শিক্ষা, প্রযুক্তি স্বাস্থ্য ও জনপ্রশাসনে গুরুত্ব

জামায়াতের ছায়া বাজেট

শিক্ষা, প্রযুক্তি স্বাস্থ্য ও জনপ্রশাসনে গুরুত্ব

ফন্ট সাইজ:

শিক্ষা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও জনপ্রশাসন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ছায়া বাজেট পেশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার একটি বিকল্প বা প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট পেশ করেছে দলটি। এর বিপরীতে  রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ টাকা। বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপি’র ২.৪৩ শতাংশ। এ ছাড়াও বাজেট প্রস্তাবনায় এনআইডি হবে টিন। করজাল সম্প্রসারণের জন্য আলাদা টিন নম্বরের পরিবর্তে জাতীয় পরিচয়পত্রকেই ‘বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর’ বা ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর প্রবর্তনের কথাও জানানো হয়। ব্যক্তি খাতে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৪ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী ভাতা এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির ভাতা, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য ভাতা, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। গতকাল রাজধানীর মগবাজার আল ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতের পক্ষ থেকে ‘ছায়া বাজেট প্রস্তাবনা উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এ বাজেট উপস্থাপন করা হয়। জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম খান মিলন বাজেট উপস্থাপন করেন।

জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে উত্থাপিত এই বাজেটের বরাদ্দ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মোট বাজেটের ২৪.০৯ শতাংশ বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে জনপ্রশাসন খাতে। টাকার অঙ্কে যা ২ লক্ষ ২ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা (১৪.৯৬%) বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখতে বাধ্য হয়েছে দলটি। সুদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লক্ষ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট প্রস্তাবিত বাজেটের ১৫.১৯ শতাংশ। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ৬৫ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা (৭.৭৮%) বরাদ্দের রূপরেখা দেয়া হয়েছে।
জামায়াতের এই বাজেটে দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি খাতে ৫১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা (৬.১৫%) এবং গরিব ও দুস্থ মানুষের সহায়তায় সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে ৪৮ হাজার ১৫০ কোটি টাকা (৫.৭৪%) বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

এ ছাড়া জনস্বাস্থ্য রক্ষায় স্বাস্থ্য খাতে ৪৫ হাজার ২৪০ কোটি টাকা (৫.৩৯%) এবং তৃণমূলের উন্নয়নে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪৫ হাজার ২২০ কোটি টাকা (৫.৩৯%) বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।

অন্যান্য খাতের মধ্যে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিরক্ষা খাতে ৪৩ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা (৫.১৮%), অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে ৩৪ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা (৪.১০%), এবং দেশের শিল্প ও উৎপাদন সচল রাখতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ২৪ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা (২.৯৭%) বরাদ্দ ধরা হয়েছে।
ছায়া বাজেট অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের ফিসকাল ইয়ার (অর্থবছর) হচ্ছে জুলাই টু জুন। জুন মাস বর্ষা, খরা, দুর্যোগ, সাইক্লোন- এগুলাতে সাধারণত আমাদের দেশ আক্রান্ত হয়। আমরা লক্ষ্য করি, এডিপি’র একটা বিশাল অংশ শেষের দুই মাসের তাড়াহুড়া করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। এটি বাস্তবায়ন নয়। এটি হচ্ছে গণলুটপাট। এর সুফল জনগণ পায় না। কিছু অসৎ সুবিধাভোগীদের পকেটের সুফল চলে যায়।

তিনি বলেন, আমরা সংসদে প্রস্তাব দেবো, আমাদের ফিসকাল ইয়ারটি ক্যালেন্ডার ইয়ারের সঙ্গে মিলিয়ে করা হবে। তাহলে বর্ষার পানিতে আমাদের টাকাগুলো ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে না। এই টাকাগুলোর খবর পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ।

অনুষ্ঠানে জামায়াত আমীর বলেন, জামায়াতের আশঙ্কা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আর্থিক, রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক, সাংবিধানিক সব জায়গায় নির্লজ্জ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ একেবারেই স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা করপোরেশন সবগুলোতে আজ সেই থাবা বিস্তৃত হচ্ছে। সমাজের অপরাধী লোকদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসিয়ে দেয়া হচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে অপরাধ বিভিন্নভাবে প্রমাণিত। এভাবে যদি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার উপর রাজনৈতিক অন্যায্য হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকে, তাহলে জাতির গন্তব্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটি নিশ্চিত নয়।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা লাগবে। যদি এগুলো না থাকে, তাহলে যে বাজেটই সরকার দিক, ওই বাজেট কার্যকর হবে না।

শফিকুর রহমান বলেন, সম্পূরক বাজেট বছর শেষ হওয়ার ন্যূনতম তিন মাস আগে সংসদে পেশ করতে হবে। কিন্তু সম্পূরক বাজেট পাওয়া যায় শেষ মাসে। এর মাঝে বৈধ, অবৈধ, ন্যায্য, অন্যায্য সব খরচ হয়ে যায়। কালো-সাদা একাকার হয়ে যায়। তারপরে সম্পূরক বাজেট সংসদের সামনে আসলে জনগণের লাভ হয় না।
দেশের কর আদায়ের পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে জামায়াত আমীর বলেন, জনগণ তিনটা কর দেয়। একটা ট্রেজারিতে জমা হয়; একটা যায় কিছু ব্যক্তির পকেটে, যারা কর আদায় করে, আরেকটা যায় চাঁদাবাজদের পকেটে।
তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ, যার কারণে ট্রেজারির ট্যাক্সটা তার টার্নওভার ভলিউমের দিক থেকে ছোট হয়ে আসে। এখানে যদি সততা এবং স্বচ্ছতা মেইনটেইন করা যায়, অটোমেটিক্যালি ব্যবসায়ীরা বিপুল উৎসাহ নিয়ে আরও বেশি ট্যাক্স দিবেন।

অনুষ্ঠানে জামায়াতের বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন দলীয় সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন)। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর আহমাদ আলী কাসেমী, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জাগপার সভাপতি তাসমিয়া প্রধান প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। জামায়াতের দলীয় নেতাদের মধ্যে ছিলেন সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম, নায়েবে আমীর মজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ প্রমুখ।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন