উন্নয়ন ও শৃঙ্খলা একে অপরের পরিপূরক- এটি কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, রাষ্ট্রপরিচালনার মৌলিক দর্শন। অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্পায়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি- এসব দৃশ্যমান অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসন দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। এই প্রেক্ষাপটে দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিছক প্রশাসনিক ঘোষণা নয়; বরং এটি রাষ্ট্রচিন্তার একটি সুস্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান।
নবনিযুক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন- অপরাধ দমনে কোনো শিথিলতা নয়। মহাসড়কে চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ডাকাতি বন্ধে কঠোর নজরদারি, মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান, থানায় সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা- এসব নির্দেশনা প্রমাণ করে যে কঠোরতার সঙ্গে জবাবদিহিতা ও শৃঙ্খলার সমন্বয়ই এখন সরকারের অগ্রাধিকার।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে- কেবল প্রশাসনিক নির্দেশে কি এই দীর্ঘদিনের সামাজিক ব্যাধি নির্মূল সম্ভব? বাস্তবতা বলছে, কাজটি সহজ নয়। এখানেই গঠনমূলক সমালোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো- সমালোচনা থাকবে, মতভেদ থাকবে, প্রশ্ন থাকবে; কিন্তু তা হতে হবে দায়িত্বশীল, তথ্যভিত্তিক ও উদ্দেশ্যনিরপেক্ষ। অকারণ নিন্দা নয়, বরং বাস্তবতার আলোকে সংশোধনের পথ দেখানোই গঠনমূলক সমালোচনার প্রকৃত কাজ।
সরকারপ্রধানতারেক রহমান বারবার আহ্বান জানিয়েছেন- সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করুন। এই আহ্বান কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি গণতান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। যে সরকার সমালোচনাকে ভয় পায় না, বরং তা গ্রহণ করে আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে, সেই সরকারই দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে।
দখল-চাঁদাবাজির প্রশ্নে সমালোচনার যথেষ্ট ক্ষেত্র রয়েছে। জনগণ জানতে চায়- আইনের প্রয়োগ কি সবার জন্য সমান? প্রভাবশালী কেউ কি আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে? দলীয় পরিচয়ের আড়ালে কেউ কি দায়মুক্তি পাচ্ছে? এসব প্রশ্ন তোলা মানেই সরকারের বিরোধিতা নয়; বরং এটি রাষ্ট্রযন্ত্রকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে তোলার একটি প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় চাঁদাবাজি বহুস্তরীয় ও বহুমাত্রিক। বাজারে দোকান বসাতে চাঁদা, পরিবহনে ‘লাইন খরচ’, ঠিকাদারিতে অঘোষিত ভাগ- এসবের আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই বর্তায়। পণ্যের দাম বাড়ে, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, ব্যবসায়িক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাদক সমাজের কর্মক্ষম যুবশক্তিকে বিপথে ঠেলে দেয়। জমি দখল ও সন্ত্রাস আইনের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল করে। ফলে দখল-চাঁদাবাজি কেবল আইনশৃঙ্খলার ইস্যু নয়; এটি অর্থনীতি, সমাজ ও নৈতিকতার গভীর সংকট।
এখানে একটি কঠিন সত্য স্বীকার করতেই হবে- এ ধরনের সর্বগ্রাসী ব্যাধি একা সরকারের পক্ষে নির্মূল করা সম্ভব নয়। আইন প্রয়োগ রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কিন্তু সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা সমাজের দায়িত্ব। ব্যবসায়ী যদি নীরবে চাঁদা দিয়ে যান, নাগরিক যদি অভিযোগ করতে ভয় পান, রাজনৈতিক কর্মী যদি দলীয় পরিচয়ের আড়ালে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন—তবে কোনো অভিযানই দীর্ঘস্থায়ী সুফল বয়ে আনবে না।
অতএব প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। প্রশাসন কঠোর হবে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব আত্মশুদ্ধির দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে, আর সমাজ সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকা নেবে। গণমাধ্যম অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করবে, নাগরিক সমাজ জবাবদিহিতা দাবি করবে, ব্যবসায়ী সংগঠন ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেবে। এই সামাজিক প্রতিরোধই অপরাধচক্রকে দুর্বল করার কার্যকর উপায়।
গঠনমূলক সমালোচনা এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যদি কোনো এলাকায় অভিযান হয় কিন্তু মূল হোতারা ধরা না পড়ে, প্রশ্ন তোলা দরকার। যদি থানায় হয়রানির অভিযোগ ওঠে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। যদি দলীয় কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়, সংশ্লিষ্ট দলকেই আগে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় না; বরং তা আরও শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক কর্মীদের জন্যও এটি আত্মসমালোচনার সময়। দলীয় প্রধানের ঘোষিত অবস্থান যদি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত না হয়, তবে তা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয় নৈতিক ব্যর্থতাও বটে।
নেতৃত্বের সদিচ্ছা কার্যকর করতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা অপরিহার্য। প্রয়োজন হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে; কারণ ব্যক্তি নয়, আদর্শই দলের আসল শক্তি।
বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে-এটি বাস্তবতা। কিন্তু উন্নয়নকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে আইনের শাসন নিশ্চিত করতেই হবে। দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান তাই সময়ের দাবি। তবে সেই কঠোরতা যেন ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও আইনি প্রক্রিয়ার সীমা অতিক্রম না করে সেটিও সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই- সরকার কাজ করবে, জনগণ নজর রাখবে; সরকার সিদ্ধান্ত নেবে, নাগরিক প্রশ্ন তুলবে; ভুল হলে সংশোধন হবে। এই পারস্পরিক আস্থা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতিই রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে।
দখল-চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার নেতৃত্ব দেবে, আইন প্রয়োগ করবে; কিন্তু সমাজের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া এই লড়াই জয় করা কঠিন। গঠনমূলক সমালোচনা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয়েই কেবল সম্ভব হতে পারে একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]
দখল-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর সরকার: গঠনমূলক সমালোচনাই কাম্য
আহসান হাবিব
মত-মতান্তর
৩ মাস আগে
৩ মার্চ (মঙ্গলবার), ২০২৬, ৯ঃ৪১ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
