সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ ও পৃথক সচিবালয় সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় স্থগিত, আপিল শুনানি ১৬ই জুন

ফন্ট সাইজ:

নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা নিয়ে হাইকোর্টের দেয়া রায় স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ। মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন মঞ্জুর করে হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেছেন। একইসঙ্গে আগামী ১৬ই জুন আপিলটির চূড়ান্ত শুনানির জন্য দিন নির্ধারণ করেন আদালত।
এ বিষয়ে গতকাল অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার ৩টি অঙ্গ নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইনসভা নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীন হলেও কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তাদের মধ্যে সমন্বয় ও ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। ২০২৩ সালের ২রা সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে এবং সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল দায়ের করেছে। তিনি বলেন, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে ছিল। পরে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তা রাষ্ট্রপতির কাছে ন্যস্ত করা হয়। ১৯৭৯ সালে সংশোধন করে রাষ্ট্রপতিকে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে এ ক্ষমতা প্রয়োগের বিধান করা হয়। পরবর্তীতে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বর্তমান বিধান পুনর্বহাল করা হয়।
হাইকোর্টের রায় স্থগিতের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, রায় কার্যকর থাকলে বিচার প্রশাসনে জটিলতা তৈরি হতে পারতো। বিশেষ করে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত যে অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল, তা সংসদে অনুমোদিত হয়নি এবং অধিকতর যাচাই বাছাইয়ের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। এ সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান বিচারপতির মামলাটি শুনানি করা নিয়ে সম্ভাব্য ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’-এর বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনি বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের প্রজ্ঞা, নিরপেক্ষতা ও সততা নিয়ে তার কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ নেই। সাংবিধানিক প্রশ্নের নিষ্পত্তি আদালতই করবেন।
পৃথক সচিবালয় নিয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সংবিধানে সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের মতো কিছু প্রতিষ্ঠানের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয়ের বিষয়ে সংবিধানে কোনো বিধান নেই। আদালত কতোদূর পর্যন্ত নির্দেশ দিতে পারেন, সেটিও আপিলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে এসেছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বিচার বিভাগের ওপর কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করছে এমন কোনো উদাহরণ তার জানা নেই। তিনি আরও বলেন, আলোচিত বিষয়টি মূলত অধস্তন আদালতের বিচারকদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত, উচ্চ আদালতের বিচারকদের নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগের মধ্যে কার্যকর ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ থাকা প্রয়োজন। তবে আপিল বিভাগে বিষয়টি বিচারাধীন থাকায় এ নিয়ে আর কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না বলে মন্তব্য করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তি আদালত অবমাননার শামিল: আইনজীবী শিশির মনির
এদিকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা স্থগিতের বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় আইনজীবী শিশির মনির বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা বহাল থাকা অবস্থায় সচিবালয় বিলুপ্ত করে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করার সরকারি পদক্ষেপ আদালত অবমাননার শামিল। তিনি বলেন, আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা না করে সরকার সচিবালয় বিলুপ্ত করে নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। শুনানিতে তাদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেয়া হয়েছে যে, সচিবালয় প্রতিষ্ঠার আদেশটি ছিল ‘কনসেন্ট ডিক্রি’, যার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী আপিল করা যায় না। আইনজীবী আরও বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে অধস্তন আদালতের বিচারকদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলাবিষয়ক ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের অধীন থাকা প্রয়োজন। বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হলে জনগণ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন