ইরানে হামলা ‘অন্ধভাবে উড়া’র মতো

ইরানে হামলা ‘অন্ধভাবে উড়া’র মতো

ফন্ট সাইজ:

মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা উপেক্ষা করে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলায় যুক্ত হওয়ার পরক্ষণেই ইরান পাল্টা আঘাত হেনেছে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর ওপর। শীর্ষ নেতৃত্ব ও স্থাপনা ধ্বংসের এক নিমেষের মধ্যে ইরানের রুখে দাঁড়ানোর ঘটনা অভাবনীয়। কাবু হওয়ার বদলে প্রতিরোধ ও প্রতিশোধে ইরান যে বিক্রম প্রদর্শন করছে, তা এই সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করতে পারে। এমনকি, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত থেকে আরও বড় যুদ্ধের পটভূমি তৈরি হওয়াও অসম্ভব নয়।

ইরানে আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের একটি দ্রুত ও তুলনামূলক ‘সহজ’ বিজয়ের সম্ভাবনা নাকচ করা যায়। বাস্তবে তেহরানের সরকার টিকে আছে এবং হামলার বীরোচিত জবাব দিচ্ছে। রাশিয়া, চীনের নৈতিক সমর্থন এখনও ইরানের বর্তমান সরকারের পক্ষে। মেরুকরণ অসম হলেও ইরান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েল গোষ্ঠীর একটি স্পষ্ট বিভাজন রেখা তৈরি হয়েছে। কূটনৈতিক স্তর পেরিয়ে উভয় পক্ষ সমরক্ষেত্রেও সক্রিয় হলে পরিস্থিতি সত্যিই ভয়াবহ আকার ধারণ করবে, যা ওয়াশিংটনের কল্পনার বাইরে হবে। মার্কিনীদের অতীত যে অভিজ্ঞতা ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া বা আফগানিস্তানে হয়েছে, ইরানের অভিজ্ঞতা হতে তার চেয়ে আলাদা। বরং ভিয়েতনামে যে অপমান পেয়েছিল আমেরিকা, বহু বছর পর ইরানে আক্রমণ করে সেই তিক্ত স্মৃতি আকারে ফিরে পেতে পারে বিশ্বের প্রধান শক্তিমান দেশটি।

খোদ আমেরিকানরা দেখতে পেয়েছেন, ট্রাম্প বিশেষজ্ঞদের বদলে নিজের প্রবৃত্তির ওপর বেশি নির্ভর করেন—যেমন তিনি ভেনেজুয়েলায় দ্রুত ‘সাফল্য’ দেখেছিলেন বলে মনে করেন। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, পরিকল্পনাহীন সামরিক হস্তক্ষেপ ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। উদাহরণ হিসেবে জর্জ ডব্লিউ. বুশ–এর ইরাক যুদ্ধের কথা তুলে ধরা যায়, যেখানে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনার অভাবে দীর্ঘমেয়াদি সহিংসতা, বিপুল প্রাণহানি ও ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যয় হয়েছে। আফগানিস্তানের ক্ষেত্রেও আমেরিকার কঠিন শিক্ষা পাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে ভয় দেখানো বা আক্রমণই শেষ কথা নয়, প্রতিপক্ষের মনোবল ও শক্তি সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা থাকতে হয়। দূরদৃষ্টি দিয়ে দেখতে হয় আক্রমণের প্রভাব, প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল। ইরানের ক্ষেত্রে একরোখা ট্রাম্প বিশেষজ্ঞদের এড়িয়ে গোয়ারের মতো তেমনটিই করেছেন, যা হয়ত তার জন্য ‘ঐতিহাসিক ভুল পদক্ষেপ‘ রূপে ললাট-লিখন হয়ে যেতে পারে।

ঐতিহাসিক প্রজ্ঞার অধিকারী যে কেউ স্বীকার করবেন, ইরানকে ‘বশ মানানো’ ইরাকের চেয়েও অনেক কঠিন—ইরানের জনসংখ্যা দ্বিগুণের কাছাকাছি, সামরিক সক্ষমতা শক্তিশালী, এবং হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুথিদের মতো মিত্র-নেটওয়ার্ক রয়েছে। ইসরায়েলের ২০০৬ সালের লেবানন অভিযানে হিজবুল্লাহর উন্নত সক্ষমতা এই বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। উপরন্তু, ‘রেজিম চেঞ্জ’ করে সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি–কে অপসারণ করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে—ইসলামি আবরণ ছাড়াই কঠোর বিপ্লবী গার্ড ক্ষমতা দখল করতে পারে কিংবা দেশ গৃহযুদ্ধে ভেঙে পড়ে শরণার্থী ঢল ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে ধস নামাতে পারে। কিংবা লড়াকু ইরানি জাতি যুদ্ধবেশে চারপাশে সর্বাত্ম অভিযানে লিপ্ত হয়ে এক অচিন্তনীয় পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটাতে পারে। যার কোনোটিই আমেরিকার জন্য সুখকর হবে না।

ইরানের ক্ষেত্রে বর্তমান মার্কিন নেতৃত্বে অভিজ্ঞতার ঘাটতি স্পষ্ট। ট্রাম্পের গোয়ার্তুমি এক্ষেত্রে প্রায়-ব্যর্থ। মার্কিনিদের তরফে ইরান আক্রমণকে বলা যায় ভুল নীতিনির্ধারণ, যা ‘অন্ধভাবে উড়া’র মতো। মার্কিনিদের মধ্যপ্রাচ্যের অভিজ্ঞতা শিক্ষা দেয়—বোমাবর্ষণ সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয় বরং তা অস্থিতিশীলতা অন্যত্র ছড়িয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত, ট্রাম্প যদি সংঘাত থেকে সরে আসার পথ না খুঁজে নেন, তবে ক্ষতি শুধু তাঁর নয়—পুরো বিশ্বই তার মূল্য দেবে। ট্রাম্পের কারণে এমন অহেতুক ক্ষতি তাঁর মিত্ররাও হয়ত শেষ পর্যন্ত মেনে নিবে না। অন্যদিকে, বিশ্ববাসী তো ঘৃণা জানাতেই থাকবে আমেরিকা-ইসরায়েলি আক্রমণ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। যে যুদ্ধে সামরিক জয়ের আগেই নৈতিক পরাজয় হয়, সেখানে বিজয় অসম্ভব ও অকল্পনীয়। ইরানের মার্কিন-ইহুদি জোট তেমনি এক অসম্ভব ও অকল্পনীয় বিজয়ের দিবাস্বপ্নে যুদ্ধ শুরু করেছে।

লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীকিত বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওন্যাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন