ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে সংসদে তুমুল বিতর্ক

ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে সংসদে তুমুল বিতর্ক

ফন্ট সাইজ:

ইসলমী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ ইস্যুতে তুমুল বিতর্ক হয়েছে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে। ইসলামী ব্যাংক নিয়ে ষড়যন্ত্রের অভিযোগের পাশাপাশি ফের এস আলমের মতো লুটেরাদের ফেরানোর পথ তৈরি করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। একইসঙ্গে ইসলামী ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি মাটির সঙ্গে মিশে যাবে বলে হুশিয়ারি দেন তিনি। অন্যদিকে সরকারি দলের পক্ষে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পাল্টা অভিযোগ করেন, ইসলামী ব্যাংক মানে ইসলাম নয়, ইসলামী ব্যাংককে জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে। ব্যাংক থেকে দলটির নেতাকর্মীদের নামে বেনামে বিপুল অর্থ ঋণ দিচ্ছে। ব্যাংকটির সব অনিয়ম ও লুটপাটের তদন্ত করা হবে বলে জানান তারা। একইসঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ বর্তমান বিএনপি সরকারের হাতেই সবচেয়ে নিরাপদ বলে মন্তব্য করেন তারা। তবে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সরকার দল ও বিরোধী দলের বিতর্ক চলাকালে এনসিপির শীর্ষ চারজন সংসদ সদস্য সংসদে অনপুস্থিত ছিলেন।
মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (বাজেট) অধিবেশনে ৬৮ বিধিতে এক সাধারণ আলোচনার ওপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে তারা এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে এ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

সংসদে ‘দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং কোটি কোটি গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শেয়ারসমূহ বৈধ ও প্রকৃত মালিকদের নিকট প্রত্যর্পণ এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় অন্যায় হস্তক্ষেপ বন্ধ’ করার দাবিতে এ আলোচনার প্রস্তাব করেন বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান। এই প্রস্তাবের ওপর সরকারি দল ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা আলোচনা করেন।

ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ বিএনপি সরকারের হাতেই নিরাপদ: অর্থমন্ত্রী

এদিকে ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ বর্তমান বিএনপি সরকারের হাতেই সবচেয়ে নিরাপদ বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। জাতীয় সংসদে ব্যাংকটির বর্তমান পরিস্থিতি ও পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে বিরোধী দলের আনা প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, এই ব্যাংকটির গোড়াপত্তন করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, তাই এর মর্যাদা ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী ব্যাংকটিকে ব্যর্থ করার যে অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তা রুখে দেয়ার ঘোষণা দিয়ে মন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংককে নিয়ে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র বা উচ্ছৃঙ্খলতা সহ্য করা হবে না। বিরোধী দলীয় সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাতের যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। কোনো কোনো বিরোধী দলীয় নেতা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে গোল্ড মেডেল দাবি করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যারা অর্থ নিয়েছেন তারা তো কেউ নিজের নামে টাকা নেননি। এই পুরো বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে বিগত নির্বাচন থেকে। আমরা দেখেছি, নির্বাচনে কিছু কিছু এলাকায় ক্যান্ডিডেটরা অবিশ্বাস্য রকমের টাকা খরচ করেছেন। এমন অনেক প্রার্থী ছিলেন যাদের দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য বা আয়ের উৎস জানা নেই, অথচ তারাও নির্বাচনে ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকা খরচ করেছেন। এই অবৈধ ও অপ্রদর্শিত অর্থ যখন রাজনীতিতে প্রবেশ করে, তখন তা গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিরোধী দলীয় নেতার আনা পিটিশনের বরাতে ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সমালোচনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল চেয়ারম্যানের চরিত্র নিয়ে যেসব মন্তব্য করেছে তা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব বিষয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি তদন্ত করে অনিয়মের কোনো প্রমাণ পায়নি।

তিনি প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেন, বিশ্বের কোনো ব্যাংকের গ্রাহকই চেয়ারম্যানের নাম দেখে টাকা জমা রাখে না বা উত্তোলন করে না। গ্রাহকের মূল স্বার্থ থাকে তার আমানতের নিরাপত্তা ও সঠিক লভ্যাংশ পাওয়ার ওপর। সুতরাং, চেয়ারম্যান পরিবর্তনের কারণে ইসলামী ব্যাংক থেকে ২-৩ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন হয়ে যাওয়ার যে দাবি বিরোধী দল করছে, তা অবান্তর। প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে একটি উগ্র গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে মিছিল ও বিশৃঙ্খল কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এই উশৃঙ্খলতার সঙ্গে বিরোধী দলের আশঙ্কার একটি যোগসূত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মূলত কিছু অশুভ শক্তি ইসলামী ব্যাংকটিকে ব্যর্থ করে দিয়ে দেশের সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলা নষ্ট করতে চায় এবং এর মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল দাবি করছে যে ফ্যাসিবাদ পরবর্তী সময়ে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের মুনাফা ১০৮ কোটি টাকা থেকে ১৩৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত চিত্র হলো, এটি ছিল মূলত ‘উইন্ডো ড্রেসিং’ বা কৃত্রিমভাবে দেখানো মুনাফা। খেলাপি ঋণের বিপরীতে বিশাল অংকের প্রভিশন পরবর্তী বছরের জন্য ডেফারেল বা স্থগিত সুবিধা নিয়ে এই মুনাফা দেখানো হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে ২০১৫ সালের (২০২৫ সালের) শেষে ইসলামী ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণ ৯৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা ব্যাংকের মোট ঋণ পোর্টফোলিওর ৫১ শতাংশ। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর যেখানে ব্যাংকটি ৬৯ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ডেফারেল সুবিধা নিয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪ হাজার কোটি টাকায়। এর ফলে ২০২৬ সালের প্রথম দিকে ব্যাংকটি কোনো মুনাফা করতে পারেনি, উল্টো প্রায় ২৬৮ কোটি টাকা নিট লোকসান গুনেছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিগত স্বৈরশাসকের সময় যখন ইসলামী ব্যাংক জোরপূর্বক দখল করা হয়েছিল, তখনও সাধারণ গ্রাহকরা কিন্তু তাদের আমানত তুলে নেননি। সুতরাং এখন চেয়ারম্যান পরিবর্তনের কারণে গ্রাহকরা টাকা তুলে চলে যাচ্ছেন, এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই ব্যাংকটিকে তার প্রকৃত ও বৈধ মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সংস্কার কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করার জন্য একটি রাজনৈতিক মহল দেশজুড়ে ‘মবোক্রেসি’ বা উশৃঙ্খলতার সংস্কৃতি তৈরি করতে চাচ্ছে। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশকে অস্থিতিশীল করার যে প্রবণতা, তা রুখে দেওয়া হবে।
বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, দেশের সর্বস্তরের মানুষ এবং বেসরকারি খাত মনে করে দীর্ঘদিন পর একজন যোগ্য গভর্নর দায়িত্ব পেয়েছেন, যিনি নিয়মনীতির মধ্যে থেকে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। তাকে ঋণগ্রস্ত বলে যারা খাটো করার চেষ্টা করছেন, তারা মূলত ভালো কাজকে স্বীকৃতি দিতে চান না। সংসদে উপস্থিত প্রায় সব সদস্যই কোনো না কোনোভাবে গাড়ি, বাড়ি বা ব্যবসার প্রয়োজনে ব্যাংকের কাছে ঋণগ্রস্ত। সুতরাং ঋণ থাকা কোনো অপরাধ নয়।

মন্ত্রী বলেন, বিএনপি সবসময় আর্থিক শৃঙ্খলায় বিশ্বাসী এবং অতীত সরকারগুলোর আমলেও দেশে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় ছিল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তাই এই ব্যাংকের ভবিষ্যৎ বিএনপির হাতে সম্পূর্ণ নিরাপদ। দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরের গুরুত্ব সরকার অক্ষরে অক্ষরে বোঝে। দেশের মানুষকে হতাশ করে এমন কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি না করতে বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, দেশের উন্নয়ন ও আগামী বাংলাদেশ গড়ার শপথ থেকে নির্বাচিত বিরোধী দলকে বাদ দেওয়া হচ্ছে না। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের স্বার্থে কাজ করার এবং তুচ্ছ ইস্যু নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান তিনি।

ইসলামী ব্যাংক মানেই ইসলাম নয়, সব হরিলুটের তদন্ত হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

এদিকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এবং জামায়াতে ইসলামী মানেই ‘ইসলাম’ নয় মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ধর্মের দোহাই দিয়ে সবকিছু থেকে বাঁচার সুযোগ নেই। এই ব্যাংকে আগে যে হরিলুট, রাজনৈতিক নিয়োগ ও ঋণ জালিয়াতি হয়েছে, তার সবকিছুর সুষ্ঠু তদন্ত করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই প্রস্তাবের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বিরোধী দলের কড়া সমালোচনা করেন। ব্যাংকটির সাবেক নিয়ন্ত্রকদের (জামায়াতে ইসলামী সংশ্লিষ্ট) ইঙ্গিত করে তিনি কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের কবিতা উদ্ধৃত করে বলেন, “কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে...।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘একবার যে ব্যাংক আজান দিয়ে, তাকবির দিয়ে দখল করা হলো, সেই ব্যাংকের দখলটা বেদখল হয়ে গেলে যে কী যাতনা, তা আমরা বুঝি। এখন পর্দার আড়ালে থেকে গ্রাহক সাজিয়ে রাস্তায় আন্দোলন করানো হচ্ছে। ইসলামের ওপর হাত দেবেন না বলে দোহাই দেওয়া হচ্ছে। মাননীয় স্পিকার, ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়। জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়। সুতরাং সবকিছুতেই ইসলামের দোহাই দেওয়া ঠিক নয়।’

ব্যাংকটির পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের (আরডিএস) তীব্র সমালোচনা করে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এটি নারী গ্রাহক নির্ভর একটি প্রকল্প। ভোটের আগে এই প্রকল্প থেকে নারীদের ১০ হাজার টাকা করে দিয়ে বলা হয়েছে— কোরআনের দলে ভোট না দিলে জান্নাতে যাওয়া যাবে না, ভোট দিলে জান্নাত মিলবে এবং আরও ১০ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। এই আরডিএস প্রকল্পে মোট ২২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৫ আগস্ট (২০২৪) পরবর্তী সময়ে নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, যার কোনো হদিস নেই।

রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেওয়ার অভিযোগ তুলে মন্ত্রী বলেন, ‘নাবিল গ্রুপকে এলসির বিপরীতে ৭০০ কোটি টাকা লোন দেওয়া হয়েছে। দুষ্টু লোকেরা বলে সেই টাকা একটি দলের নির্বাচনী তহবিলে গেছে এবং একটি টিভি চ্যানেল খোলা হয়েছে। লান্তাবুর গ্রুপকে হেড অফিসের অনুমোদন ছাড়া নির্বাচনের আগে ৪০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। সিএসআর ফান্ডের টাকা দিয়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজারের বিমানের টিকিট কাটা হয়েছে। এগুলোর সবকিছুর তদন্ত হবে।’
ইসলামী ব্যাংকে গণহারে চাকরিচ্যুতি ও রাজনৈতিক নিয়োগের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ব্যাংকটি দখল করার পর কোনো আইন-কানুন না মেনে অন্যায়ভাবে ৯ হাজার কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বিপরীতে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় ৬ হাজার নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ১৩ হাজার জনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে দুই-তিনটি করে প্রমোশন দেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়ম ইসলামের নামেই হয়েছে। অন্যায়ভাবে যাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তাদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

ব্যাংকটির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নতুন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এখনো কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ‘প্রিজাম্পশন অব ইনোসেন্স’ নীতি অনুসারে তিনি বেনিফিট পাবেন। যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসে, তবে নিশ্চয়ই তদন্ত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫, ৪৬, ৪৭ ও ৫৭ ধারার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় পর্ষদ বাতিল বা নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার পূর্ণ এখতিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রয়েছে।

বিরোধীদের শেয়ার ফেরত দেওয়ার দাবির জবাবে তিনি বলেন, ইবনে সিনা ব্লক মার্কেটে তিনগুণ দামে শেয়ার বিক্রি করেছে, যা একটি রেকর্ড। তবে যারা বৈধ এবং প্রকৃত শেয়ারহোল্ডার, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের মালিকানা ফেরত দেওয়ার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সেই সঙ্গে এস আলম গ্রুপের লাখো কোটি টাকা পাচারসহ বিগত সময়ে দেশের যত টাকা পাচার হয়েছে, সবকিছুর সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংসদকে আশ্বস্ত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

ইসলামী ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে অর্থনীতি মাটির সঙ্গে মিশে যাবে: বিরোধীদলীয় নেতা:

এদিকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি মাটির সঙ্গে মিশে যাবে বলে সতর্ক করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান। জোরজবরদস্তি করে যাদের কাছ থেকে ব্যাংকটির শেয়ার ডাকাতি করা হয়েছিল, অবিলম্বে তাদের কাছে সেই শেয়ার ফিরিয়ে দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, এস আলমের অপকর্মের দোসর ও দুর্নীতিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

সংসদে ‘দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং কোটি কোটি গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শেয়ারসমূহ বৈধ ও প্রকৃত মালিকদের নিকট প্রত্যর্পণ এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় অন্যায় হস্তক্ষেপ বন্ধ’ করার দাবিতে এ আলোচনার প্রস্তাব করেন বিরোধীদলীয় নেতা।

আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের জবাব দেন ড. শফিকুর রহমান। শেয়ারহোল্ডারদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, কীভাবে তারা শেয়ারহোল্ডার হয়েছেন সেটা পরে দেখা যাবে। এটা পরে কেন? এটা তো আগেই এক্সপোজড, সারা দুনিয়া জানে। এই ব্যাংক থেকে এস আলম তার নিজের নামেই ৮২ হাজার কোটি টাকা নিয়েছেন। আর সমুদয় যে শেয়ার তিনি কিনেছেন, যার মাধ্যমে তিনি ৮২ শতাংশের মালিক হয়েছেন, সেগুলোর মূল্য হচ্ছে মাত্র ১২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ তিনি শুধু কইয়ের তেল দিয়ে কই ভাজেননি, সন্যাশও ভেজেছেন। সব ব্যাংক থেকে ডাকাতি করা টাকায় তিনি শেয়ার কিনেছেন। একটি বিশেষ এজেন্সির মাধ্যমে প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করে যুগ যুগ ধরে ব্যাংকের সঙ্গে থাকা প্রকৃত শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার হস্তান্তরে বাধ্য করা হয়েছিল। এভাবেই ব্যাংকটিকে ডাকাতি করে দেউলিয়া করেছে বিগত সরকার।’

ব্যাংকটিতে অবৈধ নিয়োগ প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘১০ হাজার কর্মচারীকে সামান্য কোনো নিয়মনীতি না মেনে, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে, কোনো পরীক্ষা ছাড়াই ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। একটি কাগজে কেউ না কেউ সই করে দিয়েছে। ৫ আগস্টের পর আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি, তাদের সবাইকে আবার পরীক্ষায় বসার জন্য ডাকা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, বিনা পরীক্ষায় চাকরি নিয়েছেন, এখন নিয়মের মধ্যে পরীক্ষায় আসুন। কিন্তু তারা কেউ আসেনি।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর করা এক অভিযোগের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে ড. শফিকুর রহমান বলেন, ‘তিনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) ৭০০ কোটি টাকার লোন কোনো একটি দলের নির্বাচনী ফান্ডে যাওয়ার কথা বলেছেন। উনি যদি এর দ্বারা জামায়াতে ইসলামীকে বুঝিয়ে থাকেন, তবে আমি চ্যালেঞ্জ নিচ্ছি। এটা প্রমাণ করতে পারলে আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটি মেডেল দেব। কার ছেলে বা কার নাতি, চুরি-ডাকাতি বা অসততার মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ করে থাকলে তার বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আমি শফিকুর রহমান হলেও আমাকে যেন ছাড় দেওয়া না হয়।’

বিগত সময়ে অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাতের দেওয়া ‘জামায়াত ইসলামী হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে’ বয়ানের ভিত্তিতেই ব্যাংকটি দখল করে সাড়ে ১২ বছর দুঃশাসন চালানো হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সাড়ে ১২ বছরে তো তারা কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। এখনো যদি অনুমানের ভিত্তিতে কথা বলা হয়, তবে আমরা কি আবার দ্বিতীয় আবুল বারাকাত হতে যাচ্ছি? আরডিএস প্রকল্প কোনো দলের নয়, কোনো ধর্মেরও নয়। আমি নিজে বোর্ডে ছিলাম, আমি জানি এখানে সব ধর্মের মানুষ সুবিধাভোগী।’

নিজেকে ইসলামী ব্যাংকের ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহক উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমার ১০ টাকা মূল্যের একটি শেয়ার আছে। আমি রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, একজন গ্রাহক ও মালিক হিসেবে আমার অধিকার রক্ষার কথা বলছি। এই ব্যাংকে সব দল ও ধর্মের মানুষের অ্যাকাউন্ট আছে। এই ব্যাংক কারো একার নয়।’
অর্থনীতিতে ইসলামী ব্যাংকের অবদান ও বর্তমান সংকটের কথা তুলে ধরে ড. শফিকুর রহমান বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক আস্থার একটি পিরামিড। এই পিরামিড ধসে পড়লে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের অনাস্থা তৈরি হবে। আমি হজের সফরে গিয়ে প্রবাসীদের মুখে এই ব্যাংক নিয়ে সরাসরি উদ্বেগের কথা শুনেছি। দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে অর্থনীতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? বর্তমানে মাত্র চার দিনে গ্রাহকরা ৭০ হাজার কোটি টাকা তুলে ফেলেছেন।’
সবশেষে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষভাবে অনুরোধ করব, কোনো পূর্বধারণা থেকে নয়, বাস্তবতার ভিত্তিতে এই ব্যাংকটিকে বাঁচাতে হবে। এই ব্যাংক আগের জায়গায় ফিরে এলে পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর মানুষের আস্থা ফিরবে। এখনই ৫টি ব্যাংকের গ্রাহকরা রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষুকের মতো ঘুরছেন, আমানত ফেরত পাচ্ছেন না। সর্ববৃহৎ ব্যাংকটিরও যদি একই বিপর্যয় ঘটে, তাহলে আমরা গিয়ে কোথায় দাঁড়াব? ব্যাংকটি বাঁচুক, আমরা এটাই চাই।’

এস আলমের মতো ইসলামী ব্যাংক লুটে দুর্নীতিবাজদের বসাচ্ছে সরকার: সৈয়দ তাহের
স্বৈরাচার সরকারের আমলে এস আলম গ্রুপের লুটপাটের পর ইসলামী ব্যাংক যখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, তখন নতুন সরকার অর্থ উদ্ধারের বদলে ব্যাংকটি লুট করতে দুর্নীতিবাজদের বসিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, জোরপূর্বক দখল করা শেয়ার প্রকৃত মালিকদের ফিরিয়ে দিয়ে সৎ লোকদের মাধ্যমে ব্যাংকটি পরিচালনা করা না হলে তিন কোটি গ্রাহক রাস্তায় নামবে এবং দেশে বড় ধরনের গণআন্দোলন তৈরি হবে। তিনি বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উৎসাহ ও অনুমোদনে দেশে প্রথম ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি), কুয়েত ফাইন্যান্স, আল-রাজি গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের ফান্ডিং এবং দেশের সাধারণ মানুষের অর্থে এই ব্যাংক গড়ে ওঠে। চরম সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হওয়ায় এটি এশিয়ার অন্যতম সেরা ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং তিন কোটি মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়।
বিগত সরকারের আমলের লুটপাটের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বৈরাচার যখন ক্ষমতায় এলো, তারা এই ব্যাংক লুটপাটের সিদ্ধান্ত নেয়। এস আলম গ্রুপের মাধ্যমে ২৬টি ভুয়া কোম্পানি খুলে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়। এসব ভুয়া কোম্পানির মালিক সাজানো হয়েছিল এস আলমের পিয়ন, দারোয়ান, গাড়িচালক ও কর্মচারীদের।

গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যাংকটির ঘুরে দাঁড়ানোর কথা উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, অভ্যুত্থানের পর নতুন করে ২৬ হাজার কোটি টাকা আমানত রাখায় ব্যাংকটি কিছুটা প্রাণ ফিরে পায়। আমরা আশা করেছিলাম, নতুন সরকার বিদেশে পাচার হওয়া টাকাগুলো ফেরত আনার উদ্যোগ নেবে। কিন্তু তারা সেদিকে না গিয়ে ব্যাংকে এখন জনগণের যে টাকা আছে, তা কীভাবে লুটপাট করা যায় সে ব্যবস্থাই করছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন