চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুন হয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা বিল্লাল হোসেন তালুকদার। সোমবার রাতে তাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি স্বেচ্ছাসেবক দলের রমনা থানার সাবেক আহ্বায়ক ছিলেন। সোমবার রাত পৌনে ৮টার দিকে মৌচাকের আনারকলি মার্কেটের সামনের গলিতে বিল্লালকে ছুরিকাঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে এলে রাত ৯টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত বিল্লাল হোসেনের বাসা মালিবাগের বাগানবাড়ি এলাকায়। তার বাবার নাম মৃত ইউসুফ তালুকদার। স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রমনা থানা এলাকায় মৌচাক-আনারকলি মার্কেট সংলগ্ন ফুটপাথ নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও এলাকার একক আধিপত্যের জেরে খুন হয়েছেন তিনি।
পুলিশ বলছে, একটি বিবাদের সালিশের জন্য বিল্লাল আনারকলি মার্কেট এলাকায় গিয়েছিলেন। একপর্যায়ে সালিশে কথাকাটাকাটি-মারামারি থেকে ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে। আনারকলি মার্কেটের সামনের গলিতে অজ্ঞাত ১০-১২ জন তার ওপর হামলা চালায়। বিল্লালকে বুকের ডান পাশে ছুরি দিয়ে আঘাত করে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
এদিকে এ ঘটনায় মঙ্গলবার দুইজনকে আটকের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। আটককৃতরা হলো- রিয়াজ ও আল আমিন। মঙ্গলবার ঢাকা ও মুন্সীগঞ্জ থেকে তাদেরকে আটক করা হয়। আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যাকাণ্ডের কারণ ও জড়িত অন্যদের বিষয়ে তথ্য জানার চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।
নিহতের পরিবারের দাবি, এই হত্যাকাণ্ড তাৎক্ষণিক কোনো ঘটনার জেরে নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব। তারা বলছেন, বিল্লাল সিনিয়র রাজনীতিবিদ হওয়ায় মৌচাক-আনারকলি এলাকায় ফুটপাথের দোকানদাররা যেকোনো সমস্যায় তার শরণাপন্ন হতেন এবং তিনি সেটি মীমাংসা করতেন। এ ছাড়া ফুটপাথের চাঁদাবাজি একক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে যুবদল নেতা সালিশি পছন্দ করতেন না এবং বিল্লালের ওপর তার চরম ক্ষোভ ছিল। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের ভাগনে মোবারক হোসেন আকাশ বলেন, সোমবার রাতে তারা কয়েকজন আনারকলি মার্কেটের পার্কিং স্পটে অবস্থান করছিলেন। এ সময় আনারকলি সুপার মার্কেট কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও রমনা থানা যুবদলের আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম বাবু তার অনুসারীদের নিয়ে সেখানে আসেন এবং কথাকাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে বাবু কোমর থেকে ছোরা বের করে আঘাতের চেষ্টা করলে ধাক্কাধাক্কিতে ছোরাটি মাটিতে পড়ে যায়। তখন বাবুর সহযোগী সিরাজুল মাটিতে পড়া ছোরাটি তুলে বিল্লালের বুকে সজোরে বসিয়ে দেয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত বিল্লালের স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যুবদল নেতা দিদারুল ইসলাম ও তার অনুসারীরা রাত পৌনে ৮টার দিকে আনারকলি মার্কেটের সামনে বিল্লাল হোসেনের ভাগনে মোবারক হোসেন আকাশকে মারধর করছিলো। খবর পেয়ে বিল্লাল হোসেন সেখানে যান এবং বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেন। সালিশ-বৈঠকের একপর্যায়ে দিদারুল ইসলামের সঙ্গে বিল্লালের কথাকাটাকাটি হয়। এর একপর্যায়ে বিল্লালের বুকে ছুরিকাঘাত করা হয়।
নিহত বিল্লালের আরেক ভাগনে জুবায়ের হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, যুবদল নেতা দিদারুল ইসলামের নেতৃত্বে মামার ওপর হামলা চালানো হয়। ঘটনার সময় আমি সেখানে ছিলাম। একদল লোক আনারকলি মার্কেটের সামনের খাবারের দোকানগুলোতে চাঁদাবাজি করছিল। তখন আমার ভাই মোবারক হোসেন আকাশ এর প্রতিবাদ করলে তাকে আটকে রেখে মামাকে সেখানে যেতে বলে তারা। মামার সঙ্গে আমরাও কয়েকজন সেখানে যাই। দুই পক্ষের মধ্যে কথা বলার একপর্যায়ে ছোরা বের করে আমার ভাই মোবারককে দুই দফায় হামলা করা হয়। কিন্তু ভাইয়ের শরীরে কোপ লাগেনি। একপর্যায়ে পেছন থেকে এসে আমার মামার বুকে ছুরি মারে।
এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ডিএমপি’র রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বিল্লাল হোসেন তালুকদার হত্যাকাণ্ডের পর পরই জড়িতদের শনাক্তে কাজ শুরু করে পুলিশ। এর ধারাবাহিকতায় গভীর রাতে ঢাকা থেকে সন্দেহভাজন রিয়াজকে আটক করা হয়। পরে মঙ্গলবার ভোরে মুন্সীগঞ্জ থেকে আল আমিনকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যাকাণ্ডের কারণ ও জড়িতদের বিষয়ে তথ্য জানার চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি বলেন, নিহত ও অভিযুক্ত উভয়পক্ষই রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তি। তবে প্রাথমিক তদন্তে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের চেয়ে ব্যক্তিগত বা স্থানীয় বিরোধের বিষয়টিই সামনে আসছে।
এই ঘটনার পর রাতেই যুবদলের রমনা থানার আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম বাবুকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একইসঙ্গে যুবদলের রমনা থানা কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মালিবাগে সোহাগ পরিবহনের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের মামলায় নিহত বিল্লাল হোসেন তালুকদার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।
