মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় রমজান মাসে সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহার এবং ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহারের অনুরোধ জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে অনুরোধ জানিয়ে সবার সহযোগিতা কামনা করেছে মন্ত্রণালয়। গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এটি জানানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে সারা বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এর ফলে অনিবার্যভাবে দেশের জ্বালানি খাতেও সাময়িক সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে। জ্বালানি সরবরাহ হ্রাস পেতে পারে বা সাময়িক সমন্বয় করার প্রয়োজন হতে পারে, যার প্রভাবে বিদ্যুৎ ও সারের উৎপাদন কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে। খোলাবাজারে ডিজেল, পেট্রোল বিক্রি না করার জন্য ব্যবসায়ীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক হতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও বলা হয়, প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে জ্বালানি পাচার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ইতিমধ্যে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জ্বালানি সংকট পরিস্থিতি মোকাবিলায় আজ সকালে জরুরি সভা করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। সভায় জানানো হয়, জ্বালানির সম্ভাব্য উৎসসমূহ থেকে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে ও সঠিক সময়ে জ্বালানির সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার জন্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। জ্বালানি সংগ্রহ স্বাভাবিক রাখতে সব উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব, বিপিসি’র চেয়ারম্যান, পিডিবি’র চেয়ারম্যানসহ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। সাময়িক সংকট মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগ সফল করার জন্য জনগণকে ধৈর্য ধারণ করে সর্বাত্মক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
এদিকে গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হাতে থাকা জ্বালানি সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহার করতে হবে, এটাই বাংলাদেশের বিকল্প বলে জানিয়েছেন। কম ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার, আলোকসজ্জা পরিহারসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে জনগণকে সাশ্রয়ী হওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। এর আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠক করেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি পরিস্থিতির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, আমাদের যেটুকু আছে, সেটা দিয়ে আমরা কীভাবে সাশ্রয়ীভাবে চালাতে পারি সেটা আলোচনা করলাম। আমরা মন্ত্রণালয় থেকে এই ব্যাপারে একটা প্রেস রিলিজ দেবো। তিনি বলেন, আমার হাতে যে জ্বালানি আছে সেটাকে সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহার করতে হবে, এটাই হচ্ছে আমাদের বিকল্প। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমার সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক না হবে, যেটা আছে সেটাকে আমরা সাশ্রয়ীভাবে চালানোর চেষ্টা করছি। যুদ্ধ যতদিন থাকবে ততদিন তো এই সংকটটা থাকবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা একটা ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট করছি। মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সামপ্রতিক ঘটনাবলীর কারণে সারা পৃথিবীতে জ্বালানির একটা ক্রাইসিস সৃষ্টি হয়েছে। আমাদেরও শর্টেজ দেখা দিয়েছে। যেসব কমিটমেন্ট ছিল, সেগুলোর কিছু আসা বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি, এই মুহূর্তে তারা আমাদের কী ধরনের কো-অপারেশন করতে পারে। আমরা তাদের জানিয়েছি, আমরা দীর্ঘমেয়াদে একসঙ্গে কাজ করতে চাই। আর এই ক্রাইসিস পিরিয়ডে সাপোর্টের জন্য আমরা অনুরোধ করেছি। তারা বলেছে, আলোচনা করে আমাদের জানাবে। মন্ত্রী বলেন, আমরা স্পট পারচেসে গেছি, কিন্তু প্রত্যাশিত রেসপন্স পাচ্ছি না। এখন আমরা মূলত ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট করছি। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীতে যখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন এটি শুধু আমাদের একার সমস্যা থাকে না। ভারত ও পাকিস্তানেও একই অবস্থা। আমরা অন্ধকারে থাকবো না আলোতে থাকবো, এ বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে চেষ্টা করছি যেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়। হাতে থাকা সম্পদ সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহার করে মানুষের স্বস্তি বজায় রাখতে চাই। এমন সংকটে লোডশেডিংসহ অন্যান্য বিষয় একটির সঙ্গে আরেকটি ইন্টারকানেক্টেড থাকে। তিনি বলেন, আমরা যদি সাশ্রয়ীভাবে চলি, তাহলে মার্চ মাস মোটামুটি সামাল দেয়া যাবে। মার্চের পর যেসব কমিটমেন্ট রয়েছে, সেগুলো ঠিকঠাক হলে ক্রাইসিস থাকবে না। বাস্তবে আমাদের চাপ থাকতে পারে ঈদের ছুটি পর্যন্ত। ছুটির পর চাহিদা কমে যাবে। আশা করছি, তখন বড় ধরনের অন্ধকার পরিস্থিতি থাকবে না।
তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তার প্রভাব সারা পৃথিবীতেই পড়বে, কারণ আমরা গ্লোবের বাইরে নই। বিভিন্ন সেক্টরে রেশনিং করা হবে। সীমান্তের ওপারে ডিজেল পাচার হচ্ছে, কারণ সেখানে দাম বেশি। সেটিও নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। সীমান্তে ডিজেল পাচার ঠেকাতে বিজিবিকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এখনো লোডশেডিংয়ের নির্দিষ্ট শিডিউল ঘোষণা করা হয়নি। তবে জ্বালানি না থাকলে কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। আমাদের লক্ষ্য হলো, মানুষের কষ্ট যেন ন্যূনতম থাকে। এখন পর্যন্ত রিভিউ অনুযায়ী পরিস্থিতি সহনীয় থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী আরও বলেন, আমাদের সাপ্লাই লাইন ধীর হয়ে গেছে। তাই যা আছে, তা সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহার করতে হবে। নাগরিকদেরও অপচয় বন্ধ করতে হবে। বাজারে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জার প্রয়োজন নেই, বিশেষ করে যখন বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি চলছে। প্রেস রিলিজে বিভিন্ন ব্যবস্থা উল্লেখ থাকবে, যেমন ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহারের আহ্বান। সবাই সহযোগিতা করলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব। ইফতার, তারাবিহ ও সেহরির সময় লোডশেডিং না রাখার চেষ্টা থাকবে। গরমের সময়ে গ্যাসের চাপ কমে যায় এটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। সাশ্রয়ী ব্যবহারই এখন মূল কথা।

Sukur ulla
৩ মাস আগেএরপরে ও সব জায়গায় মার্কেটে আলোকসজ্জা