উপসাগরীয় যুদ্ধ স্মরণে আছে সিলেটের মানুষের। বর্তমান প্রযুক্তির মতো দুনিয়া এত কাছাকাছি ছিল না। তবে যুদ্ধের যতটুকু খবর মিলেছিল তাতেই সিলেট জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। তখনো সিলেটের লাখো শ্রমিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া দেশগুলোতে শ্রমিক হিসেবে কাজে ছিল। ওই যুদ্ধের রণাঙ্গনে আটকে থাকা অনেক শ্রমিকের মুখে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির লোমহর্ষক কাহিনী শুনে আঁতকে উঠেন সিলেটের মানুষ। সেই থেকে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার আতঙ্কের নাম। সময় পাল্টেছে। দুনিয়া এসেছে হাতের মুঠোয়। নেট দুনিয়ার বদৌলতে কোথায় কখন কী হচ্ছে সবই দেখছে মানুষ। ফের অস্থির মধ্যপ্রাচ্য। কোনো দেশই স্বস্তিতে নেই। ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশ ইসরাইল। মিসাইল আছড়ে পড়ছে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে। টার্গেট মার্কিনি ঘাঁটি। ইরানি আক্রমণে তছনছ হচ্ছে এসব ঘাঁটিগুলো। বাহরাইনের অবস্থা ভয়াবহ। সেখানে মার্কিন স্থল ও জল ঘাঁটিতে মুহুর্মুহু মিসাইল হামলা হয়েছে। বাহরাইনে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করা প্রবাসীরা জানিয়েছেনÑ বাহরাইনে হামলা হচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা হচ্ছে। পাল্টাও হচ্ছে। সব মিলিয়ে একটি যুদ্ধক্ষেত্রে আছে মানুষ। সব কিছু স্থবির। জীবন বাঁচানোই এখন দায় বলে মনে করা হচ্ছে।
সোমবার সকালে বাহরাইনে নৌঘাঁটিতে মিসাইল হামলায় এক বাংলাদেশি শ্রমিক মারা গেছেন। পাশের দেশ কাতার। সেখানেই মার্কিন ঘাঁটিতে দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে ইরান। কাতারের বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস করেন। এর সংখ্যা হবে কয়েক লাখ। হামলা ঠেকাতে কাতারেরও প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশিরা। তারা জানিয়েছেন, কাতার সরকার বার বারই সাইরেন বাজাচ্ছে। নিরাপদে থাকার নির্দেশ দিচ্ছে। এতে করে মানুষ সতর্ক হচ্ছে। দুবাইয়ে এরই মধ্যে মিসাইল হামলায় মৌলভীবাজারের বড়লেখার গাজিরটেক এলাকার সালেহ আহমদ নামের এক শ্রমিক মারা গেছে। তিনি পানির ট্যাংকির ট্রাক চালাতেন। আরও কয়েকজন শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে এমন পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় বাংলাদেশের শ্রমিকরা। এর মধ্যে বেশির ভাগই সিলেটের শ্রমিক। তাদের ঘিরে উৎকণ্ঠার অন্ত নেই সিলেটে। নেট দুনিয়ার বদৌলতে যখন তখন খবর নেয়া যাচ্ছে প্রবাসীদের। সরাসরি কথা বলা যাচ্ছে। এতে করে অস্বস্তি কিছুটা কাটলেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কমছে না। ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ দুবাই, কাতার, ওমান, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরবের বাংলাদেশের দূতাবাসের কর্মকর্তারা সক্রিয় হয়েছেন। প্রবাসীদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। এতে করে সিলেটের প্রবাসী পরিবারের মধ্যে আস্থা আরও ফিরেছে। প্রবাসী পরিবারের স্বজন ইউসূফ আহমদ জানিয়েছেন, প্রতি মুহূর্তে আমরা মধ্যপ্রাচ্যের খবর রাখছি। স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে অনেকেই নানা সংকটে পড়েছেন। এ সংকটে দূতাবাসের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হচ্ছে।
সৌদি আরবের মার্কিন ঘাঁটি এলাকাগুলোতেও বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছে। ওই এলাকায় হামলা শুরু হওয়ায় প্রবাসী শ্রমিকরা নিরাপদে রয়েছেন। দেশে থাকা গোলাপগঞ্জের একাধিক স্বজন পরিবার জানিয়েছেন, সৌদি আরবের জিজান এলাকায় কয়েকটি বিস্ফোরণ হওয়ার পর তারা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জানান, ভালো আছেন তাদের স্বজনরা। ঘরেই আছেন। বের হওয়ার অনুমতি মিলেনি। তবে সারাক্ষণ তাদের মধ্যে ভয় আর আতঙ্ক বিরাজ করছে। এদিকেÑ অনেক প্রবাসী ঈদকে সামনে রেখে আসতে চাইছিলেন। ফ্লাইট বন্ধ থাকায় তারা বেকায়দায় পড়েছেন। শুধু যে বাংলাদেশি ফ্লাইট তা নয়, গোটা বিশ্বের কানেকটিং ফ্লাইটও বন্ধ। সিলেটের প্রবাসী পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় আস্থা আছে সরকার প্রধান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীর প্রতি। যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেবেনÑ এমন বিশ্বাস তাদের।
