জয়সূচক রান নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলেন সাঞ্জু স্যামসন। দুই হাত জোড় করে বুকে আঁকলেন ক্রুশ চিহ্ন। চোখ বুজে নিভৃতে সারলেন প্রার্থনা। পাশে তখন গগনবিদারী চিৎকার, অথচ সাঞ্জু যেন ডুবে ছিলেন নিজের গহিনে। এই এক ইনিংসেই ভিঝিনজামের সেই শান্ত কিশোরটি বড় মঞ্চে নিজেকে অন্যরূপে চিনিয়ে নিলেন। ইডেন গার্ডেনসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সাঞ্জু স্যামসনের ৯৭ রানের ইনিংসটি বাঁচালো দেড়শ’ কোটি ভারতীয় সমর্থকের আশা। অলিখিত কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৫ উইকেটে হারিয়ে এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠে ভারত। ভিঝিনজামের সেই ধর্মভীরু ছেলেটিই হয়ে ওঠেন ইডেনের মহানায়ক।
কোট্টাপুরাম জংশনের আঁকাবাঁকা পথটি মিশেছে সেন্ট মেরি’স ভিঝিনজাম ফুটবল মাঠে। এটি কেরালা তনয় সাঞ্জু স্যামসনের শৈশবের প্রথম খেলার মাঠ। মাঠের পাশেই সমুদ্র সৈকত আর চারশ’ বছরের পুরনো সেন্ট মেরি’স গির্জা। এর চূড়ায় ক্রুশ আর ছাদে মা মেরির চ্যাপেল। মৎস্যজীবী অধ্যুষিত এই জনপদের হৃদস্পন্দন হলো এই উপাসনালয়। ভিঝিনজামের মানুষের অস্তিত্বজুড়ে রয়েছে বিশ্বাস। উত্তাল সমুদ্রে জীবনযুদ্ধে নামার আগে তারা পরম করুণাময়ের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। লাতিন ক্যাথলিকদের এই জনপদে প্রতিটি ঘরের আঙিনা বা দেয়ালে সগৌরবে শোভা পায় মা মেরির প্রতিকৃতি। এখানকার উৎসবের দিনগুলোতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই গির্জায় সমবেত হন। এই দৃঢ় বিশ্বাস আর প্রার্থনার আবহে বেড়ে উঠেছেন সাঞ্জু স্যামসন। শৈশবে ভাইয়ের সঙ্গে নিয়মিত সানডে স্কুলে যেতেন তিনি। গির্জার শোভাযাত্রায় সাঞ্জুর পরিবার থাকতো সবার আগে। প্রতিবেশী ও চেনা মানুষদের কাছে তিনি আজও সেই নম্র ও বিনয়ী কিশোর। সাঞ্জুর ব্যক্তিত্বে বিশ্বাসের শিকড় অত্যন্ত গভীর। শরীরে কোনো ধর্মীয় চিহ্ন বা ট্যাটু নেই। তবে ইডেন গার্ডেনসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জয়সূচক রানের পর তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ আর প্রত্যাশার চাপ যেন এক নিমিষেই প্রার্থনায় রূপ নিলো। এই নীরব উদ্যাপন নিয়ে পরে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি একান্তই ব্যক্তিগত। বারবার ব্যর্থতা আর নিজেকে নিয়ে সংশয় তাকে ঘিরে ধরেছিল। তবুও তিনি বিশ্বাস হারাননি। সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদেই তিনি নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করতে পেরেছেন। নিউজিল্যান্ড সিরিজে অফ-ফর্মে থাকার সময় তিনি প্রতিটি নেট সেশনে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। ব্যাটিং কোচ সিতাংশু কোটাকের অধীনে নিজের কৌশলে সূক্ষ্ম পরিবর্তন এনেছেন। ভারসাম্য বজায় রেখে দ্রুত ব্যাট চালাতে তিনি শিখলেন। এর ফল মিলে হাতেনাতে।
সাঞ্জুর সাফল্যের শেকড় তার উদার মানবিকতায় নিহিত। তিনি প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করেন। কেরালার কান্নুর জেলায় এক অসহায় পরিবারকে ঘর তৈরি করে দিয়েছেন কোনো গণমাধ্যমের প্রচারণা ছাড়াই। গির্জার ফাদারের এক ফোনেই তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। ভিঝিনজামের স্থানীয় স্কুলের শত শত শিক্ষার্থীকে শিক্ষার সরঞ্জাম যোগাড় করে দিয়েছে তার নিজস্ব ফাউন্ডেশন। সেখানে কোনো টিভি ক্যামেরার ভিড় বা বিজ্ঞাপনের তোড়জোড় ছিল না। সাধারণ মানুষের কাছে সাঞ্জু একদম ঘরের ছেলে। কোচিতে প্রশিক্ষণের সময় হোটেল থেকে মাঠে যাওয়ার জন্য তিনি সাধারণ অটো-রিকশায় চড়েন। তিরুবনন্তপুরমের রাস্তায় হাঁটেন খুব সাদামাটাভাবে। মালয়ালি ভাষায় যাকে বলে ‘জাদা’। সেই মেকি অহংকারের লেশমাত্র নেই তার আচরণে।
ভিঝিনজামের মানুষ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, ঈশ্বর তার প্রিয় সন্তানকে কখনো ত্যাগ করেন না। যখন সাঞ্জু মাঠে ব্যাটিংয়ে নামেন, পুরো শহর যেন তার জন্য মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা শুরু করে। তার দাদা অ্যান্তোনিসের ঠোঁটে সবসময় থাকে শুভকামনা এবং পবিত্র প্রার্থনা। ইডেনের সেই ৫০ বলে ৯৭ রানের ইনিংসটি ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য কেবল একটি জয় নয়, বরং একটি জনপদের অদম্য বিশ্বাসের প্রতিফলন। কেরালা থেকে আসা এই ক্রিকেটার এখন কোটি তরুণের অনুপ্রেরণা। ক্যারিবীয়দের হারিয়ে ভারতকে ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তোলা এই ইনিংসটিকে ভিঝিনজামের মানুষ মা মেরির এক বিশেষ দান হিসেবে দেখছেন। ইডেনের সেই রাত ভিঝিনজামের মানুষের কাছে হয়ে রইলো এক চিরস্থায়ী উদ্যাপনের মহাকাব্য। সাঞ্জু স্যামসন এখন কেবল একজন তারকা ক্রিকেটার নন, তিনি এক মফস্বল থেকে উঠে আসা অদম্য বিশ্বাসের জীবন্ত নাম। ভিঝিনজামের সেই শান্ত কিশোরটি বিশ্ব ক্রিকেটের আকাশে এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা।
ইডেনের নায়ক ভিঝিনজামের সাঞ্জু
স্পোর্টস ডেস্ক
৪ মার্চ (বুধবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
