উপকূলীয় উপজেলা বরগুনা আমতলী একসময় নদ-নদী-খাল পরিবেষ্টিত হয়ে থাকলেও আজ মাঠে পরিণত হয়েছে। নদী-খাল হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের পাতা থেকে। এক সময় অসংখ্য নদ-নদী-খাল এই দ্বীপ ভূমির উপর জালের মতো শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে প্রবহমান ছিল প্রায় ৫শ’ কি. মি.। অর্ধশত বছর পূর্বেও জোয়ারের পানিতে ভাসতো সমগ্র আমতলীর ঘর-বাড়ি, মাঠ-ঘাট, হাট-বাজার, রাস্তা-ঘাট প্রায় সবই। এ সময় আমতলীর দক্ষিণ সীমানা দিয়ে প্রবাহিত ছিল ভয়ঙ্কর বঙ্গোপসাগর, উত্তর-পশ্চিম সীমানা দিয়ে ভয়াল, ভয়ঙ্কর প্রমত্তা পায়রা নদী, বিঘাই নদী, উত্তর-পূর্ব সীমানা দিয়ে প্রবাহিত ছিল আগুনমুখা, রামনাবাদ নদী, দক্ষিণ-পূর্বভাগে প্রবাহিত ছিল বঙ্গোপসাগর আন্ধারমানিক নদী। অভ্যন্তরভাগে প্রবাহিত ছিল তালতলীখাল, নিদ্রা, জয়ালভাঙ্গা, চরপাড়া, নিউপাড়া, ছোটবগী, সুন্দরীয়া, পঁচাকোড়ালিয়া, প্রভৃতি নদী। এসব নদ-নদী প্রবল প্রমত্তা এবং খরস্রোতা ছিল। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছিল পায়রা, আগুনমুখা ও আন্ধারমানিক নদী। পায়রা, বিঘাই, চাওড়া, আগুনমুখা, রামনাবাদ ও আন্ধারমানিক দিয়ে স্টিমার ও লঞ্চ চলাচল করতো। অন্য অনেক নদী দিয়ে লঞ্চ ও বড় বড় নৌকা ইত্যাদি চলাচল করতো। আমতলী সদর থেকে চতুর্দিকে নৌ যাতায়াতের সুযোগ ছিল। আমতলী-গলাচিপা, আমতলী-কলাপাড়া, আমতলী-পটুয়াখালী, আমতলী-তালতলী এবং আমতলী-গাজীপুর যাতায়াতে কোনো সমস্যা ছিল না। অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে পরস্পর নৌ-যোগাযোগ অবারিত ছিল। মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রেও কোনো সমস্যার সৃষ্টি হতো না মৎস্যসম্পদ ছিল অফুরন্ত। তবে তখন এলাকাবাসীর জন্য যে সমস্যাটি অত্যন্ত প্রকট ছিল, তা হলো সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও লোনা পানির অনুপ্রবেশ। এতে জানমাল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতো। এই প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে পাকিস্তান আমলে ১৯৫৯ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ বা ওয়াপদা নামে একটি সংস্থার সৃষ্টি করে। সংস্থাটি ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৬৫ সালে জুন মাস পর্যন্ত সময়ের মধ্যে আমতলী উপজেলায় ২৫৫ কি. মি. বেড়িবাঁধ ও প্রায় অর্ধশতাধিক সøুইস গেট নির্মাণ করে। ফলে আমতলীর সমগ্র এলাকা বেড়িবাঁধের অভ্যন্তরে পড়ে। শুধু বড়বগী, ছোটবগী, পঁচাকোড়ালিয়া, আড়পাঙ্গাশিয়া, আমতলী, কচুপাত্রা, রাওগা, বাঁশবুনিয়া, ঘুঘুমারি, ধানখালী, গাজীপুর, সোনাখালী, সুবান্ধী, চাওড়া, গুলিশাখালী ও বাদুরা প্রভৃতি নদীর প্রবাহ খোলা রাখা হয়। অন্যসব নদ-নদী-খাল বেড়িবাঁধের আওতায় নিয়ে নেয়া হয়। ওয়াপদার এ বেড়িবাঁধের ফলে এলাকাবাসী জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে জান-মালের নিরাপত্তা পেয়েছে। সাগরের লোনা পানির অনুপ্রবেশ রোধ হয়েছে। ধান ও রবিশস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন হয়েছে। বেড়িবাঁধের ফলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নৌ চলাচলের। অর্ধ শতাব্দীকালের মধ্যেই আমতলীর অধিকাংশ নদ-নদী-খাল মরে যেতে শুরু করলো। বেড়িবাঁধের অভ্যন্তরের নদ-নদী-খালগুলো ক্রমে ভরাট হয়ে সমতল ভূমিতে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। গত ৫০ বছরের মধ্যে আমতলীর এসব নদ-নদী-খাল দ্রুত মরে যাচ্ছে। আমতলীকে এখন ‘মরা নদীর বিল’ বললেও বেশি বলা হবে না। আমতলী কৃষি অফিসার মো. রাসেল জানান- নদী-খাল ভড়াটের কারণে কৃষির পানি সংকট এবং বর্ষার মৌসুমে অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতার জন্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মাদ জাফর আরিফ চৌধুরী বলেন- নদী খালের তালিকা অনুযায়ী সরজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আমতলীর নদী-খাল হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের পাতা থেকে
আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি
৪ মার্চ (বুধবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
