মার্কিন রাজনীতিতে একটি বক্তব্য বারবার শোনা যায়- ইরানকে কখনও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেয়া যাবে না। ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান- দুই দলের নেতারাই বিভিন্ন সময়ে এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে লিখেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র পেতে পারে না। সিনেটর টেড ক্রুজসহ অনেক নেতা ইরানকে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে চিত্রিত করেছেন। ডেমোক্রেট শীর্ষ নেতাদের মধ্যেও কঠোর অবস্থান দেখা গেছে।
কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন যদি পারমাণবিক অস্ত্র এতটাই বিপজ্জনক হয়, তাহলে ইসরাইলের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে একই ধরনের উদ্বেগ কেন দেখা যায় না?
ইসরাইল বহু দশক ধরে স্ট্র্যাটেজিক অ্যাম্বিগুইটি বা কৌশলগত অস্পষ্টতার নীতি অনুসরণ করে আসছে। দেশটি কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি যে তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, আবার সরাসরি অস্বীকারও করেনি। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞদের অনুমান, ইসরাইলের কাছে অন্তত ৮০ থেকে ২০০টির মতো পারমাণবিক ওয়ারহেড থাকতে পারে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, প্রকৃত সংখ্যা ৩০০ এর কাছাকাছিও হতে পারে, যদিও সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশিত নয়।
ধারণা করা হয়, ইসরাইল তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা গড়ে তোলে ১৯৬০-এর দশকে ডিমোনা পারমাণবিক স্থাপনাকে কেন্দ্র করে। দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি)-তে স্বাক্ষর করেনি এবং আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা আইএইএ এর পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শনের আওতায়ও নেই।
ইসরাইলের হাতে জেরিকো-৩ আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন-ভিত্তিক ডেলিভারি সিস্টেম এবং যুদ্ধবিমান সহ একাধিক সম্ভাব্য বহন ব্যবস্থা রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইরান এনপিটি-তে স্বাক্ষরকারী দেশ। তেহরান দাবি করে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম এবং অতীতের কিছু গোপন স্থাপনা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছে।
মার্কিন নেতাদের যুক্তি ইরান পারমাণবিক অস্ত্র পেলে তা আঞ্চলিক ভারসাম্য নষ্ট করবে এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর কাছে প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। যদিও ইরান বারবার বলেছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল গঠনের পক্ষে।
সমালোচকদের মতে, সমস্যার মূল এখানেই। একদিকে ইসরাইলের সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার আন্তর্জাতিকভাবে কার্যত মেনে নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের সম্ভাব্য সক্ষমতা ঠেকাতে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি পর্যন্ত দেয়া হচ্ছে।
তাদের প্রশ্ন- যদি পারমাণবিক অস্ত্র মানবতার জন্য হুমকি হয়, তবে একই অঞ্চলে এক দেশের ক্ষেত্রে সহনশীলতা আর অন্য দেশের ক্ষেত্রে কঠোরতা কেন?
মার্কিন প্রশাসনের সমর্থকরা অবশ্য ভিন্ন যুক্তি দেন। তারা বলেন, ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং দীর্ঘদিন ধরে অস্তিত্বগত নিরাপত্তা হুমকির মুখে রয়েছে। তাদের মতে, ইসরাইলের পারমাণবিক সক্ষমতা একটি প্রতিরোধমূলক কৌশল, যা বাস্তবে যুদ্ধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখছে।
৭ অক্টোবরের হামলার পর গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার আক্রমণাত্মক নীতির কারণে সমালোচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আইসিসি’র পরোয়ানা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে কিছু ডানপন্থী ইসরাইলি রাজনীতিকের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে। যদিও সেগুলো আনুষ্ঠানিক নীতি নয়, তবু বিশ্লেষকদের মতে এমন বক্তব্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
সাংবাদিক সেয়মোর হেরশ তার লেখায় ইসরাইলের তথাকথিত প্রতিরক্ষার কথা উল্লেখ করেছেনÑ যেখানে অস্তিত্বগত হুমকি দেখা দিলে ব্যাপক পারমাণবিক পাল্টা আঘাতের ধারণা রয়েছে বলে দাবি করা হয়। ইসরাইল সরকার কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এ নীতি স্বীকার করেনি, তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষণে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্রের মূল দর্শনই প্রতিরোধ। কিন্তু ভুল হিসাব, ভুল সংকেত বা রাজনৈতিক অস্থিরতা বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসক সংগঠন সতর্ক করেছে, মাত্র ১০০টি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার হলেও বৈশ্বিক জলবায়ু ও কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নিউক্লিয়ার উইন্টারের মতো পরিস্থিতিতে কোটি কোটি মানুষ খাদ্য সংকটে পড়তে পারে।
অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে সীমিত আঞ্চলিক সংঘাতও বিশ্বব্যাপী বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল গঠনের প্রস্তাব বহু বছর ধরে জাতিসংঘে আলোচিত হচ্ছে। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় এমন অঞ্চল কার্যকর হয়েছে। তবে ইসরাইল-ইরান বৈরিতা, আরব-ইসরাইল দ্বন্দ্ব এবং বৃহৎ শক্তির ভূরাজনীতি এই উদ্যোগকে এগোতে দিচ্ছে না।
কিছু মার্কিন আইনপ্রণেতা সামরিক পদক্ষেপের বদলে কূটনৈতিক পথ বেছে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে সমাধান একটাইÑ মধ্যপ্রাচ্যে সকল দেশের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত এমন একটি অবস্থান রক্ষা করছে, যেখানে ইসরাইলের পারমাণবিক সক্ষমতা সহনীয় কিন্তু ইরানের সম্ভাব্য সক্ষমতা অগ্রহণযোগ্য। সমালোচকরা এটিকে দ্বৈত মানদণ্ড বলছেন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট- পারমাণবিক অস্ত্র প্রশ্নে উত্তেজনা বাড়তে থাকলে মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্ব উভয়ের জন্য ঝুঁকি বাড়বে। প্রশ্ন এখন একটাই। তা হলো- ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কি প্রতিরোধের ওপর নির্ভর করবে, নাকি আঞ্চলিক নিরস্ত্রীকরণের সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর?
(মূল ইংরেজি নিবন্ধের সংক্ষিপ্তসার)

Sukur ulla
৩ মাস আগেইসরায়েল ওদের মায়ের পেটের ভাই। ইরান তথা মুসলমান চির শত্রু