‘চ্যাম্পিয়ন’ চীনের কাছে ২ গোলে হার বাংলাদেশের

‘চ্যাম্পিয়ন’ চীনের কাছে ২ গোলে হার বাংলাদেশের

ফন্ট সাইজ:

ওয়েস্ট সিডনির কমব্যাংক স্টেডিয়ামে এশিয়ার বড় মঞ্চে প্রথম ম্যাচ। প্রতিপক্ষ চীনের বিপক্ষেও প্রথম লড়াই। একে তো বর্তমান চ্যাম্পিয়ন, তার ওপর সিডনি জুড়েই চীনা মানুষের ছড়াছড়ি। কমব্যাংক স্টেডিয়ামের গ্যালারির একটা বড় অংশই ছিল চীনাদের দখলে। ম্যাচের ১৪তম মিনিটে সেই চীনা দর্শকদের স্তব্ধ করে দেন ঋতুপর্ণা চাকমা। প্রায় ৩৫ গজ দূর থেকে তার নেয়া শট চীনের গোলরক্ষক চেন চেন কোনোমতে লাফিয়ে রক্ষা না করলে ম্যাচের চিত্রটাই পাল্টে যেতে পারতো। ৯০ মিনিটের লড়াই শেষে সেটা হয়তো হয়নি। এশিয়ার সেরার মঞ্চে চীনকে রুখে দিতে পারেনি বাংলাদেশ। প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে হজম করা দুই গোলেই ম্যাচের ফলাফল নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশ হারলেও আফঈদা-মনিকাদের চোখে চোখ রেখে করা লড়াই আশা জাগাচ্ছে। আগামী শুক্রবার উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে এই মাঠেই খেলবে বাংলাদেশ। পার্থে ৯ই মার্চ আফঈদাদের প্রতিপক্ষ উজবেকিস্তান। এই দুই ম্যাচের একটি জিতলে সেরা আটে খেলার সুযোগ থাকবে বাংলাদেশের। আশা জাগবে বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকের।
ম্যাচ ঘিরে সিডনিতে থাকা বাংলাদেশিদের উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রথমবারের মতো এশিয়ার মেয়েদের ফুটবলের সর্বোচ্চ আঙিনায় আফঈদা-ঋতুপর্ণাদের পা রাখার মুহূর্তটি স্মরণীয় করে রাখতে লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে, জার্সি গায়ে জড়িয়ে গ্যালারিতে আসেন অনেকেই। এই প্রতিযোগিতায় চীন রেকর্ড নয়বারের চ্যাম্পিয়ন, বর্তমান শিরোপাধারীও তারা। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রথম পা রেখেছে এই মঞ্চে। শক্তিশালী চীনের বিপক্ষে শুরুর একাদশে মিলি আক্তারকে রেখে বাংলাদেশ কোচ পিটার জেমস বাটলার একটু চমকই দেখান। পরপর দু’টি নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ী এবং গত নারী ফুটবল লীগে খেলা ১০ ম্যাচের সবগুলোতে ‘ক্লিনশিট’ রাখা রূপনা চাকমা এতদিন ছিলেন প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক। তাকে বেঞ্চে রেখে মিলির ওপর আস্থা রাখেন বাটলার। মিলি অবশ্য হতাশ করেননি পিটার বাটলারকে। দু’-একটি ভুল বাদ দিলে পুরো ম্যাচেই অসাধারণ খেলেন অভিষিক্ত এই গোলরক্ষক। ধারে-ভারে এগিয়ে থাকা চীন অবশ্য শুরু থেকে বাংলাদেশকে চেপে ধরার চেষ্টা করে। চতুর্থ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে লিউ জিংয়ের শট দূরের পোস্টের বাইরে দিয়ে যায়। দ্বাদশ মিনিটে বাম দিক থেকে ওয়াং সুয়াংয়ের শট ফিস্ট করে মিলি ফেরানোর পর বল যায় চীনের এক খেলোয়াড়ের পায়ে। তার ফিরতি পাসে ওয়াংয়ের হেড পোস্টের বাইরের দিকে লেগে বেরিয়ে যায়। দুই মিনিট পরই চোখধাঁধানো এক গোলের উচ্ছ্বাসে ভাসতে পারতো বাংলাদেশ। প্রায় ৩৫ গজ দূর থেকে ঋতুপর্ণার শট অনেকটা লাফিয়ে ফিস্ট করে কোনোমতে ক্রসবারের ওপর দিয়ে বের করে দেন চীন গোলরক্ষক চেন চেন। ১৯তম মিনিটে ওয়াংয়ের শট আটকাতে গিয়ে কিছুটা তালগোল পাকিয়ে বসেছিলেন মিলি। তবে এ দফায় গড়িয়ে গড়িয়ে পোস্টের দিকে যাওয়া বল ছুটে এসে ক্লিয়ার করেন শিউলি আজিম। এরপরই উরিগুমুলার শট তড়িৎ পা চালিয়ে আটকে বাংলাদেশের ত্রাতা মিলি। কিছুটা অস্বস্তি বোধ করায় মাঠে শুয়ে কিছুক্ষণ চিকিৎসা নিয়ে ফের খেলা শুরু করেন মিলি। এরপরই ২৪তম মিনিটে উরিগুমুলার ক্রসে ওয়াং হেডে বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে গোল হয়নি। বাংলাদেশের প্রতিরোধের দেয়ালে চিড় ধরে ৪৪তম মিনিটে। সতীর্থের থ্রু পাস ধরে ওয়াংয়ের দৃষ্টিনন্দন কোণাকুণি শট দূরের পোস্ট দিয়ে জালে জড়ায়। মিলি তেমন কোনো প্রতিরোধ গড়ার সুযোগই পাননি। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের শুরুর দিকে আবারো বাংলাদেশের জালে বল, এবার কিছুটা দুর্ভাগ্যও ছিল। প্রতিপক্ষের আক্রমণ মিলি ফিস্ট করার পর বল চলে যায় ঝ্যাং রুইয়ের কাছে। তার নিচু শট ডিফেন্ডার কোহাতি কিস্কুর পায়ে লেগে দিক পাল্টে মিলিকে বিভ্রান্ত করে জালে জড়ায়। দ্বিতীয়ার্ধে খেলার ধরনে একটু পরিবর্তন এনে কাউন্টার অ্যাটাক নির্ভর খেলা শুরু করে বাংলাদেশ। মাঝমাঠে মারিয়া মান্দা ও মনিকা চাকমা বারবার আটকে দিচ্ছিলেন চীনের আক্রমণ। ডিফেন্সেও সমানতালে লড়াই করেছেন আফঈদা-নবিরনরা। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে তিনটি পরিবর্তন আনেন পিটার জেমস বাটলার। শিউলি, উমহেলা মারমা ও নবিরন খাতুনকে তুলে হালিমা খাতুন, স্বপ্না রানী ও তহুরা খাতুনকে নামান তিনি। দলের খেলায় ধার বাড়ে কিছুটা। ৫৯তম মিনিটে ছোট বক্সের একটু উপরে বল পান তহুরা, কিন্তু হেড ঠিকঠাক না হওয়ায় বল থাকেনি লক্ষ্যে।
বাংলাদেশের জার্সিতে আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীর অভিষেক হয় ৮৬তম মিনিটে। শামসুন্নাহার জুনিয়রের বদলে নামেন সুইডেন প্রবাসী এই মিডফিল্ডার। প্রবাসী আনিকা মাঠে নামতেই অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা ‘বাংলাদেশ-বাংলাদেশ’ স্লোগানে আওয়াজ তুলেন গ্যালারিতে। দ্বিতীয়ার্ধে দল আর কোনো গোল হজম না করলেও, তহুরা-মনিকাদের মতো তারাও শেষ পর্যন্ত মাঠ ছাড়েন হারের হতাশা নিয়ে। গ্রুপে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে শুক্রবার প্রতিযোগিতার তিনবারের চ্যাম্পিয়ন উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে খেলবে বাংলাদেশ। উজবেকিস্তানকে ৩-০ গোলে হারিয়ে মঙ্গলবার গ্রুপ পর্বে যাত্রা শুরু করেছে উত্তর কোরিয়া। গ্রুপ পর্বে তৃতীয় স্থান পাওয়া তিন দলের মধ্যে সেরা দুই দল পাবে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট। এই সমীকরণ মেলাতে হলে গোল ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সেদিক থেকে উজবেকিস্তানের চেয়ে একটু এগিয়ে থাকার স্বস্তি অন্তত আছে বাংলাদেশের। প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপে খেলার ইতিহাস গড়া ম্যাচে প্রাপ্তি বলতে এতটুকুই!

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন