আগুনের মানচিত্র: ইরান–ইসরাইল–আমেরিকা, আর বিশ্বরাজনীতির গোপন খাতা

আগুনের মানচিত্র: ইরান–ইসরাইল–আমেরিকা, আর বিশ্বরাজনীতির গোপন খাতা

ফন্ট সাইজ:

মধ্যপ্রাচ্যে যখন বোমা পড়ে, তখন শুধু একটি শহর কাঁপে না কেঁপে ওঠে তেলের দাম, শেয়ারবাজার, কূটনৈতিক লাইন, এমনকি দূরের দেশগুলোর সংসদ কক্ষও। ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র এই ত্রিভুজ এখন কেবল ভূগোলের রেখা নয়, শক্তির সমীকরণ। প্রশ্ন উঠছে: কে কার পক্ষে? আর কেন?
আমরা কি সত্যিই “পক্ষ” দেখি, নাকি দেখি “স্বার্থ”? যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নতুন কিছু নয়। ইসরাইল তার দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্র। নিরাপত্তা সহযোগিতা, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা বিনিময় সব মিলিয়ে সম্পর্কটা এতটাই প্রাতিষ্ঠানিক যে তা কেবল রাজনৈতিক সমর্থনের বাইরে, এক ধরনের অবকাঠামো। ইসরাইলকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন উপস্থিতি মানে প্রভাব, প্রতিরোধ এবং বার্তা বিশেষত ইরানকে উদ্দেশ্য করে। প্রশ্ন হলো, এটি কি নিছক মিত্রতা, নাকি শক্তির ভারসাম্য রক্ষার এক দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ?

কিন্তু ইসরাইলকে সমর্থন মানেই কি অন্ধ সমর্থন? পশ্চিমা জনমত আজ আগের মতো একরৈখিক নয়। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে, বেসামরিক প্রাণহানি বাড়লে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে সংসদ পর্যন্ত প্রশ্ন ওঠে। রাষ্ট্রের নীতি একদিকে, সমাজের বিবেক আরেকদিকে এই দ্বন্দ্বই এখন পশ্চিমা রাজনীতির ভেতরে জমে থাকা অস্বস্তি।
ইরানের কাহিনি আরও জটিল। তেহরান নিজেকে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে। তার পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব, প্রক্সি নেটওয়ার্ক সবই এক বৃহৎ কৌশলের অংশ। কিন্তু ইরান একা নয়। রাশিয়া ও চীন তারা কি ইরানের বন্ধু? নাকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমানোর খেলায় কৌশলগত সহযাত্রী? তারা তেহরানের সঙ্গে হাত মেলায়, নিষেধাজ্ঞার ভেতর দিয়ে লেনদেনের পথ খোঁজে, কিন্তু সরাসরি আগুনে ঝাঁপ দেয় না। কারণ বড় শক্তিগুলো জানে যুদ্ধের চেয়ে যুদ্ধের হুমকি অনেক সময় বেশি কার্যকর।

আরব বিশ্ব? একক সুর নেই। কারও কাছে ইরানই প্রধান উদ্বেগ, কারও কাছে জনমতের চাপ। কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করে, কেউ নীরবে সমীকরণ মেলাতে থাকে। রাজপ্রাসাদ আর রাস্তাঘাটের ভাষা সবসময় এক হয় না। মধ্যপ্রাচ্যের ভেতরেই এই দ্বৈততা সবচেয়ে স্পষ্ট।



এই উত্তপ্ত মানচিত্রে একটি দেশ আলাদা করে চোখে পড়ে সুইজারল্যান্ড। তারা নিরপেক্ষ। কিন্তু নিরপেক্ষ মানে নিষ্ক্রিয় নয়। সুইজারল্যান্ড ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় ‘প্রটেক্টিং পাওয়ার’ হিসেবে কাজ করে এটা আজও কার্যকর আছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের সেতু হিসেবে তারা কাজ করে। যখন সরাসরি দূতাবাস নেই, সম্পর্ক ছিন্ন, তখনও বার্তা আদান-প্রদানের একটি জানালা খোলা থাকে। কেন? কারণ যুদ্ধে ভুল বোঝাবুঝি সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র। একটি ভুল সংকেত, একটি ভুল হিসাব আর তাতেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সুইজারল্যান্ড সেই ভুলকে ঠেকানোর নীরব প্রহরী। তারা পক্ষ নেয় না, কিন্তু যোগাযোগটুকু বাঁচিয়ে রাখে। প্রশ্ন হলো, এই পৃথিবীতে এমন নিরপেক্ষতা কি বিলাসিতা, নাকি প্রয়োজন?
দক্ষিণ এশিয়ায় তাকালে ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়। ভারত ইসরাইলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতায় এগিয়েছে। দুই দেশের সম্পর্ক এখন খোলামেলা। কিন্তু ভারত জানে, গালফ অঞ্চলে তার কোটি প্রবাসী, বিপুল জ্বালানি আমদানি, বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িত। যুদ্ধ বাড়লে প্রথম ধাক্কা লাগে তেলের দামে। সুতরাং দিল্লির ভাষা কৌশলী ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে, একই সঙ্গে সংযম ও সংলাপের আহ্বান। এটাকে কি দ্বৈত নীতি বলবেন? নাকি বাস্তববাদ?
পাকিস্তান অন্য পথে। তারা ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয় না, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের দাবিকে সমর্থন করে। পাকিস্তানের রাজনীতিতে ফিলিস্তিন প্রশ্ন শুধু পররাষ্ট্রনীতি নয়, পরিচয়ের অংশ। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন আছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক চাপ, আঞ্চলিক সমীকরণ এসবের সঙ্গে এই অবস্থান কতটা খাপ খায়? তবু ইসলামাবাদের বক্তব্য তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট ও ধারাবাহিক।

আর বাংলাদেশ? বাংলাদেশের অবস্থান ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনপন্থী। ইসরাইলকে স্বীকৃতি নেই। কিন্তু বাংলাদেশও জানে যুদ্ধ মানে আমদানি ব্যয় বাড়া, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, জ্বালানি সংকট। ফলে ঢাকার ভাষা সাধারণত মানবিক, আইনি ও শান্তিকেন্দ্রিক। নীতিগত সমর্থন, কিন্তু সামরিক জোট নয়। প্রশ্ন হলো ছোট ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর আর কী-ই বা করার আছে? তারা কি আগুন নেভাবে, নাকি আগুনে পুড়বে?
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো এটি কখনোই কেবল দুই বা তিন দেশের থাকে না। এটি বাজারে ঢুকে পড়ে, জাহাজের রুট বদলায়, রেমিট্যান্সে চাপ ফেলে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ায়। দূরের গ্রামের বাজারেও তখন আগুনের দাম শোনা যায়। আমরা কি বুঝি, মধ্যপ্রাচ্যের একটি মিসাইল ঢাকার রান্নাঘরে কিভাবে ঢুকে পড়ে?
আরেকটি প্রশ্ন এই সংঘাত কি আদর্শের, নাকি আধিপত্যের? নিরাপত্তার নামে কতটা আক্রমণ বৈধ? প্রতিরোধের নামে কতটা প্রতিশোধ ন্যায্য? আন্তর্জাতিক আইন কি সত্যিই সমানভাবে প্রযোজ্য, নাকি শক্তিশালীর সুবিধামতো বাঁক নেয়?



বিশ্বরাজনীতির বড় শক্তিগুলো আগুনের চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ পানি ঢালে, কেউ বাতাস দেয়, কেউ দূর থেকে হিসাব কষে। কিন্তু আগুন তো আগুনই তার কোনো বন্ধু নেই। সে পুড়লে সবারই ক্ষতি।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকে যায় এই পৃথিবীতে কি কেউ আছে, যে সত্যিই যুদ্ধ চায়? সাধারণ মানুষ চায় না। বাজার চায় না। উন্নয়নশীল দেশগুলো তো একেবারেই না। তবু যুদ্ধ এগোয়। কারণ সিদ্ধান্ত নেয় যে ক’জন, তাদের টেবিলে মানচিত্র থাকে; সেখানে রঙ বদলায়, কিন্তু মানুষের মুখ থাকে না।
আজ যদি যোগাযোগের শেষ জানালাটুকুও বন্ধ হয়ে যায়, যদি সুইস-ধাঁচের নিরপেক্ষ করিডর হারিয়ে যায়, যদি সংলাপের ভাষা চাপা পড়ে যায় অস্ত্রের শব্দে তবে কে জিতবে? ইসরাইল? ইরান? যুক্তরাষ্ট্র? নাকি হারবে সবাই?

ইতিহাস বলে, মধ্যপ্রাচ্যের আগুন কখনো সীমান্ত মানে না। তা ছড়িয়ে পড়ে সময়ের ভেতর, প্রজন্মের ভেতর। তাই প্রশ্নটা শুধু “কে কার পক্ষে” এটা নয়। আসল প্রশ্ন কে শান্তির পক্ষে দাঁড়াবে? কারণ পক্ষ নেওয়া সহজ, আগুন নেভানো কঠিন। আর আগুন যখন বাড়ে, তখন শেষ পর্যন্ত মানচিত্র নয় মানুষই পুড়ে যায়।

লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি

ইমেইল: [email protected]





কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন