মোহাম্মদ শাহ্জাহান। গত রোববার বেলা ১১টার দিকে লক্ষ্মীপুর থেকে আসেন হযরত শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। গন্তব্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি।
সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটের ফ্লাইট। বিমানবন্দরে এসে শাহ্জাহান জানতে পারেন মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের জেরে তার কাক্সিক্ষত ফ্লাইটটি বাতিল হয়ে গেছে। সোমবার দুপুরে বিমানবন্দর এলাকায় অবস্থান করছিলেন শাহ্জাহান। তিনি বলেন, গতকালকে সকালে আমি এয়ারপোর্টে এসে দেখি ফ্লাইট বাতিল করে দিয়েছে। তবুও সারাদিন অপেক্ষা করেছি। এয়ারপোর্টে থেকেও কোন গতি হয়নি। পরে শেওড়া এলাকায় এক আত্মীয়ের মেসে উঠি রাতের জন্য। আজ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় আমি অপেক্ষা করছি। আজ (সোমবার) সকালে আবার এসেছি বিমানবন্দরে। আমি জানি এই যুদ্ধ না থামলে ফ্লাইট চালু হবে না। তাও সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করে দেখছি কি কিছু হয় কিনা। ওদিকে আমি যে মেসে উঠছি ওখানে থাকার সংকট। থাকা যাচ্ছে না। রাতে কোনোভাবে মেসে শুয়ে থেকে আবার বিমানবন্দরে চলে আসলাম। দেখছি অপেক্ষা করে।
গত তিনদিন মোহাম্মদ শাহজাহানের মতো অনেক যাত্রী এসে ফেরত যাচ্ছেন ফ্লাইট বাতিলের জেরে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি বিকাল থেকে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। এ কারণে ওইদিন থেকে সোমবার পর্যন্ত ঢাকার হযরত শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মোট ১০২টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। শুরুতে ফ্লাইট বাতিল হওয়ার খবর যাত্রীরা জানতেন না। ফলে ২৮শে ফেব্রুয়ারি বিমানবন্দরে অবস্থান নেয়া যাত্রীরা আটকা পড়েন। পরের দিন, অর্থাৎ রোববার পর্যন্তও ৭৪টি ফ্লাইট বাতিল হয়। ফলে ওইসব ফ্লাইটের যাত্রীরা বিপাকে পড়ে যান। সর্বশেষ গত সোমবার পর্যন্ত বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর যাত্রীদের অনেকেই আগেই ফ্লাইট বাতিলের খবর জেনে যান। ফলে তাদের অনেকেই বিমানবন্দরে দেখা যায়নি। তবে যাত্রীদের একটি অংশ ফ্লাইট বাতিল জেনেও অনিশ্চিত অপেক্ষা করছিলেন নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাওয়ার জন্য।
সরজমিন বিমানবন্দরে গিয়ে দেখা যায়, আগের মতোই অনেক যাত্রী টার্মিনালের সামনে অপেক্ষা করছিলেন তাদের ব্যগ-মালপত্রসহ। তাদের বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রী। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছেন তারা। তবে, অপেক্ষা করা যাত্রীদের সবার ফ্লাইট বাতিল হয়নি। যাত্রীদের সঙ্গে তাদের আত্মীয়স্বজনরাও অপেক্ষা করছিলেন। তবে ওইসব যাত্রীদের যাদের ফ্লাইট বাতিল হয়নি, তারা কাঙ্ক্ষিত ফ্লাইটের জন্য কয়েক ঘণ্টা আগেই পৌঁছে অপেক্ষা করছিলেন বিমানবন্দরে। যেসব যাত্রীদের ফ্লাইট বাতিল হয়েছে তাদের বেশির ভাগকেই দেখা গেছে টার্মিনালের সামনের স্ক্রিনে বারংবার নিজেদের ফ্লাইট নম্বর মিলাতে। যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকেই ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বিমানবন্দরে তাদের নির্দিষ্ট ফ্লাইট চালু হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। যাত্রীরা জানেন না, কবে নাগাদ তাদের ফ্লাইট চালু হবে। তারা বলছেন, তারা জানেন এখনই ফ্লাইট চালু হচ্ছে না, তবুও অপেক্ষা করছেন। কেউ নির্দিষ্ট সময়, অর্থাৎ ফ্লাইটের সময় পার হয়ে গেলে চলে যাবেন বলে জানান, কেউ পরের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করার কথাও জানান।
চাঁদপুর সদর থেকে এসেছেন মো. কামাল হোসেন। গন্তব্য কাতার। বিমানবন্দরের টার্মিনালের সামনে স্থাপিত স্ক্রিনে থাকা ফ্লাইটসংক্রান্ত তথ্যে নিজের টিকিট থেকে ফ্লাইট নম্বর মিলাচ্ছিলেন তিনি। কথা হলে কামাল হোসেন বলেন, সোমবার সন্ধ্যা সাতটা ১০ মিনিটে বাংলাদেশ ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সে আমার ফ্লাইট ছিল। কিন্তু ফ্লাইটটি বাতিল হয়ে যায়। এখানে এসে আমরা দেখলাম আমাদের ফ্লাইট বাতিল। ফ্লাইট বাতিল হওয়ার পরও কেন এখানে অপেক্ষা করছেন জানতে চাইলে কামাল হোসেন বলেন, আমার টিকিটের মেয়াদ আজকের সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত থাকবে, দেখা যাক, অপেক্ষা করে দেখি। শেষ পর্যন্ত বসে থাকবো। যদি সচল না হয় ঢাকায় আমার এক আত্মীয়ের বাসা আছে চলে যাব সাতটার পরে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের যাত্রী শাহ-আলম বলেন, রোববার সন্ধ্যায় ফ্লাইট ছিল। কালই বাতিল হয়ে যায়। ফ্লাইটের দিন সকাল সকালই আমি চলে আসি। কিন্তু এসে দেখি আমার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এরপর এক রাতের জন্য ২ হাজার টাকায় হোটেল ভাড়া নিয়ে রাত থাকি। আজও (সোমবার) অপেক্ষা করছি, যদি চালু হয়ে যায়।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের যাত্রী মইনুদ্দিন বলেন, আমি কাতার যাবো। সন্ধ্যা সাতটায় ফ্লাইট ছিল। এখানে এসে জানতে পারলাম ফ্লাইট ক্যানসেল হয়েছে। মহিউদ্দিন বলেন- আমি এয়ারপোর্টে আসার পর ইমিগ্রেশনের ঢোকার চেষ্টা করেছি, তারা আমাদের বলেছে ফ্লাইট চালু হলে জানিয়ে দেয়া হবে। সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করবো এরপর যদি না হয় তাহলে আমাকে নোয়াখালী ফিরে যেতে হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসেন ওমর ফারুক। রাত ৯টায় ফ্লাইট থাকলেও সেটি বাতিল হয়ে যায়। তিনি বলেন, আমি অনলাইনে দেখেছি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। কিন্তু এরপরও এসেছি কারণ, এখানে না এলে নিশ্চিত হতে পারতাম না। এখন নিশ্চিত হয়েছি। মন মানে না, রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করবো তবুও। ওমর ফারুক বলেন, আমার ভিসার মেয়াদ আছে ১৫ দিন। এরমধ্যে ফ্লাইট নতুন করে শিডিউল না করতে পারলে ক্ষতি হয়ে যাবে অনেক। সরকারকে বলতে চাই, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের ফ্লাইট নতুন করে শিডিউল করা হোক।
