একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন নতুন আশার সঞ্চার করে। নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। তাদের জন্য শুভকামনা। তাদের সামনে যেমন আছে বিশাল প্রত্যাশা, তেমনি রয়েছে পাহাড়সমান অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা। বাংলাদেশের ইতিহাসে বর্তমানে রাষ্ট্র যে ধরনের ঋণের বোঝা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির অস্থিরতার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে, তা নজিরবিহীন। এই সংকটময় মুহূর্তে সরকারের নীতি নির্ধারণের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের সহনশীলতা ও ধৈর্য রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভাগ্য নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করবে।
বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকটের স্বরূপ নতুন সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে, যখন দেশের অর্থনীতি বহুমুখী চাপে জর্জরিত। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো:
১. উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার মান: নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে শুরু হওয়া উচ্চ মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালের শুরুতে এসেও একটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করেছে।
২. রিজার্ভ ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকট: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এখনও কাটেনি। বিশেষ করে আমদানি ব্যয় মেটানো এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের ফলে রিজার্ভ একটি চ্যালেঞ্জিং স্তরে রয়েছে।
৩. বিপুল ঋণের বোঝা: বাংলাদেশ বর্তমানে তার ইতিহাসের সর্বোচ্চ ঋণের মধ্যে রয়েছে। একদিকে যেমন অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণ বাড়ছে, অন্যদিকে বিদেশি ঋণের কিস্তি (Principal and Interest) পরিশোধের পরিমাণ ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রায় $৪.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। গত ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ কালের কন্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, “বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট দেশি ও বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭১০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১৩ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা এবং দেশি ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া ঋণ ১০ লাখ ২৬ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা।”
৪. ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা: খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং তারল্য সংকট ব্যাংকিং খাতকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে এই খাতে শৃঙ্খলা আনা নতুন সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক।
রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যতে প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক ব্যয় বাড়বে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সীমিত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করাই হবে নতুন সরকারের প্রধান পরীক্ষা। অহেতুক মেগা প্রজেক্টের চেয়ে উৎপাদনশীল খাত, দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির দিকে নজর দেয়া জরুরি। কর-জিডিপি অনুপাত (Tax-to-GDP ratio) বৃদ্ধি করা না গেলে রাষ্ট্রের ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো সম্ভব হবে না।
যেকোনো সরকার পরিবর্তনের পর জনগণের মধ্যে প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা তীব্র থাকে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, অর্থনৈতিক ক্ষত একদিনে নিরাময়যোগ্য নয়। একটি ধ্বংসপ্রায় ব্যবস্থাকে মেরামত করতে সময় লাগে। নতুন সরকারকে যদি কাজ করার নূন্যতম সুযোগ না দিয়ে আমরা তাৎক্ষণিক দাবির আন্দোলনে লিপ্ত হই, তবে তা অস্থিতিশীলতা বাড়াবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, অন্তত আগামী ৬ মাস কোনো বড় ধরণের দাবি-দাওয়া বা হঠকারী আন্দোলন না করে ধৈর্য ধারণ করা একটি দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণ হবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করে এবং মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দেয়। আমরা যদি সরকারকে প্রয়োজনীয় সময় না দেই, তবে রাষ্ট্র ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশৃঙ্খলা কেবল আমাদের অর্থনীতিকেই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্নকেও অন্ধকারে ঠেলে দেবে।
পরিশেষে, সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া অসীম হওয়াটা অমূলক নয়। তবে বর্তমান বাস্তবতায় চাওয়া-পাওয়ার চেয়েও রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা এবং স্থিতিশীল করা বেশি জরুরি। নতুন সরকারের উচিত হবে স্বচ্ছতা ও সততার সাথে সংকট মোকাবিলায় সচেষ্ট থাকা। আর আমাদের দায়িত্ব হলো এই ক্রান্তিকালে ধৈর্য ধরে সরকারকে রাষ্ট্র মেরামতের সুযোগ দেওয়া। জাতীয় ঐক্য এবং সম্মিলিত ধৈর্যই পারে বাংলাদেশকে এই গভীর অর্থনৈতিক খাদ থেকে তুলে আনতে।
ইমেইল: [email protected]
