ফাগুয়া উৎসবে বোনাসের দাবি চা-শ্রমিক সংঘের

ফন্ট সাইজ:

চা-শ্রমিকদের দোল পুর্ণিমার সময় ফাগুয়া (লাল পূজা) উৎসবে প্রাপ্য পূর্ণ উৎসব বোনাস এবং বাজারদরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ মজুরি প্রদানের দাবি জানিয়েছে চা-শ্রমিক সংঘ। মঙ্গলবার গণমাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সহ-সভাপতি শ্যামল অলমিক ও সাধারণ সম্পাদক হরিনারায়ণ হাজরা পূর্ণ উৎসব বোনাসের পরিবর্তে আংশিক বোনাস প্রদানের অভিযোগ করেছেন। চা-শ্রমিক নেতারা বলেন, মঙ্গলবার থেকে দোল উৎসব শুরু হয়েছে কিন্তু অধিকাংশ বাগানে পূর্ণ উৎসব বোনাসের পরিবর্তে আংশিক বোনাস প্রদান করা হয়েছে। কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগর, দেওছড়া, ডবলছড়া, চাতলাপুরসহ বিভিন্ন বাগানে উৎসব বোনাসের পরিবর্তে কর্মে উপস্থিতির ওপর হাজিরা-উৎসাহ বোনাস প্রদান করে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ (অদ্যাবধি সংশোধিত) এর ২(২ক) ধারা এবং বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা-২০১৫ এর ১১১ (৫) বিধি অনুযায়ী যেকোনো শিল্পে একই কাজে কর্মরত সকল শ্রমিককে সমানহারে উৎসব বোনাস প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমন কি ২০২৩ সালের ১০ই আগস্ট চা-শিল্প সেক্টরে নিম্নতম মজুরির গেজেট অনুযায়ী উৎসব বোনাস সকল শ্রমিকের হারে প্রদান করার আইন আছে। চা-বাগান কর্তৃপক্ষ এসকল লঙ্ঘন করে শ্রমিকদের বঞ্চিত করছেন। শ্রম আইন লঙ্ঘন করে উৎসব বোনাস কম দেয়ায় প্রতিকার চেয়ে শমসেরনগর চা-বাগানের রামনারায়ণ গৌড় নামের একজন চা-শ্রমিক সিলেট শ্রম আদালতে মামলা (মামলা নং- ২১/২০২৫) দায়ের করেছেন। তাছাড়া ক্যাজুয়াল শ্রমিকদের আইন ও চুক্তি অনুযায়ী সমান মজুরি প্রদান করার বিষয় থাকলেও অধিকাংশ বাগানে ক্যাজুয়াল শ্রমিকদের কম মজুরি প্রদান করা হয়। চা-শ্রমিক সংঘের নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির পরও গত ৭ই আগস্ট-২৫ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা বাংলাদেশীয় চা-সংসদের মজুরি বৃদ্ধি ছাড়াই ২০২৩-২০২৪ মেয়াদের মজুরি চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যা চা-শিল্পের ইতিহাসে নজিরবিহীন। ২০২৫-২০২৬ মেয়াদের ১৪ মাস অতিবাহিত হলেও নতুন মজুরি চুক্তির কোনো খবর নেই। চা-শ্রমিকরা বংশপরম্পরায় প্রায় ২০০ বছর যাবত চা-বাগানে বসবাস করে বনের বাঘ-ভাল্লুক, সাপ-জোঁকসহ হিংস্র জীবজন্তুকে মোকাবিলা করে অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে চা-শিল্পকে আজকের এই অবস্থানে (চা-উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে ৯ম) নিয়ে এসেছেন। অথচ ২০০ বছর পরও চা-শ্রমিকদের মজুরি ২০০ টাকা হয়নি। বর্তমান অগ্নিমূল্যের বাজারে চা-শ্রমিকদের মজুরি (সম্প্রতি ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট প্রদানের পর) সর্বোচ্চ ‘এ’ ক্লাস বাগানে দৈনিক ১৮৭.৪৩ টাকা এবং ‘বি’ ও ‘সি’ ক্লাস যথাক্রমে ১৮৬.৩২ টাকা এবং ১৮৫.২২ টাকা। বাংলাদেশে শিল্প সেক্টরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম মজুরি পেয়ে থাকেন চা-শ্রমিকরা। সরকারের নিম্নতম মজুরি বোর্ড কর্তৃক ঘোষিত ৪৩টি সেক্টরে এবং মজুরি কমিশন ঘোষিত রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প সেক্টরের মজুরির সঙ্গে তুলনা করলে চা-শ্রমিকদের মজুরি কম। প্রতিবেশী চা উৎপাদনকারী দেশসমূহের শ্রমিকদের মজুরির সঙ্গে তুলনা করলেও আমাদের দেশের চা-শ্রমিকদের মজুরি অত্যন্ত কম। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে একজন শ্রমিকের দৈনিক পরিশ্রমের পর পরবর্তী দিন কাজে যোগদানের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের প্রয়োজনে দৈনিক তিন বেলা সাধারণভাবে আহারের জন্য ২৫০ টাকা দিলেও পেট ভরে না। তাই বর্তমান বাজারদরে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ মা-বাবাকে নিয়ে ৬ সদস্যের একটি পরিবারের জন্য দৈনিক ন্যূনতম ১ হাজার টাকা দরকার। বাংলাদেশে ক্রিয়াশীল জাতীয় শ্রমিক সংগঠনসমূহ জাতীয় ন্যূনতম মূল মজুরি ৩০ হাজার টাকা ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছে। তাই সামগ্রিক বিচারে বর্তমান বাজারদর, মূল্যস্ফীতি, সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো, মজুরি কমিশন ঘোষিত মজুরি, দেশের অপরাপর সেক্টরের শ্রমিকদের মজুরি এবং প্রতিবেশী নয়া ঔপনিবেশিক আধা-সামন্তবাদী ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ চা উৎপাদনকারী দেশের শ্রমিকদের প্রাপ্ত মজুরি পর্যালোচনা করে ৬ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণের খরচ হিসাব করে বাঁচার মতো মজুরি ও বার্ষিক ১৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট প্রদান করাসহ চা-শ্রমিক সংঘের ১০ দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য দাবি জানান হয়।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন