সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রথম পাতার প্রতিবেদন ‘জুলাইয়ে পুলিশ হত্যা: সনদ মেনে দায়মুক্তি দেবে সরকার’। খবরে বলা হয়, জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকারনামা মেনে চলবে বিএনপি সরকার। গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন সরকারের চালানো হত্যাযজ্ঞ প্রতিরোধে ছাত্র-জনতার কৃতকর্মের বিচার হবে না। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কেউ প্রতিরোধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলেও অভ্যুত্থানকারীদের জন্য দায়মুক্তি অব্যাহত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, জুলাই সনদের অঙ্গীকারনামায় অন্য সব দলের মতো বিএনপিও সই করায় সরকার অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি নিশ্চিত করবে।
সূত্রগুলো জানায়, অভ্যুত্থানকারীদের আইনি দায়মুক্তিতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ' সংসদে আলোচনার পর অনুমোদন করা হবে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল ধরে রাখা এবং সরকারের প্রতি আনুগত্য নিশ্চিত করতে পুলিশ হত্যার বিচার না করার প্রকাশ্য ঘোষণাও দেওয়া হবে না।
সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে দেওয়া দায়মুক্তির ক্ষমতার অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার প্রতিরোধে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে আদালতে নয়, মানবাধিকার কমিশনে যেতে পারবেন। তদন্তে যদি প্রাথমিকভাবে প্রমাণ হয়, প্রতিরোধ নয়; অপরাধমূলক কাজের মাধ্যমে সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীর সদস্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তবে আদালতে বিচার হবে।
প্রতিরোধে ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিবার ক্ষতিপূরণ পাবে।
এই অধ্যাদেশ বলবৎ থাকলেও সম্প্রতি কয়েকটি খবরে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের স্থাপনায় হামলা ও হত্যার বিচারে তদন্তের জন্য 'সবুজ সংকেত' দিয়েছে সরকার। তবে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, এমন কোনো সংকেত দেওয়া হয়নি।
গত শুক্রবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণঅভ্যুত্থানে পুলিশ হত্যার তদন্তের বিষয়ে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেটি বলেছেন, সেটিই হবে। তদন্ত হয়েছে, প্রয়োজন হলে আবারও তদন্ত হবে। বিষয়গুলো যেহেতু আদালতে আছে, আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলবে।
গত শনিবার বিএনপির মহাসচিব নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লেখেন, 'জুলাই অভ্যুত্থানে পুলিশ হত্যার তদন্তের বিষয় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যোট বলেছেন, সেটিই হবে এবং দ্রুত তদন্ত করা হবে।' এ বক্তব্যের ব্যাখ্যা কী, তা মির্জা ফখরুলের কাছ থেকে জানতে পারেনি সমকাল। যদিও জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি এই বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেছে, পুলিশ হত্যার তদন্তের নামে সরকার অভ্যুত্থানকে ভিন্নপথে ঠেলে দিতে চাইছে। জুলাই সনদে দেওয়া আইনি সুরক্ষার অঙ্গীকার লঙ্ঘন করছে। মীমাংসিত বিষয়কে বিতর্কিত করছে।
কী বলেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ দায়িত্ব নেওয়ার পর জুলাই অভ্যুত্থানে পুলিশ হত্যার তদন্তের বিষয়ে কখনও কিছু বলেননি। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি সচিবালয়ে বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই করতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিরীহ মানুষ যাতে ভোগান্তির শিকার না হন, সে জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, ৫ আগস্টের কিছু মামলায় গণহারে আসামি করে নিরপরাধ মানুষকে কষ্ট দেওয়ার বিষয় সামনে এসেছে। আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে এসব মামলা যাচাই করে নিরাপদ ব্যক্তিদের অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সরকারি গেজেট অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের হামলায় ৮৩৪ অভ্যুত্থানকারী শহীদ হয়েছেন। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের ৪৩ সদস্য নিহত হন। আহত আরেকজনের মৃত্যু হয় একই বছরের ১৪ আগস্ট। ৫ আগস্ট ভোররাত পর্যন্ত পুলিশের ৪৬০টি থানায় হামলা হয়।
৪৪ পুলিশ নিহত, গুজবে বেশি
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ও পুলিশ সদরদপ্তর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে একাধিকবার নাম-ঠিকানাসহ অভ্যুত্থানে নিহত ৪৪ পুলিশ সদস্যের পরিচয় প্রকাশ করে। যদিও অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগসহ অনেকের দাবি সংখ্যাটি হাজার হাজার। যদিও কখনও তারা কারও নাম-পরিচয় দিতে পারেনি। এরই মধ্যে ৪২ পরিবারকে সরকার আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। উত্তরাধিকার জাটলতার কারণে দুই পরিবারের আর্থিক সহায়তা আটকে আছে।
গণঅভ্যুত্থানে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ অনেকেই দাবি করেন, চব্বিশের ৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ছাত্র-জনতার হামলায় নিহত ১৫ পুলিশ সদস্যের মধ্যে পৃথিবী চাকমা নামে অন্তঃসত্ত্বা এক নারী কনস্টেবলও ছিলেন।
পরে পৃথিবী চাকমা ভিডিওবার্তার মাধ্যমে জানান, তিনি বেঁচে আছেন। চব্বিশে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে তাঁর পোস্টিং ছিল না। তিনি সে সময়ে অন্তঃসত্ত্বাও ছিলেন না।
শেখ হাসিনা একাধিকবার দাবি করেন, অভ্যুত্থানে পুলিশের তিন হাজার ৩৩২ জন নিহত হয়েছেন। তবে আওয়ামী লীগ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যে তথ্যচিত্র প্রকাশ করে, তাতে নিহত পুলিশের সংখ্যা ৪৪, যা সরকারি হিসাবের সমান।
কী করতে যাচ্ছে সরকার
গত বছরের ১৭ অক্টোবর রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদে সই করে। এতে সাত দফা অঙ্গীকারনামা রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
পঞ্চম দফায় বলা হয়েছে, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্যের ঘটানো সব হত্যার বিচার হবে। শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা আহতদের বীর হিসেবে স্বীকৃতি ও পুনর্বাসন দেওয়া হবে। জুলাইযোদ্ধাদের আইনি দায়মুক্তি, মৌলিক অধিকার সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
দায়মুক্তি নিশ্চিত করতে গত ১৭ অক্টোবর সংসদ ভবন এলাকায় বিক্ষোভ করেন জুলাইযোদ্ধারা। ওই সময়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ অঙ্গীকারনামায় জুলাইযোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতে প্রস্তাব করে বলেছিলেন, গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট বাহিনী ও তাদের অনুগত কিছু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর হানাদার বাহিনীর মতো নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। বিএনপি স্বাক্ষরকারী অন্যান্য দলের জুলাই সনদের এই অঙ্গীকারেই স্থির রয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি সমকালকে বলেন, সবাই সনদের যে অঙ্গীকারনামায় সই করেছে, তা সবাইকে মেনে চলতে হবে।
সুরক্ষা অধ্যাদেশে কী আছে
অধ্যাদেশের ৪ ও ৫ ধারায় অভ্যুত্থানকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ৪ ধারায় বলা হয়েছে, অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়ার কারণে কারও বিরুদ্ধে মামলা হলে তা প্রত্যাহার হবে। তবে সরকার প্রত্যয়ন করবে, মামলাটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে দায়ের করা হয়েছিল কিনা। তেমন হলে মামলা চলমান থাকলেও অভিযুক্ত ব্যক্তি খালাসপ্রাপ্ত বলে গণ্য হবেন।
৫ ধারায় বলা হয়েছে, এই দায়মুক্তি থাকার পরও কোনো অভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ থাকলে তা মানবাধিকার কমিশনে মামলা করা যাবে। কমিশন হত্যার শিকার ব্যক্তি যে প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, তাতে বর্তমানে বা অতীতে কর্মরত ছিলেন, এমন কর্মকর্তা বাদে অন্য কাউকে দিয়ে তদন্ত করাবে। তদন্ত কমিশনের অনুমোদনে প্রয়োজনে আসামিকে গ্রেপ্তার করা যাবে। যদিও তদন্তে প্রমাণ হয়, অভ্যুত্থানের সময়ের অপরাধ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপব্যবহার ছিল, তাহলে আদালতে বিচার হবে। আর প্রতিরোধের কারণে হয়ে থাকলে কমিশন উপযুক্ত মনে করলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারকে আদেশ দিতে পারবে। তবে আদালতে মামলা করা যাবে না।
জারির সময়ে সুরক্ষা অধ্যাদেশের বিরোধিতা করেনি বিএনপি। দলটির সূত্র জানায়, এতে তাদের সম্মতি ছিল। তবে সালাহউদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অন্যান্য অধ্যাদেশের মতো সুরক্ষা অধ্যাদেশও সংসদে উত্থাপনের পর আলোচনা মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে।
বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের সমকালকে বলেন, অভ্যুত্থানকারীদের আইনি সুরক্ষার লঙ্ঘনের কথা আসাই তৌ দুঃখজনক। তারা জাতিকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করেছে। সনদ ও অধ্যাদেশে যেভাবে রয়েছে, সেভাবেই সুরক্ষা দিতে হবে।
প্রথম আলো
‘খামেনিকে হত্যার পর ইরানের ভবিষ্যৎ কী’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পাতার প্রতিবেদন। খবরে বলা হয়, কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। তিনি কেবল ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্বই দেননি, বরং এই রাষ্ট্রের চেহারাও ঠিক করে দিয়েছিলেন।
হামলার জবাবে তেহরান দৃশ্যত চারদিকে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য এক নজিরবিহীন অস্থিরতার মুখে পড়েছে।
চলমান এই ঝড়ের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের সাধারণ মানুষ। গত ডিসেম্বরে হাজার হাজার ইরানি রাস্তায় নেমে আসেন। সরকার কঠোর হাতে বিক্ষোভ দমন করে। অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিক্ষোভের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, ‘সাহায্য আসছে’। তবে খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের জনগণের ভবিষ্যৎ এখন আরও বেশি বিপজ্জনকভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
গত শনিবার ইরানের জনগণের উদ্দেশে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ‘আপনাদের মুক্তির সময় ঘনিয়ে এসেছে। আমাদের কাজ শেষ হলে আপনারা সরকারের দায়িত্ব বুঝে নিন। এটি আপনাদেরই প্রাপ্য। সম্ভবত কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এটিই আপনাদের একমাত্র সুযোগ।’
তবে ইরানের বিরোধী শিবিরের বিভিন্ন পক্ষের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো—মার্কিন নাগরিকেরা খামেনিকে সরিয়ে দিলেও কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন (রেজিম চেঞ্জ) সম্ভব নয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতে, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু ইরানিদের জন্য ‘নিজেদের দেশ ফিরে পাওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ’। তবে তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশেষ করে গত জুনে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শেষ ধাপের হামলার পর থেকে প্রকৃত ক্ষমতা মূলত ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’ এবং ‘ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি)’ হাতে চলে গেছে।
ফলে এই যৌথ অভিযান শেষ হওয়ার পর ইরানে একটি দুর্বল ও ক্ষতবিক্ষত কিন্তু অত্যন্ত ক্ষুব্ধ শাসনব্যবস্থা থেকে যেতে পারে। তারা টিকে থাকার লড়াইয়ে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠতে পারে এবং ট্রাম্পের উসকানিতে সাড়া দেওয়ার সাহস দেখালে সাধারণ মানুষকে দমনে আরও মরিয়া হয়ে উঠতে পারে।
বিকল্প নেতৃত্ব নেই
বিক্ষোভ দমনে রক্তক্ষয়ী অভিযানের কারণে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়া এবং কোনো সুনির্দিষ্ট নেতা বা বিকল্প নেতৃত্ব না থাকাটাও বড় প্রতিকূলতা। যদিও কোনো কোনো বিক্ষোভকারী ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহর ছেলে রেজা পাহলভির প্রত্যাবর্তনের দাবি তুলেছিলেন। ওই বিপ্লবের মাধ্যমেই বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সূচনা হয়েছিল।
এমনকি ইরানি কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মতো যারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই হামলার সমর্থক, তারাও এখন উদ্বিগ্ন। দেশটিতে তাদের হাতেগোনা কিছু সংগঠিত সশস্ত্র বিরোধী শক্তি রয়েছে (বলে রাখা ভালো, তারা রাজতন্ত্র ফেরার পক্ষে নয়)।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘থেমে গেল প্রতিবাদের কণ্ঠ’। খবরে বলা হয়, ভোরের আলো ফুটতেই তেহরানের আকাশ যেন কালো শোকে ঢেকে গেল। মিনারের মাইকে প্রার্থনার সুরের সঙ্গে মিশে ছিল কান্না। রাজপথে নেমে আসা লাখো মানুষের ঢল যেন হারিয়েছে আশ্রয়, আস্থা আর ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া। হত্যাকাণ্ডের শিকার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। কেউ বুক চাপড়াচ্ছেন, কেউবা কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ছেন সড়কে। কারও হাতে প্রিয় নেতার ছবি, কারও কাঁধে কালো পতাকা-শোক আর ক্ষোভে থমথমে রাজধানী তেহরান, ইসফাহান ও মাশহাদসহ গোটা দেশ। ‘আমেরিকা-ইসরাইল নিপাত যাক’ স্লোগানে কাঁপতে থাকে সড়ক। কেউ কেউ কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ৩৭ বছর ধরে যিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলসহ জুলুমবাজ পরাশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই অদম্য প্রতিবাদী কণ্ঠটি আর নেই-এ যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ভাষ্য-শনিবার ভোরে কার্যালয়ে বসে কাজ করার সময়ই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হন খামেনি। অথচ সুরক্ষিত ভবনে এমন হত্যাকাণ্ড কীভাবে সম্ভব হলো, তা নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল জল্পনা। একই হামলায় নিহত হয়েছেন তার মেয়ে, মেয়ের জামাই ও নাতিসহ শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা। এদের মধ্যে রয়েছেন-উপদেষ্টা শামখানি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী নাসিরজাদেহ, পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান গোলাম রেজা ও সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক প্রধান মুসাভি। এছাড়াও সামরিক বাহিনীর ৪০ শীর্ষ কমান্ডার নিহত হয়েছেন। রোববার আরেক হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সিআইএ ও মোসাদের সমন্বয়ে খুঁজে বের করা হয়েছিল খামেনির অবস্থান। হামলার আশঙ্কায় খামেনির বৈঠক সন্ধ্যার পরিবর্তে সকালে করা হয়েছিল। সেটিও জেনে যায় শত্রুরা। খামেনির উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েই শক্তিশালী বোমা হামলা করে তারা। এ ঘটনায় প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে ইরান। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বুকে এমন হামলা করা হবে যা তারা আগে কখনো দেখেনি।
খামেনির মৃত্যুতে ইরানজুড়ে শুরু হয়েছে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক, ঘোষণা হয়েছে ৭ দিনের ছুটিও। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিবাদের ঝড়। রোববার দিনভর বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ দেশে দেশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসনবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। খবর বিবিসি, রয়টার্স, এএফপিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের।
এক বিবৃতিতে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বলেছে, আমরা একজন মহান নেতাকে হারিয়েছি আর তার জন্য শোক করছি। তিনি এমন একজন নেতা যিনি আত্মার পবিত্রতা, ইমানের দৃঢ়তা, সৃজনশীল মানসিকতা, অহংকারীদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস ও আল্লাহর পথে জিহাদের ক্ষেত্রে অনন্য ছিলেন।
খামেনির মৃত্যুর খবরে তেহরানের রাস্তায় নেমে আসেন লাখো মানুষ। তাদের চোখ থেকে অঝোরে ঝরছিল পানি। তবে মুখে ছিল প্রতিবাদী স্লোগান। তেহরানের ইনকিলাব স্কয়ারে জড়ো হয়ে খামেনি সমর্থকরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কোম শহরে হজরত মাসুমেহর মাজার প্রাঙ্গণে সমর্থকরা জড়ো হয়ে শোক প্রকাশ করেন। ধর্মীয় নগরী হিসাবে এখানে আবেগ ছিল সবচেয়ে বেশি। তারা এই হামলাকে ‘কাপুরুষোচিত’ হিসাবে অভিহিত করেন। মাশহাদ বিখ্যাত ইমাম রেজার মাজারের গম্বুজে প্রতীকী শোক হিসাবে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। মাজার এলাকায় সমবেত হাজারো সমর্থক বুক চাপড়ে কাঁদেন।
কালের কণ্ঠ
‘দূরের যুদ্ধে অর্থনীতিতে অশনিসংকেত’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া নতুন সংঘাতের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। গত শনিবার ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি বড় ধরনের হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এখন তুঙ্গে। এই উত্তেজনার কেন্দ্রে থাকা হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় বাংলাদেশের নড়বড়ে অর্থনীতির ওপর নতুন করে বিপর্যয়ের ছায়া দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী মহলের আশঙ্কা, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি ব্যাহত হবে আমদানীকৃত পণ্য ও কাঁচামালের সরবরাহ ব্যবস্থা।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক শ্রমবাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে রেমিট্যান্স-প্রবাহে ধস নামার শঙ্কাও প্রবল হয়ে উঠেছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এই সংঘাতকে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (আমচ্যাম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিপর্যয়, লজিস্টিকস খরচ বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বগতি, প্রবাস আয়ে মন্দা এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতি—এই পাঁচটি প্রধান ঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশ। সৈয়দ এরশাদ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরে অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং আমদানীকৃত কাঁচামাল সময়মতো পৌঁছানো অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
সুয়েজ খালের পরিবর্তে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হওয়ায় পরিবহন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা অভ্যন্তরীণ বাজার ও উৎপাদন খাতকে তীব্র সংকটে ফেলবে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত কর্মীদের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়লে রেমিট্যান্স-প্রবাহ কমে যাওয়ার বড় শঙ্কা রয়েছে।’
বাংলাদেশে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দীন রুবেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও ২৫ শতাংশের বেশি এলএনজি পরিবহনের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীন, জাপান ও ভারতের মতো এশীয় দেশগুলো তাদের মোট জ্বালানি চাহিদার বেশির ভাগ এই পথ দিয়ে মেটালেও বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে দূরে থাকায় এর প্রভাব হবে মূলত পরোক্ষ ও সুদূরপ্রসারী।
ইত্তেফাক
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার খবর ‘ইরানে যৌথ হামলা: এলএনজি আমদানি ব্যয় ও রিজার্ভ নিয়ে শঙ্কা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশ। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং এলপিজি আমদানিতে ব্যাঘাত ঘটলে বিদ্যুত্ উত্পাদনে ব্যয় বাড়বে, শিল্প খাত চাপে পড়বে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সূত্র জানায়, দেশের জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি হয়, যার ৮০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। একইভাবে আমদানি করা এলএনজির বেশির ভাগই কাতার ও ওমান থেকে আমদানি করা হয়। দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশের বেশি এখন এলএনজিনির্ভর।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করা হয়, যার দুই তৃতীয়াংশ আসে (প্রায় ৪০ লাখ টন) কাতার থেকে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে এলএনজিকে গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। চলতি মার্চ মাসে নয়টি এলএনজি কার্গো আসার কথা থাকলেও সংঘাত তীব্র হলে সরবরাহ অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে। এমনকি কোনো একটি কার্গো বিলম্বিত হলেও গ্যাসসংকট বাড়তে পারে।
জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৫ দিনের মতো জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে, যদিও ধারণক্ষমতা প্রায় এক মাসের বেশি। সমুদ্রে থাকা কয়েকটি ডিজেলবাহী জাহাজ শিগিগর পৌঁছানোর কথা। তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসার নির্ধারিত অপরিশোধিত তেলের চালান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিপিসি কর্মকর্তারা।
সবচেয়ে বড় শঙ্কা হরমুজ প্রণালি ঘিরে। বৈশ্বিক তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় অংশ এই পথ দিয়ে যায়। এ পথে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিমধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছে; বড় ধরনের অবরোধ হলে ব্যারেলপ্রতি দাম ৯৫ থেকে ১১০ ডলারে পৌঁছাতে পারে কিংবা আরো বেশি হতে পারে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ বিকল্প রুট ব্যবহার করলেও তাতে খরচ বাড়বে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, সরকার-টু-সরকার চুক্তি ও উন্মুক্ত দরপত্রের আওতায় নির্ধারিত সময় পর্যন্ত জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা রয়েছে। বিকল্প উত্স হিসেবে চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিংগাপুর থেকে সরবরাহ অব্যাহত আছে। প্রয়োজনে বিকল্প রুট ব্যবহারের প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে। তবে স্পট মার্কেটে দাম বাড়লে ভবিষ্যত্ চালানে আমদানি ব্যয় বাড়বে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে তিনটি বড় ঝুঁকি সামনে আসবে। আমদানিব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি। জ্বালানি আমদানিতে প্রতি মাসে প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে এ ব্যয় আরো বাড়বে, যা রিজার্ভে চাপ তৈরি করতে পারে।
নয়া দিগন্ত
‘মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় খামেনি নিহত’-এটি দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ৩৭ বছর ধরে নেতৃত্ব দেয়া ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। তেহরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবি জানায়, “ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতা শাহাদাত বরণ করেছেন।” তার মৃত্যুতে ইরানজুড়ে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং সাত দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে এ ঘটনার অভিঘাত ইতোমধ্যে স্পষ্ট। তেহরান প্রতিশোধের ঘোষণা দিয়েছে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করেছে, আর ইসরাইলে ব্যাপক পেণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনের ঘটনা নয় বরং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে দেয়ার মতো সঙ্কট।
আবেগঘন শোক, কঠোর নিরাপত্তা : খামেনির মৃত্যুসংবাদ পাঠ করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক উপস্থাপক সরাসরি সম্প্রচারে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই দৃশ্য ইরানজুড়ে গভীর আবেগের সঞ্চার করে।
একই সময়ে রাজধানী তেহরানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করে আইআরজিসি। সামরিক ঘাঁটি, পারমাণবিক স্থাপনা ও সীমান্তে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়। নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্য নাশকতা বা বিদেশী হামলা ঠেকাতে “ফুল মোবিলাইজেশন” অবস্থায় রয়েছে বাহিনী।
সংবিধান অনুযায়ী কিভাবে নেতৃত্ব বদল হবে : খামেনির মৃত্যুতে ইরান হঠাৎ নেতৃত্বশূন্য হয় না। দেশটির সংবিধানে উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে নির্ধারিত। নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে বিশেষজ্ঞ পরিষদ ৮৮ সদস্যের একটি নির্বাচিত ধর্মীয় পরিষদ। জনগণের সরাসরি ভোটে আট বছরের জন্য তারা নির্বাচিত হন। আর এই পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তে সর্বোচ্চ নেতা ঠিক হয়।
সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে অস্থায়ীভাবে একটি ‘লিডারশিপ কাউন্সিল’ দায়িত্ব নেয় প্রেসিডেন্ট, প্রধান বিচারপতি এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন জুরিস্ট। এই কাউন্সিল দ্রুত নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। ইতোমধ্যে আইনজ্ঞ হিসেবে আলিরেজা আরাফির নাম ঘোষণা করা হয়েছে বলে তেহরান সূত্রে জানা গেছে।
সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতা কতটা : ইরানে প্রেসিডেন্ট থাকলেও চূড়ান্ত ক্ষমতা সর্বোচ্চ নেতার হাতে। সংবিধান অনুযায়ী তিনি- সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক, যুদ্ধ বা শান্তি ঘোষণা করেন, বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রীয় মিডিয়া ও সামরিক কমান্ডার নিয়োগ দেন, প্রেসিডেন্ট অনুমোদন বা অপসারণ করতে পারেন এবং পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির শেষ সিদ্ধান্ত নেন। অর্থাৎ নতুন নেতা মানেই ইরানের নীতির নতুন দিকনির্দেশনা।
আইন বলছে, ধর্মীয় পরিষদ নির্বাচন করবে, কিন্তু বাস্তবে আইআরজিসির সমর্থন ছাড়া কেউ ক্ষমতায় টিকতে পারে না। বিশ্লেষকদের ভাষায়, “আইনি বৈধতা দেয় আলেমরা, বাস্তব ক্ষমতা দেয় বন্দুক।” ফলে নির্বাচন প্রক্রিয়া ধর্মীয় হলেও ফলাফল নির্ভর করতে পারে সামরিক-রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর।
দেশ রূপান্তর
দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রথম পাতার খবর ‘জ্বালানি আমদানিতে ঝুঁকি বড় উদ্বেগ এলএনজিতে’। খবরে বলা হয়, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বড় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আপাতত জ্বালানি তেলে তাৎক্ষণিক সংকট না থাকলেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলএনজি আমদানিতে বিঘেœর আশঙ্কা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিমধ্যে তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এলপিজি, কয়লা ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আমদানি বিল বাড়া ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সহসা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বাড়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপএই তিনটি বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, জ্বালানি আমদানি বিল বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নতুন চাপ তৈরি হবে। ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধের পর দুই বছরে দেশের রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০ বিলিয়নের নিচে নেমে এসেছিল। একই পরিস্থিতি পুনরাবৃত্তি হলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা নতুন সরকারকে বাড়তি চাপে ফেলবে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, দেশের জ্বালানি খাতে তার প্রভাবসহ সার্বিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করছে সরকার। যুদ্ধের আগুন বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহে একটি প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছে জ্বালানি বিভাগ। জ্বালানি সরবরাহ যথাসম্ভব অব্যাহত রাখতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানির উৎস খুঁজতে নির্দেশ দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন আশা করেন শিগগির যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। সেক্ষেত্রে জ্বালানি নিয়ে তেমন একটা সমস্যা হবে না বাংলাদেশের। এক্ষেত্রে এলএনজি সরবরাহে কিছুটা বিঘ্ন হলেও হতে পারে।
গতকাল রাতে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে সংঘাত বন্ধ না হলে সব ধরনের জ্বালানি সরবরাহে বড় সংকট হবে। পাশাপাশি ব্যয়ও বাড়বে।
ভবিষ্যতে এমন জটিল পরিস্থিতি এড়াতে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার পাশাপাশি অন্তত ৩ মাসের মজুদ সক্ষমতা বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছেন এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
‘জ্বালানি খাতে অশনিসংকেত’-এটি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কারণে বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিলে বিশ্বের জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এরই মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় জ্বালানি তেলসহ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ শৃঙ্খলা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যা দেশের জ্বালানি আমদানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যুদ্ধের কারণে বাড়তে পারে জ্বালানির দামও। বর্তমানে বিপিসির কাছে ১৫ দিনের পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুত থাকলেও সরকারের মূল চিন্তা এলএনজি নিয়ে। সব মিলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরনের হুমকিতে পড়তে যাচ্ছে। আসছে গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদাও স্বাভাবিকভাবে বাড়বে। পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেলে দেশজুড়ে গরমে তীব্র লোডশেডিংয়ের শঙ্কা রয়েছে।
যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও এলএনজি আমদানিকারকদের আমদানি ব্যয় বহুগুণ বাড়বে। ফলে সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপ বাড়বে। দেশের বাজারে তখন দাম বৃদ্ধির প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায়, বিমা প্রিমিয়াম বেড়ে গেলে শিপমেন্ট বিলম্বিত হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে বড় ধরনের জ্বালানিসংকট তৈরি হতে পারে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিসহ শিল্প খাতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেতে পারে।
এ ছাড়া আমদানি বিল বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালির সংকীর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। বর্তমানে যুদ্ধঝুঁকির জন্য এই রুট নিয়ে সরবরাহ শৃঙ্খলা ব্যাহত হওয়ার উপক্রম। এর প্রভাবে তেলের বাজার আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের গ্যাসের চাহিদার ৩০ শতাংশের বেশি পূরণ হচ্ছে এলএনজি দিয়ে। যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এলএনজির দামও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মূলত দেশে আসা এলএনজির পুরোটাই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যার বেশির ভাগ আসে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার ও ওমান থেকে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানি করে। কাতার থেকে এলএনজি আমদানির একমাত্র পথ হরমুজ প্রণালি। কাজেই এটি বন্ধ হওয়ায় বাংলাদেশে এলএনজি আমদানির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে গতকাল বলেন, যেহেতু এটি সর্বাত্মক যুদ্ধ। এজন্য জ্বালানি তেল, এলএনজি ও এলপিজি সবকিছুর ওপরই এর প্রভাব পড়বে। আমাদের এখন জ্বালানির যে মজুত আছে তা দিয়ে কিছুদিন চালানো যাবে। পাইপলাইনে যে জ্বালানি আসছে তা নিয়েও সমস্যা নাই। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত না হলে মার্চ মাস পর্যন্ত কোনো সমস্যা হবে না। আপাতত আমাদের মূল চিন্তা এলএনজি নিয়ে। যে কয়টা কার্গো আসার কথা এর মধ্যে তিনটি কার্গোর বিষয়ে আমরা নিশ্চিত না। বাকিগুলোর বিষয়ে নিশ্চিত, এগুলো হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এগুলো পাওয়া যাবে। এরই মধ্যে সরকার এলএনজি নিয়ে সবার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করছে যাতে করে যুদ্ধকালীল সমস্যা খুব বেশি না হয়।
সহযোগীদের খবর
জুলাইয়ে পুলিশ হত্যা: সনদ মেনে দায়মুক্তি দেবে সরকার
অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন
৩ মাস আগে
২ মার্চ (সোমবার), ২০২৬, ৯ঃ৩২ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
