বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, ব্যাংক খাতে অস্থিরতা এবং রপ্তানিতে মন্থরতার কারণে অর্থনীতি এখন চাপে রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে দ্রুত ও বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই।
বুধবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘লুকিং ইনটু বাংলাদেশ’স ডেভেলপমেন্ট: প্রাইয়োরেটি ফর দ্য নিউলি ইলেক্টেড গভর্নমেন্ট ইন দ্য শর্ট টু মিডিয়াম টার্ম’ শীর্ষক এক রাউন্ড টেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং এলডিসি-পরবর্তী কৌশল প্রণয়ন—এসব ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে। তাদের মতে, অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক আভাস থাকলেও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি এখনও নাজুক। তাই ঘুরে দাঁড়াতে হলে বড় ও গভীর সংস্কার এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
ফাহমিদা খাতুন জানান, ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে তিন দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। শিল্প ও সেবা খাতে গতি কমে যাওয়া এবং বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এ পতনের বড় কারণ। তবে, ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি বেড়ে চার দশমিক ৫০ শতাংশে উঠেছে। এটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরে ধীরে গতি ফেরার ইঙ্গিত দিলেও, তা এখনও স্থায়ী পুনরুদ্ধার বলা যাচ্ছে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি গত দুই বছরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় চাপ তৈরি করেছে। ২০২৪ অর্থবছরের জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক সাত শতাংশ। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা কমে আট দশমিক ৬৬ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমায় পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে।
কিন্তু, একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ১২ শতাংশে স্থির রয়েছে। ফলে প্রকৃত আয় বাড়েনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু মূল্যস্ফীতি কমলেই হবে না, মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ানোর উদ্যোগও নিতে হবে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নেমে এসেছে ছয় দশমিক ১০ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। এতে বোঝা যায়, উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী নন। উচ্চ সুদহার, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও বাজারে আস্থার ঘাটতি এ পরিস্থিতির পেছনে কাজ করছে। অন্যদিকে, সরকার ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নেওয়ায় সরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩২ দশমিক ১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশে। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতও কমে ৭ দশমিক ৮১ শতাংশে নেমেছে। এতে সরকারের ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
মোট ঋণ-জিডিপি অনুপাত বেড়ে ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যদিও ২০২৬ অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা জরুরি বলে মত দেন বক্তারা।
ব্যাংকিং খাতে কিছু তারল্য সূচকে উন্নতি হলেও খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ঋণ শ্রেণিকরণ পদ্ধতি চালুর পর খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পরে ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কিছুটা কমলেও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এ সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে না বলে সতর্ক করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বগত বক্তব্য দেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। এতে প্রধান অতিথি হিসাবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে বড় সংস্কার প্রয়োজন: সিপিডি
অর্থনৈতিক রিপোর্টার
অনলাইন
৩ মাস আগে
৪ মার্চ (বুধবার), ২০২৬, ২ঃ৪২ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
