ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করা নিয়ে মার্কিন কংগ্রেস বিভক্ত

ইরানে যুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক

ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করা নিয়ে মার্কিন কংগ্রেস বিভক্ত

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান সম্প্রসারণের ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগ নিচ্ছে মার্কিন কংগ্রেস। এ জন্য এ সপ্তাহে কংগ্রেসের বৈঠক বসছে। সেখানে সিনেটে ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলুশন এবং প্রতিনিধি পরিষদে দুটি ভিন্ন প্রস্তাব বিবেচনা করা হবে। যদি কংগ্রেস এসব প্রস্তাব অনুমোদন দেয়, তাহলে ট্রাম্পের ক্ষমতা হ্রাস পাবে। বর্তমানে তিনি নির্বাহী ক্ষমতাকে ব্যবহার করে কংগ্রেসের তোয়াক্কা না করে ইরানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ খবর দিয়ে অনলাইন ডন লিখেছে, সিনেটে প্রস্তাবটি নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভার্জিনিয়ার ডেমোক্রেট দলীয় সিনেটর টিম কেইন। এটি ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলুশন আইনের অধীনে আনা হয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তৈরি হয়েছিল এই আইন। যদি এই প্রস্তাব গৃহীত হয়, তাহলে কংগ্রেস অনুমোদন না দিলে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর যুদ্ধ কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। টিম কেইন বলেন, সংবিধান অনুযায়ী কংগ্রেসের ভোট ছাড়া আমাদের যুদ্ধ করা উচিত নয়। আমাদের সেনাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাই আমাদের দ্রুত ওয়াশিংটনে ফিরে এসে এ বিষয়ে ভোট দেয়া উচিত।

প্রতিনিধি পরিষদে ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্রেট দলীয় সদস্য রো খান্না এবং কেন্টাকি রাজ্যের রিপাবলিকান দলীয় সদস্য থমাস ম্যাসি যৌথভাবে একটি দ্বি-দলীয় প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। এতে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের সরিয়ে নিতে হবে। একই সময়ে প্রতিনিধি পরিষদে আরেকটি তুলনামূলক সতর্ক প্রস্তাব দিয়েছেন নিউ জার্সির ডেমোক্রেট দলীয় সদস্য জশ গটহাইমার এবং কয়েকজন মধ্যপন্থী সদস্য। তারা অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের দাবি না করলেও বিদ্যমান আইন মেনে চলা এবং কংগ্রেসের সঙ্গে পরামর্শ করার আহ্বান জানিয়েছেন। গটহাইমার বলেন, তিনি আশা করেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আইন মেনে চলবেন।

এই ভোটাভুটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমন্বিত হামলার পর, যেখানে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে। এই সংঘর্ষে মার্কিন হতাহতের খবরও এসেছে এবং এতে বড় আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা বেড়েছে। ডেমোক্রেট নেতারা বিষয়টিকে সরাসরি যুদ্ধ বন্ধের দাবি হিসেবে নয়, বরং কংগ্রেসের তদারকি ক্ষমতার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছেন। নিউ ইয়র্কের ডেমোক্রেট সংখ্যালঘু সিনেটের নেতা চাক শুমার বলেন, তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে অনুরোধ করেছেন যেন, তিনি কংগ্রেস ও জনগণের কাছে এই হামলার উদ্দেশ্য এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি আরও বলেন, সিনেটের উচিত দ্রুত অধিবেশনে ফিরে এসে ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলুশন পাস করা।
প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যালঘু নেতা নিউইয়র্কের ডেমোক্রেট দলীয় সদস্য হাকিম জেফরিস গোপন ব্রিফিং এবং আনুষ্ঠানিক ভোটের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রশাসনকে এই যুদ্ধের জন্য শক্ত ও পরিষ্কার যুক্তি দিতে হবে, জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্য স্পষ্ট করতে হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি ব্যয়বহুল দীর্ঘ যুদ্ধ এড়ানোর পরিকল্পনা জানাতে হবে। প্রগতিশীল আইনপ্রণেতারা আরও সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন। ভারমন্টের স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এবং ওরেগন রাজ্যের ডেমোক্রেট সিনেটর জেফ মার্কলি প্রকাশ্যে বলেছেন- ইরানের সাথে কোনো যুদ্ধ নয়।
তবে ডেমোক্রেটদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। পেনসিলভ্যানিয়ার ডেমোক্রেট সিনেটর জন ফেটারম্যান বলেন, তিনি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করবেন। তার মতে, এটি প্রয়োজনীয় নয়। সত্যি বলতে, পুরো বিষয়টি অনেকটা প্রতীকী পদক্ষেপ। রিপাবলিকানদের মধ্যে প্রেসিডেন্টের প্রতি সমর্থন এখনো শক্তিশালী। সিনেটের গোয়েন্দা কমিটির চেয়ারম্যান আরকানসাস রাজ্যের রিপাবলিকান টম কটন বলেন, তিনি আশা করছেন কংগ্রেসে নির্বাচিত রিপাবলিকানদের কাছ থেকে ব্যাপক সমর্থন পাওয়া যাবে। প্রতিনিধি থমাস ম্যাসি প্রস্তাবটির সহ-উদ্যোক্তা। তিনি বলেছেন এই সংঘাত ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ডেমোক্রেটরা প্রশাসনের লক্ষ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। সিনেটের গোয়েন্দা কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট ভার্জিনিয়ার সদস্য মার্ক ওয়ার্নার বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওর সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি দেখেছেন এই অভিযানের লক্ষ্য বারবার পরিবর্তন হয়েছে। ওয়ার্নার বলেন, আমি মনে করি এই অভিযানের লক্ষ্য চার বা পাঁচবার পরিবর্তন হয়েছে। কোন লক্ষ্য পূরণ হলে আমরা যুদ্ধ শেষ বলব- তা পরিষ্কার নয়।
যদিও কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষ প্রস্তাব পাস করলেও প্রেসিডেন্ট যদি ভেটো দেন, তাহলে সেটি বাতিল করতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট- দুই জায়গাতেই দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগবে। রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেসে তা পাওয়া কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি অনেকটা ২০২০ সালের ঘটনার মতো, যখন ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ ক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা করেছিল। তখন আইনপ্রণেতারা এস.জে.রেজ্যুলুশন ৬৮ পাস করলেও তা শেষ পর্যন্ত নির্বাহী ক্ষমতাকে বাস্তবে সীমিত করতে পারেনি। দলীয় বিভাজন গভীর এবং সংঘাত দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায়, আসন্ন ভোটগুলো পরীক্ষা করবে- যুদ্ধ ও শান্তির মতো বিষয়ে কংগ্রেস তাদের সাংবিধানিক ভূমিকা কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন