টানা ৭ মাস ধরে কমছে রপ্তানি আয়

টানা ৭ মাস ধরে কমছে রপ্তানি আয়

ফন্ট সাইজ:

রপ্তানি আয় কমছেই। টানা সাত মাস ধরে কমছে। গত বছরের আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারির পর ফেব্রুয়ারিতেও কমেছে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচক। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন রপ্তানিকারকরা। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক নিয়ে অস্থিরতার কারণেই রপ্তানি আয় কমছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি আয় আরও কমবে। এতে অর্থনীতিতে সংকট বাড়বে বলে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকরা। সোমবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অষ্টম মাস ফেব্রুয়ারি পণ্য রপ্তানি থেকে ৩৪৯ কোটি ৫২ লাখ (৩.৪৯ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ, যা গত বছরের ফেব্রুয়ারির চেয়ে ১২.০৩ শতাংশ কম। আর আগের মাস জানুয়ারি চেয়ে কম প্রায় ২১ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের অষ্টম মাস ফেব্রুয়ারিতে পণ্য রপ্তানি থেকে ৩৯৭ কোটি ৩১ লাখ (৪.৪১ বিলিয়ন) ডলার।

সামগ্রিক হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) পণ্য রপ্তানি থেকে আয় কমেছে ৩.১৫ শতাংশ। এই আট মাসে (গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি) ৩ হাজার ১৯০ কোটি ৫৮ লাখ (৩১.৯০ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৩ হাজার ২৯৪ কোটি ২৬ লাখ (৩২.৯৪ বিলিয়ন) ডলার।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক থেকে আয় কমার কারণেই রপ্তানি বাণিজ্যে এই বেহাল দশা হয়েছে। নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি- এই চার মাসকে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশে পোশাক রপ্তানির ভরা মৌসুম (পিক আওয়ার) বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ এই চার মাসে পোশাক রপ্তানি থেকে বেশি আয় হয়ে থাকে।
কিন্তু এবার তার ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ট্রাম্প শুল্পের ধাক্কায় ওলটপালট বিশ্ব পরিস্থিতিতে এই হাল হয়েছে বলে জানিয়েছেন রপ্তানিকারকরা।

তথ্য মতে, রপ্তানি আয়ে বড় উল্লম্ফন নিয়ে শুরু হয়েছিল ২০২৫-২৬ অর্থবছর; অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পণ্য রপ্তানি থেকে ৪৭৭ কোটি (৪.৭৭ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়, যা ছিল গত অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের চেয়ে ২৪.৯০ শতাংশ বেশি। কিন্তু দ্বিতীয় মাস আগস্টে এসেই হোঁচট খায়। ওই মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে ৩৯১ কোটি ৫০ লাখ (৩.৯১ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়েছিল। গত বছরের আগস্ট মাসের চেয়ে কমেছিল ২.৯৩ শতাংশ। তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে আয় হয় ৩৬২ কোটি ৭৫ লাখ (৩.৬২ বিলিয়ন) ডলার; কমেছিল ৫.৬৬ শতাংশ। চতুর্থ মাস অক্টোবরে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয় ৩৮২ কোটি ৩৮ লাখ (৩.৮২ বিলিয়ন) ডলার। যা ছিল গত বছরের অক্টোবরের তুলনায় ৭.৪৩ শতাংশ কম। পঞ্চম মাস নভেম্বরে ৩৮৯ কোটি ১৫ লাখ (৩.৮৯ বিলিয়ন) ডলার আয় করে বাংলাদেশ, যা ছিল গত অর্থবছরের পঞ্চম মাস নভেম্বরের চেয়ে ৫.৫৪ শতাংশ কম।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায় ষষ্ঠ মাস ডিসেম্বরে; ওই মাসে কমে ১৪.২৫ শতাংশ কম। ডিসেম্বরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৩৯৬ কোটি ৮৩ লাখ (৩.৯৭ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আয়ের অঙ্ক ছিল ৪৬২ কোটি ৭৫ লাখ (৪.৬৩ বিলিয়ন) ডলার। সপ্তম মাস জানুয়ারিতে কমে ০.৫০ শতাংশ। ওই মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে ৪৪১ কোটি ৩৬ লাখ (৪.৪১ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়। গত জানুয়ারিতে আয়ের অঙ্ক ছিল ৪৪৩ কোটি ৬০ লাখ (৪.৪৪ বিলিয়ন) ডলার।

কেন কমছে রপ্তানি আয় জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গত সাত মাস ধরে আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কহার সারা বিশ্বের রপ্তানি বাজারকে ওলটপালট করে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও, যেখানে আমাদের রপ্তানি উল্লেখযোগ্য ধাক্কা খাচ্ছে। এ ছাড়া সাধারণত যেকোনো জাতীয় নির্বাচনের আগে আমাদের রপ্তানি আদেশ কিছুটা কমে যায়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। সব সংশ্রয় কাটিয়ে একটা ভালো নির্বাচন হয়েছে দেশে। আমরা আশা করেছিলাম নতুন সরকার শিল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেবে; রপ্তানি আয় ফের ইতিবাচক ধারায় ফিরবে। কিন্তু এরই মধ্যে আরেকটি ধাক্কা খেলাম আমরা। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় বড় সক হিসাবনিকাশ পাল্টে গেছে। জানি না এই যুদ্ধ কতোদিন চলবে; আমাদের কী হবে? বলেন মোহাম্মদ হাতেম।

বাংলাদেশ চেম্বারের বর্তমান সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, একটার পর একটা ধাক্কা লেগেই আছে; সেই যে করোনা মহামারি থেকে শুরু হয়েছিল। তার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ট্রাম্প শুল্ক, দেশে আন্দোলন-সংগ্রাম, গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন; সংকটের পর সংকট। নতুন সরকার আসার পর ভেবেছিলাম সবকিছু এখন ভালোর দিকে যাবে। কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নিতে না নিতেই শুরু হয়ে গেছে আরেকটি যুদ্ধ। জানি না আমাদের কপালে কী আছে?
ইপিবি’র তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে হিমায়িত খাদ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশল পণ্য ও চামড়াবিহীন জুতা রপ্তানি বেড়েছে। তবে প্রধান পণ্য তৈরি পোশাকসহ কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে।

ইপিবি’র তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সর্বোচ্চ ২ হাজার ২৯৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২.৪৩ শতাংশ কম। শুধু জানুয়ারিতে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩৬১ কোটি ডলারের, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ১.৩৫ শতাংশ কম।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানি খাত চামড়া। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ৭১ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৩২ শতাংশ বেশি। জানুয়ারি মাসে পৌনে ১০ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৬ শতাংশ বেশি।
তৃতীয় বৃহত্তম খাত কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য। সাত মাসে এ খাত থেকে রপ্তানি হয়েছে ৬১ কোটি ডলারের পণ্য, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কম। জানুয়ারি মাসে ৭ কোটি ডলারের কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রপ্তানি কমেছে ৬.৬৫ শতাংশ।

চতুর্থ অবস্থানে থাকা পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে সাত মাসে আয় হয়েছে ৪৯ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১.৯৭ শতাংশ বেশি। জানুয়ারি মাসে সাড়ে ৭ কোটি ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এতে হয়েছে প্রবৃদ্ধি ১২ শতাংশ।

পঞ্চম শীর্ষ রপ্তানি খাত হোম টেক্সটাইল আয় করেছে ৫১ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.২৬ শতাংশ বেশি। জানুয়ারিতে রপ্তানি হয়েছে ৮ কোটি ৭১ লাখ ডলারের হোম টেক্সটাইল পণ্য, প্রবৃদ্ধি ৪.৮৯ শতাংশ। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ৩১ কোটি ডলারের চামড়াবিহীন জুতা, ৩০ কোটি ডলারের হিমায়িত খাদ্য, ১৭ কোটি ডলারের প্লাস্টিক পণ্য ও ৩৭ কোটি ডলারের প্রকৌশল পণ্য রপ্তানি হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন