করেছে। এ সকল অভিযানে জীব-বৈচিত্র্য ধ্বংস করার অভিযোগে ৩১৪ জনকে আটক করে বন আইনে মামলা দিয়ে বাগেরহাট জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বন বিভাগ জানায়, শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের দুবলা, আলোর কোল, কটকা, কচিখালী, ডিমেরচর, সুপতি, ছাপরাখালী, শ্যালা, নারকেলবাড়িয়া, মরাপশুরসহ এসব এলাকার চর ও সুন্দরবনের ভেতরে বিভিন্ন এলাকায় হরিণ শিকারসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। হরিণের মাংস বিক্রি ছাড়াও কাঁকড়া ধরতে টোপ হিসেবে অনেক জেলে হরিণ ও শূকর মেরে মাংস ব্যবহার করছে। অনেক সময় হরিণ শিকারের ফাঁদে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীও আটকা পড়ে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ সকল অপরাধীরা হলো উপকূলীয় অঞ্চল বাগেরহাটের শরণখোলা, মোড়লগঞ্জ, মোংলা, রামপাল। অন্যদিকে পাথরঘাটার চরদোয়ানী, বরগুনা ও পদ্মা সুলিজ এলাকার। এ ছাড়া সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা রয়েছে। দীর্ঘদিন সুন্দরবনের সুরক্ষা বিষয়ক ভিলেজ টাইগার রেসপন টিম শরণখোলা উপজেলা শাখার ফেসিল্যাটেটর হিসেবে কর্মরত মো. আলম হাওলাদার জানান, গত প্রায় ২ বছর ধরে সুন্দরবনের হরিণ নিধন প্রায় তিনগুণ বেড়ে গেছে। শিকারিদের ফাঁদে শুধু হরিণই ধরা পড়ছে না বনের প্রধান প্রাণী বাঘও আটকা পড়ছে। চোরা শিকারিদের প্রতিহত করা না গেলে সুন্দরবনের প্রাণীকুল হুমকির মুখে পড়বে।
উল্লেখ্য, ৪ঠা মার্চ রাতে বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার হরিণঘাটা এলাকার জঙ্গলে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে ১৬০ কেজি ওজনের দুইটি জবাইকৃত হরিণসহ হানিফ (৪৪) নামে এক হরিণ শিকারিকে আটক করেছে যৌথ বাহিনী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুন্দরবন সংলগ্ন শরণখোলা উপজেলার সোনাতলার গ্রামের বাসিন্দা বলেন, সুন্দরবনে বন্যপ্রাণী নিধন এ শুধু শিকারি চক্রকে দোষী করলে হবে না এদের সঙ্গে বন বিভাগের একদল অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী জড়িত রয়েছে। তাদেরকে চিহ্নিত করতে না পারলে হরিণ শিকার বন্ধ হবে না। সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বন্যপ্রাণী রক্ষায় বনরক্ষীরা সদা তৎপর রয়েছে। তিনি আরও বলেন, পূর্ব সুন্দরবনে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করার পর থেকে সুন্দরবনে অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে বনবিভাগ। এ ধরনের অভিযান সারা বছর অব্যাহত থাকবে।
এক বছরে সুন্দরবনে ৩৫২ ট্রলার, ৭৫ হাজার ফুট ফাঁদসহ আটক ৩১৪
আ. মালেক রেজা, শরণখোলা (বাগেরহাট) থেকে
৬ মার্চ (শুক্রবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
