শহীদ ওসমানের লাশ বাড়িতে নিতে ৫ বার বাধা দেয় ছাত্রলীগ-যুবলীগের ছেলেরা

শহীদ ওসমানের লাশ বাড়িতে নিতে ৫ বার বাধা দেয় ছাত্রলীগ-যুবলীগের ছেলেরা

ফন্ট সাইজ:

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে ৪ঠা আগস্ট গুলিবিদ্ধ হয়ে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে শহীদ হন চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র ওসমান পাটোয়ারী। এ সময় শহীদ ওসমানের লাশ হাসপাতাল থেকে বাসায় আনতে বাধা দেয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ছেলেরা। তারা লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ঘেরাও করে রাখলে অনেক কাকুতি-মিনতি করে লাশ বাড়িতে আনার জন্য এম্বুলেন্সে তোলা হয়। কিন্তু পথিমধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ছেলেরা ৫ বার এম্বুলেন্স থামায় এবং লাশ আনতে বাধা দেয়। পরে বিকল্প রাস্তা দিয়ে লাশ বাড়িতে এনে পরের দিন জানাজা শেষে দাফন করা হয়। দাফনের ১ মাস পরে কবর থেকে তুলে আমার ছেলের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। একজন পুলিশ কর্মকর্তার নিকট থেকে আমি জেনেছি, আমার ছেলের মৃত দেহের ভেতর থেকে ৭টি গুলি বের করা হয়েছে। পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী আমার ছেলের দেহে ৫৫টি গুলির চিহ্ন ছিল উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন ওসমানের পিতা ডা. আব্দুর রহমান। জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ আসামির বিরুদ্ধে করা একটি মামলায় তিনি এ সাক্ষ্য দেন। মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আজ দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ দিন ধার্য করেন।

ওবায়দুল কাদের ছাড়া এ মামলার অন্য আসামিরা হলো- আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। সব আসামিই পলাতক।

জবানবন্দিতে আব্দুর রহমান বলেন, আমি একজন পল্লী চিকিৎসক। আমার ছোট ছেলে ঈদ উপলক্ষে চট্টগ্রাম থেকে বাড়িতে এসে লক্ষ্মীপুরে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। শহীদ ওসমান ৪ঠা আগস্ট আমাকে ফোন করে বলে, আব্বু, আমি আজ আন্দোলনে যাবো, আমার সঙ্গে হয়তো তোমার আর দেখা হবে না, তুমি আমাকে মাফ করে দিও। আমি বলি দেশের পরিস্থিতি ভালো না, তুমি যেও না। তখন আমার স্ত্রীকে ফোন করে বলি তুমি কেন ওসমানকে আন্দোলনে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছো? আমার স্ত্রী জানায়, ওসমান আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার দুই গালে ও কপালে চুমু খেয়ে বলেছে, আম্মু তুমি আমাকে আয়াতুল কুরসী পড়ে ফুঁ দিয়ে দেও আল্লাহ যেন আজকে আমাকে শহীদ হিসেবে কবুল করেন।

আব্দুর রহমান আরও বলেন, ৪ঠা আগস্ট বিকালে অপরিচিত লোক আমাকে আমার ছেলে ওসমানের ফোন থেকে কল দিয়ে বলে- এই ফোনের ছেলেটি লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে মারা গেছে। তখন আমার পরিচিত লোকজনদের লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে পাঠিয়ে লাশ বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য বলি। কিন্তু তখন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ছেলেরা হাসপাতাল ঘেরাও করে রেখেছিল এবং তারা লাশ আনতে দেয় নাই। অনেক কাকুতি-মিনতি করার পর লাশ বাড়িতে আনার জন্য এম্বুলেন্সে তোলা হলে তারা রাস্তায় ৫ বার বাধা দেয়ায় বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করে লাশ বাড়িতে আনা হয়। পরের দিন ৫ই আগস্ট বেলা সাড়ে ১০টায় জানাজা শেষে আমার ছেলেকে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।
তিনি আরও বলেন, লোকজনের কাছে আমি জানতে পারি, লক্ষ্মীপুর পিংকী প্লাজার সামনে ওসমান গুলি খেয়ে মেইন রোডের উপর পড়েছিল। আওয়ামী লীগের তাহেরের ছেলে সালাউদ্দিন টিপু ও তার সহযোগীরা ছাদ থেকে ও নিচ থেকে এ গুলি করে আমার ছেলেসহ আরও ২ জন আন্দোলনকারীকে হত্যা করেছে। ৪ঠা আগস্ট সালাউদ্দিন টিপু ও তার সহযোগীরা মাদাম ব্রিজের উপর আফনান নামে এক আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা করে। টিপু ও তার ছোট ভাই বিপ্লব, শাহীন, শিবলুসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আমার ছেলেসহ লক্ষ্মীপুরে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।

শেখ হাসিনাকে ফেরাতে উদ্যোগ নেয়া হবে: চিফ প্রসিকিউটর: সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরাতে উদ্যোগ নেয়া হবে। তবে এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ শুরু হয়েছে কিনা, তা তিনি জানেন না বলে জানিয়েছে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। গতকাল দুপুরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।

এদিন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ঢাকার রামপুরায় ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে গুলি এবং দু’জনকে হত্যার অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে এসে প্রসিকিউশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলার রায় ঘোষণা স্থগিত করেছেন ট্রাইব্যুনাল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। আবেদনে প্রসিকিউশন জানায়, মামলাটির জন্য নতুন কিছু ডিজিটাল এভিডেন্স সংগ্রহ করা হয়েছে। আমরা ৪ সপ্তাহ সময় চাচ্ছি মামলাটির নতুন এভিডেন্স দাখিলের জন্য। এ সময় মামলার একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি পুলিশের সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারের পক্ষে আইনজীবী শারমিন সুলতানা ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ‘আমার সিনিয়র ও মামলাটির লিস্ট আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন আপিল বিভাগে অন্য একটি মামলার শুনানিতে আছেন। কেন এই মামলাটির রায় ঘোষণা হবে না এটি জানতে তিনি ট্রাইব্যুনালে আসবেন। সুতরাং মামলাটির ব্যাপারে এখনই সিদ্ধান্ত না জানাতে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন শারমিন সুলতানা। পরে ট্রাইব্যুনাল মামলাটি পাস ওভার করে রাখেন। অর্থাৎ এখন কজ লিস্টে থাকা অন্য মামলাগুলোর কার্যক্রম চলবে এবং রামপুরার মামলাটি সব শেষে শুনবেন ট্রাইব্যুনাল। পরে উভয়পক্ষের শুনানি শেষে মামলার নতুন এভিডেন্স দাখিলের জন্য ৯ই এপ্রিল দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।

শুনানি শেষে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, প্রসিকিউশন একটি ভিডিও পেয়েছে যেখানে অভিযুক্ত চঞ্চল চন্দ্র সরকার, রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই), বিচারবহির্ভূত স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন। ভিডিওতে সরকার হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন এবং কাদের ওপর গুলি চালিয়েছিলেন ও কার নির্দেশে তা করেছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলেছেন। আমরা মনে করি, এত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ অবশ্যই উপস্থাপন করা উচিত। সে কারণেই আমরা ট্রাইব্যুনালকে এটি গ্রহণ করার অনুরোধ করেছি। তিনি উল্লেখ করেন, আইনে যেকোনো পর্যায়ে অতিরিক্ত প্রমাণ দাখিলের সুযোগ রয়েছে। চঞ্চল ছাড়াও মামলায় আরও চারজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা অভিযুক্ত রয়েছেন। তাদের মধ্যে তৎকালীন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাবিবুর রহমানও আছেন। আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, ২৩শে ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি সব মামলার নথি পর্যালোচনা করেছেন এবং কয়েকটি মামলায় পুনঃতদন্তের প্রয়োজন হতে পারে বলে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছি।

এদিকে, আইসিটি’র বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা, শেখ হাসিনার সাবেক আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় জব্দ তালিকা সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন। এ মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ১০ই মার্চ দিন ধার্য করা হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন