কাতারএনার্জির এলএনজি উৎপাদন বন্ধ, গ্যাসের দাম আকাশছোঁয়া

আল জাজিরার রিপোর্ট

কাতারএনার্জির এলএনজি উৎপাদন বন্ধ, গ্যাসের দাম আকাশছোঁয়া

ফন্ট সাইজ:

ইরানের হামলার পর কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করেছে। এর জেরে ইউরোপ ও এশিয়ায় গ্যাসের দাম হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। একই সময়ে সৌদি আরব জানিয়েছে, ড্রোন হামলার পর আগুন লাগায় পূর্বাঞ্চলের কাছে অবস্থিত রাস তানুরা ওয়েল রিফাইনারির কিছু ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে।

ইরানি হামলায় সৌদি আরবের তেল শোধনাগারের ক্ষতি

সোমবার এক বিবৃতিতে বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদক কাতারএনার্জি জানায়, রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি ও মেসাইয়িদ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে কাতারএনার্জির পরিচালনাধীন স্থাপনায় সামরিক হামলার কারণে আমরা এলএনজি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন বন্ধ করেছি। ঘোষণার পরপরই ডাচ ও বৃটিশ পাইকারি গ্যাসের মানদণ্ডমূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এদিকে এশিয়ার মানদণ্ড এলএনজি দামও প্রায় ৩৯ শতাংশ লাফিয়ে ওঠে।

এর আগে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ইরান থেকে ছোড়া দুটি ড্রোন দেশটিতে হামলা চালায়। এক বিবৃতিতে বলা হয়, একটি ড্রোন মেসাইয়িদের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানির ট্যাংক লক্ষ্য করে এবং অন্যটি রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে কাতারএনার্জির একটি জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এতে কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, হামলার ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মূল্যায়ন করবে এবং পরে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়া হবে।

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)-এর মাধ্যমে জানায়, সোমবার সকালে দুটি ড্রোন রাস তানুরা রিফাইনারিতে হামলার চেষ্টা করে। ড্রোনগুলো প্রতিহত করার পর ছোট আকারের আগুন লাগে। আল জাজিরার যাচাই করা ভিডিও ফুটেজে সৌদি আরবের উপসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত ওই তেল স্থাপনা থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। মন্ত্রণালয় জানায়, রিফাইনারিটি সীমিত ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

বিশ্বের বৃহত্তম তেল শোধনাগারগুলোর একটি রাস তানুরার দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা ৫ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল। এটি সৌদি আরবের জ্বালানি খাতের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। এই হামলার প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালীর দুই পাশে তেলবাহী ট্যাংকার জড়ো হতে দেখা গেছে। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এবং কাতারের অধিকাংশ গ্যাস এই প্রণালী দিয়ে যায়। নৌ-পরিবহন ব্যাহত হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কায় বৈশ্বিক তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তেলের দাম দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮২ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা জানুয়ারি ২০২৫-এর পর সর্বোচ্চ। কাতারএনার্জির উৎপাদন বন্ধের ঘোষণার পর দাম আরও বাড়ে।

ইউরোপীয় এলএনজি দামের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ডাচ টিটিএফ প্রাকৃতিক গ্যাস চুক্তির দাম সকালে ২৫ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। জিএমটির সোমবার সময় সকাল ১১টা ৩১ মিনিটে তা প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় ৭.৪৪ ইউরো বেড়ে ৩৯.৪০ ইউরোতে পৌঁছায়। এদিকে এশিয়ার এলএনজি মানদণ্ড এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জির জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) প্রতি মিলিয়ন বৃটিশ থার্মাল ইউনিটে ১৫.০৬৮ ডলারে অবস্থান করছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ব্যাপক বিমান হামলার পর ইরান প্রধানত ইসরাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

এসপিএতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানায়, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কিছু কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে এবং স্থানীয় বাজারে পেট্রোলিয়াম পণ্যের সরবরাহে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে তারা আশা করছে। এর আগে সপ্তাহান্তে ইরান রিয়াদ ও সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে হামলা চালানোর পর সৌদি আরব জানিয়েছিল, তারা নিজেদের নিরাপত্তা, ভূখণ্ড, নাগরিক ও বাসিন্দাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে।

যুক্তরাষ্ট্র, বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রবিবার এক যৌথ বিবৃতিতে অঞ্চলজুড়ে ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়ে আত্মরক্ষার অধিকারের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করে। লন্ডনের কিংস কলেজ লন্ডনের প্রতিরক্ষা অধ্যয়নের প্রভাষক রব গাইস্ট পিনফোল্ড আল জাজিরাকে বলেন, ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে খুব ভালো করেই জানে সে কী করছে। তিনি বলেন, এই দেশগুলো সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িত নয়, তাই লড়াইয়ের আগ্রহ তুলনামূলক কম। ইরান আশা করছে তারা দ্রুত যুদ্ধবিরতি চাইবে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। তবে এখন পর্যন্ত তার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। পিনফোল্ড আরও বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো অন্তত বক্তব্যের ক্ষেত্রে শক্তি ও ঐক্যের প্রদর্শন করছে।

তারা বার্তা দিতে চাইছে যে তারা এক এবং ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ়। তবে ভেতরে ভেতরে ইরানের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক রাখা হবে বা আদৌ রাখা হবে কিনা- তা নিয়ে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন