যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সাম্প্রতিক ঢাকা সফর কেবল একটি নিয়মিত কূটনৈতিক সফর নয়; বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের একটি ইঙ্গিত বহন করে। মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, এই সফরের উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ কৌশলগত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করা। তবে বাস্তবে এই সফরকে কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আলোচনায় সীমাবদ্ধ রেখে দেখলে পুরো বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না। দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রেক্ষাপটে এই সফরের তাৎপর্য অনেক বেশি।
ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে পল কাপুর সংক্ষিপ্তভাবে বলেছেন, আলোচনা ‘ভালো হয়েছে’। আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষায় এমন সংক্ষিপ্ত মন্তব্য অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে যখন আলোচনায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, কৌশলগত অংশীদারত্ব কিংবা সংবেদনশীল নিরাপত্তা বিষয় থাকে, তখন কূটনীতিকরা প্রকাশ্যে বিস্তারিত মন্তব্য করা থেকে সচেতনভাবেই বিরত থাকেন।
এই সফরকে ঘিরে আলোচনায় উঠে এসেছে আকসা (ACSA) এবং জিসোমিয়া (GSOMIA) ধরনের সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়। এসব চুক্তি সাধারণত সামরিক লজিস্টিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনা এবং সংবেদনশীল সামরিক তথ্যের নিরাপদ বিনিময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশ্বের অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তিতে আবদ্ধ। ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন আলোচনার বিষয় সামনে আসা অস্বাভাবিক নয়।
তবে বিষয়টি শুধু প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রশ্ন নয়। এটি মূলত দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত। গত এক দশকে দক্ষিণ এশিয়া বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত এবং আংশিকভাবে রাশিয়াও এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
ভারত ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছে এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান ঐতিহ্যগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হলেও সাম্প্রতিক সময়ে চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর প্রকল্প তারই একটি বড় উদাহরণ।
শ্রীলঙ্কা সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটের পর আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং সেখানে ভারত, চীন ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রভাব নিয়ে প্রতিযোগিতা স্পষ্ট। নেপাল দীর্ঘদিন ধরেই ভারত ও চীনের মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। মালদ্বীপেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশনীতি নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অর্থনীতি এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সমুদ্রপথ, দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান এবং দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি সব মিলিয়ে দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে।
তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি সবসময়ই ছিল ভারসাম্য রক্ষা। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এই নীতি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পথনির্দেশনা হিসেবে কাজ করেছে। বাস্তবে এই নীতি অনুসরণ করা সহজ নয়, বিশেষ করে যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতি ক্রমশ মেরুকরণের দিকে যাচ্ছে।
চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন অংশীদার। বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে ভারত বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতা ক্রমশ বাড়ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার এবং উন্নয়ন সহযোগী।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কোনো একটি শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে গিয়ে অন্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট না করা। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হলেও সেটি কতটা এগোবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কৌশলগত সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পল কাপুরের সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক সহযোগিতা। সফরকালে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে তার বৈঠকের কথা বলা হয়েছে। এসব আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
বিশ্ব অর্থনীতি যখন নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বহুমুখী অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলও এই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে এই অঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব বাড়াতে চায়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে বাংলাদেশের জন্য এখানে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। কারণ ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা স্পষ্ট। বাংলাদেশের জন্য তাই প্রয়োজন এমন একটি অবস্থান, যা দেশের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে, কিন্তু কোনো বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতায় সরাসরি জড়িয়ে পড়বে না।
দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান বাস্তবতাও বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। এই অঞ্চলের অনেক দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থান বজায় রাখতে পারলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সংযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পল কাপুরের ঢাকা সফর দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতিফলন। এটি বাংলাদেশের সামনে নতুন সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে, আবার একই সঙ্গে নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জও তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতার মধ্যে নিজের কৌশলগত স্বার্থকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা। বিচক্ষণ কূটনীতি, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং আঞ্চলিক বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গিই পারে এই পথকে সুগম করতে।
দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো তাই কেবল একটি দেশের নয়, পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ই-মেইল: [email protected]
দক্ষিণ এশিয়ার নতুন সমীকরণে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য
সহিদুল আলম স্বপন
মত-মতান্তর
৩ মাস আগে
৫ মার্চ (বৃহস্পতিবার), ২০২৬, ১০ঃ৫৯ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
