বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, ব্যাংক খাতে অস্থিরতা এবং রপ্তানিতে মন্থরতার কারণে অর্থনীতি এখন চাপে রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে দ্রুত ও বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই। পাশাপাশি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানো এবং প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখতে অন্তর্বর্তী সরকারের নেয়া সংস্কার উদ্যোগগুলো নতুন সরকারকেও অব্যাহত রাখতে হবে। নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা না গেলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বুধবার রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন: স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার’- শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এমন অভিমত ব্যক্ত করেছে সিপিডি। বৈঠকটি যৌথভাবে আয়োজন করে সিপিডি ও ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সঞ্চালনা করেন সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং এলডিসি-পরবর্তী কৌশল প্রণয়ন- এসব ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে। তাদের মতে, অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক আভাস থাকলেও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি এখনও নাজুক। তাই ঘুরে দাঁড়াতে হলে বড় ও গভীর সংস্কার এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এ ছাড়া নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আস্থা ফিরিয়ে আনা। নতুন সরকারের সামনে তাই সময় কম, কাজ বেশি। এখন নেয়া সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতি কোন পথে এগোবে।
মূল প্রবন্ধে ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমান সময় নীতি পুনর্বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারলে স্থিতিশীলতার পাশাপাশি টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন ভাঙনের মুখে নয়, কিন্তু চাপের বৃত্তে আটকে আছে। সঠিক সময়ে সঠিক সংস্কার হলে পুনরুদ্ধারের যে আভাস দেখা যাচ্ছে, তা শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়াতে পারে। অন্যথায় প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা্ত সব ক্ষেত্রেই চাপ আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে, মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ অস্বস্তিকর পর্যায়ে এবং বেসরকারি বিনিয়োগে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা স্পষ্ট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের চাপ এবং রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রভাব। সামনে আবার এলডিসি উত্তরণ। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা যদি নীতির ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছতা না পান, তাহলে তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে এগোবেন না। একইভাবে সাধারণ মানুষ যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ে অনিশ্চিত থাকেন, তাহলে ভোগব্যয়ও সীমিত থাকবে। তাই মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি ও বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সিপিডি বলেছে, ২০২৫ অর্থবছরে বাস্তব জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৩.৪৯ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪.২ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এই নিম্নমুখী ধারা কেবল একটি সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়; এটি অর্থনীতির ভেতরের গতি কমে যাওয়ার প্রতিফলন। শিল্প খাতে উৎপাদন সমপ্রসারণ প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি, সেবা খাতে ভোগব্যয় কমেছে এবং বিনিয়োগের নতুন প্রকল্প গ্রহণে অনীহা দেখা গেছে। তবে ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ৪.৫০ শতাংশে ওঠায় বোঝা যায় যে অর্থনীতি পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েনি। আগের বছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ২.৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ নিম্নভিত্তি প্রভাব ও কিছু পুনরুদ্ধার মিলিয়ে একটি সাময়িক গতি তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই গতি কি টেকসই হবে, নাকি আবারও মন্থর হয়ে পড়বে।
প্রবন্ধে আরও বলা হয়, মূল্যস্ফীতির চিত্রও একইভাবে দ্বৈত। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৬৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকলে মানুষের প্রত্যাশাও বদলে যায়, বাজারে দাম স্থিতিশীল হলেও ভোক্তার আস্থা সহজে ফেরে না। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮.১২ শতাংশে আটকে আছে। অর্থাৎ আয় ও ব্যয়ের মধ্যে যে সামান্য ফাঁক তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবে পরিবারের সঞ্চয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতি কেবল সামাজিক চাপ নয়, প্রবৃদ্ধির ওপরও প্রভাব ফেলছে।
সিপিডি বলেছে, রাজস্ব পরিস্থিতিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত কমে ৬.৭৮ শতাংশে নেমেছে। দেশীয় ও বৈদেশিক দুই ধরনের ঋণই বেড়েছে। যদিও এখনো ঋণঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি, তবে সুদের বোঝা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যৎ বাজেটে ব্যয় সংকোচনের চাপ তৈরি হতে পারে।
শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা ও ইন্টারন্যাশনাল চেম্বারস অব কমার্স বাংলাদেশ (আইসিসি)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে আজাদ বলেন, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দেশের অর্থনীতি ভালো অবস্থায় ফিরে আসবে না। বর্তমানে গড় ঋণখেলাপির হার ৩৬ শতাংশ ও সরকারি ব্যাংকগুলোতে তা প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। এই টাকাগুলো কারা নিয়েছে? যারা টাকা নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর হস্তে ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে অর্থনীতি ভালো জায়গায় আসবে না। এ কে আজাদ বলেন, সরকার ব্যাংক থেকে ৩২.১৯ শতাংশ ঋণ নিচ্ছে, সেখানে প্রাইভেট সেক্টরের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.১ শতাংশ। মানে আমার জন্য টাকা নাই বা থাকলেও আমি নিতে পারছি না। গ্যাস কানেকশন নাই। সরকারের মোট ঋণের ৫৮ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে বেতন, সুদ ও ভর্তুকিতে যা নন-প্রোডাক্টিভ খাতে। রাজস্ব আদায় কমছে। ছয় মাসেই ৩৬ হাজার কোটি টাকা টার্গেটের চেয়ে কম রাজস্ব এসেছে। জিডিপি ৩.৯৭ নেমে এসেছে। বিনিয়োগ নাই, ভ্যাট নাই, ইনকাম ট্যাক্স নাই, কাস্টম ডিউটি নাই তাহলে উন্নয়ন হবে কীভাবে? তিনি দাবি করেন, ১০ শতাংশ গ্যাস চোরাই লাইনে যাচ্ছে এবং গুড গভর্ন্যান্সের বিকল্প নেই। আইনের শাসন যথাযথ প্রয়োগ করতে না পারলে, সরকারি ব্যয় কমাতে না পারলে সংকট কাটবে না।
আলোচনায় ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, কোনো নীতি বা পরিকল্পনার সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে বাস্তবায়নের ওপর। আপনি যত পরিকল্পনাই করুন না কেন, শেষ পর্যন্ত সবকিছু নির্ভর করে বাস্তবায়নের ওপর। তার মতে, দেশে অনেক ভালো নীতি বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসে নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও বিলম্বের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াগত বাধা অনেক সময় উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত করে। এতে সময়ের পাশাপাশি ব্যয়ও বেড়ে যায়। তাই সবার আগে আমলাতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করাই নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বর্তমান সরকারের অর্থনীতির প্রধান লক্ষ্য হলো- গতানুগতিক ভোগভিত্তিক প্রবৃদ্ধি থেকে সরে এসে বিনিয়োগভিত্তিক টেকসই অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তোলা। তিনি জানান, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঋণের যে পাহাড় গড়ে উঠেছে, তা অর্থনীতিকে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ফেলেছে। এই সংকট উত্তরণে সরকার অপচয় রোধ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তনের ওপর জোর দিচ্ছে। উপদেষ্টা আরও বলেন, সামাজিক সুরক্ষায় স্বচ্ছতা আনতে আমরা ?‘ওয়ান সিটিজেন ওয়ান কার্ড’ ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছি, যা ডিজিটাল অবকাঠামোর মাধ্যমে সহায়তার ক্ষেত্রে অপচয় কমাতে সাহায্য করবে। জ্বালানি খাতের অস্বচ্ছতা নিয়ে তিনি জানান, বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি কমিয়ে আনতে ‘রিনেগোশিয়েশন’ এবং ‘সিস্টেম লস’ কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন-মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) ভাইস চেয়ারম্যান সাদিক আহমেদ, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ, বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম. মাসরুর রিয়াজ।
