নোয়াখালীতে আলোচিত পর্নোগ্রাফি ও চাঁদাবাজি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বাদী ও সাক্ষীদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। আদালত মামলার ৬ নম্বর আসামিকে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার আদেশ দেন। কিন্তু আদালতের আদেশ অমান্য করার অভিযোগ তুলেছেন মামলার বাদী। এ বিষয়ে মামলার বাদী মামুন মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা (সদর সার্কেল) এএসপি লিয়াকত আকবরের বিরুদ্ধে নোয়াখালী জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্টদের অবহিত করে প্রতিকার চেয়ে অভিযোগ করেছেন বলে জানিয়েছেন। এ অভিযোগ করেছেন উক্ত মামলার বাদী নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার ম্যাকপার্শ্বান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মামুন অর রশিদ।
মামলার বাদী মামুন অর রশিদ বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা লিয়াকত আকবর মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে নানা রকমের অজুহাতে ব্যস্ততা দেখিয়ে সাক্ষীদের কাছ থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ করতে গড়িমসি করেন। তাকে আদালত পূর্বের তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ও মামলাটি পুনরায় তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তিনি কোনোটি সঠিকভাবে করছেন না। তদন্তকারী কর্মকর্তার কথা শুনলে মনে হয় আসামিরা তার আত্মীয়স্বজন। তিনি বলেন, গত ২৮শে জানুয়ারি ৬ নম্বর আসামি সাক্ষী হিসেবে ১৬৪ ধারা মোতাবেক জবানবন্দি দেবেন বলে স্ব-ইচ্ছায় আদালতে আবেদন করেন। আদালত তার আবেদনের প্রেক্ষিতে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আদেশ দেন।
তিনি আরও বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা উক্ত আসামিকে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আদালতে হাজির না করতে নানা রকম টালবাহানা শুরু করছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আগে তার ফরেনসিক রিপোর্ট আসুক তারপর তার সাক্ষ্যগ্রহণ করবো। তিনি কৌশলে ফরেনসিক রিপোর্টের অজুহাত দেখিয়ে গড়িমসি করছেন। আদালতের আদেশ অমান্য করার চেষ্টা করছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের কথা বলে থাকেন। এতে করে আমার মামলার সঠিক ঘটনা তদন্তে উঠে আসবে না বলে মনে হচ্ছে। যার ফলে আমি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছি। তদন্তকারী কর্মকর্তার শুরু থেকে তার কথাবার্তায় আমার সন্দেহ হলে দুই মাস আগে তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দাখিল করি। এ ছাড়াও গত কয়েক মাস আগে আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর এ পর্নোগ্রাফি ও চাঁদাবাজি মামলার আসামিদের রাজনৈতিক হয়রানি মামলা দেখিয়ে ৬ লাখ টাকার চুক্তিতে খালাসের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। চুক্তিকৃত ৬ লাখ টাকার মধ্যে ইতিমধ্যেই ৩ লাখ টাকা লেনদেনের কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ সংরক্ষিত রয়েছে।
জানা গেছে, স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত গোপনীয় ছবি মোবাইল ফোন হ্যাক করে পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন্ন করার হুমকি দিয়ে ভিকটিমের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে নারী-পুরুষসহ ৬ জন। কোনো উপায় না পেয়ে স্কুল শিক্ষিকা ভিকটিমের স্বামী হাতিয়া উপজেলার ম্যাকপার্শ্বান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মামুন অর রশিদ ২০২৪ সালের ৫ই মে পর্নোগ্রাফি ও চাঁদাবাজি আইনে সুধারাম থানায় মামলা দায়ের করেন। আসামিরা হলেন- মাইজদী কোর্ট এলাকার মৃত আবদুল মোতালেবের ছেলে আমজাদুর রহমান ওরফে আমজাদ হোসেন, হাতিয়া উপজেলার জাহাজমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমির হোসেন (৫২), মধ্য রেহানিয়া আবদুল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুর উদ্দিন তানভির (৩৫), ম্যাক পার্শ্বান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জিন্নাত আরা বেগম (৩৫) ও হাসান উদ্দিন বিপ্লব (সাময়িক বরখাস্ত) এবং হাতিয়া উপজেলা এলজিইডি’র সহকারী প্রকৌশলী শরীফুল ইসলাম। এ ছাড়াও আরও ৭ জনের সম্পৃক্ততা আছে বলে পরবর্তীতে মামলার বাদী মামুন অর রশিদ মামুন তাদেরকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আদালতে আবেদন করেন।
আসামিরা গ্রেপ্তার হয়ে দু’মাসের অধিক সময় কারাগারে থাকার পর উচ্চ আদালতের জামিনে রয়েছেন। জামিনে এসে মামলার বাদী ও ভিকটিম শিক্ষক দম্পতিকে আসামিরা মামলা তুলে নেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি, হত্যা ও লাশ গুম করার হুমকি দেয়ায় মামলার বাদী স্কুল শিক্ষক ও ভিকটিম স্কুল শিক্ষিকার স্বামী মামুন গত ১৩ই অক্টোবর সুধারাম মডেল থানায় এ বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করেন। প্রতিকার না পেয়ে এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) মুকিব হাসানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট একাধিক অভিযোগ এনে তদন্তকারী কর্মকর্তার পরিবর্তন চেয়ে নোয়াখালী পুলিশ সুপারের কাছে গত ১৪ই অক্টোবর আবেদন করেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে চাঞ্চল্যকর এ পর্নোগ্রাফি আইনের মামলার আইও পরিবর্তন করে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান সুধারাম মডেল থানার সাব ইন্সপেক্টর (এস আই) মিঠুন চন্দ্র শীল। তার বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ উঠলে আদালত পরবর্তীতে সহকারী পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) লিয়াকত আকবরকে অধিকতর তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার আদেশ দেন। আরও জানা গেছে, চাঞ্চল্যকর মামলাটির আসামিরা আওয়ামী লীগ দলীয় সমর্থক এবং হাতিয়া উপজেলার আওয়ামী লীগের দলীয় সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর ঘনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও ৫ই আগস্টের পর বিএনপি দলীয় সমর্থক দাবিতে রাজনৈতিক হয়রানি মামলা গণ্য করে মামলা থেকে খালাস পাওয়ার জন্য বিএনপি নেতাদের দিয়ে জোর তদবির করছে। অপরদিকে, অভিযুক্ত সহকারী পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ও তদন্তকারী কর্মকর্তা লিয়াকত আকবর বলেন, আদালতের আদেশ পেয়ে আমি দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার চেষ্টা করছি। তবে আসামি অনেক হওয়ায় তদন্তে সময় লাগছে। তা ছাড়া, আদালত আমাকে কোনো সময় বেঁধে দেয়নি।
আদালতের আদেশ অমান্য
নোয়াখালীতে আলোচিত পর্নোগ্রাফি ও চাঁদাবাজি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বাদী ও সাক্ষীদের হয়রানির অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টার, নোয়াখালী থেকে
৫ মার্চ (বৃহস্পতিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
