দেশে বেকারত্ব দূরীকরণ ও তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে বর্তমানে বিনা সুদে কোনো ঋণ প্রকল্প না থাকলেও সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আওতায় নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এবং স্টার্টআপ উদ্যোক্তারা মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন। পাশাপাশি দেওয়া হচ্ছে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ ও ৫ হাজার টাকা ভাতা। সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য জনাব মোহাম্মদ আব্দুল মালিকের এক প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান- অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
মঙ্গলবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের (বাজেট অধিবেশন) তৃতীয়দিন সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালিক তার প্রশ্নে তরুণ উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ও বিনা সুদে ঋণ প্রদানের কোনো প্রকল্প আছে কি না, তা জানতে চান। জবাবে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক তরুণদের জন্য বিনা সুদে কোনো ঋণ প্রকল্প চলমান নেই। তবে সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম পরিচালনা করে আসছে।
নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০০ কোটির তহবিল
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র খাতে ‘নতুন উদ্যোক্তা পুনঃঅর্থায়ন স্কিম’-এর তহবিলের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এই তহবিল থেকে নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। এছাড়া জামানত সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
স্টার্টআপদের জন্য ৪ শতাংশ সুদে ঋণ ও ইক্যুইটি সহায়তা
স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রাপ্তি সহজ করার লক্ষ্যে ‘স্টার্ট আপ ফান্ড’- নামে ৫০০ কোটি টাকার আরও একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করার কথা জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, এই তহবিল থেকে উদ্যোক্তারা মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন। শুধু ঋণ নয়, স্টার্টআপ খাতের অনুকূলে ইক্যুইটি সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে ৩৯টি তফসিলি ব্যাংকের অংশীদারিতে ‘ইধহমষধফবংয ঝঃধৎঃ-ঁঢ় ওহাবংঃসবহঃ ঈড়সঢ়ধহু চখঈ’ নামক একটি ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানিও গঠন করা হয়েছে। স্টার্টআপ উদ্যোগগুলো এই কোম্পানি থেকে ইক্যুইটি সহায়তা গ্রহণ করতে পারবে।
বিনা খরচে ১০০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ ও ৫ হাজার টাকা ভাতা
উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণের বিষয়টি তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, ‘ঝশরষষং ভড়ৎ ওহফঁংঃৎু ঈড়সঢ়বঃরঃরাবহবংং ধহফ ওহহড়াধঃরড়হ চৎড়মৎধস (ঝওঈওচ)’-এর অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংকের চওট-ঝওঈওচ কর্তৃক পরিচালিত ঊহঃৎবঢ়ৎবহবঁৎংযরঢ় উবাবষড়ঢ়সবহঃ চৎড়মৎধস (ঊউচ)-এর মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় সম্ভাব্য উদ্যোক্তাদের মাসব্যাপী ১০০ ঘণ্টার উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।
এই প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য উদ্যোক্তাদের কোনো ফি দিতে হয় না। বরং সফলভাবে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা সাপেক্ষে উদ্যোক্তাদের ৫ হাজার টাকা প্রশিক্ষণ ভাতা প্রদান করা হয় এবং পরবর্তীতে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
এক মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২২ থেকে ১২৩ টাকার মধ্যে
সরকারের নীতিগত পদক্ষেপের ফলে বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বর্তমানে এক মার্কিন ডলারের বিনিময় হার প্রায় ১২২ থেকে ১২৩ টাকার মধ্যে রয়েছে। অধিবেশনে সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে অর্থমন্ত্রী এসব কথা জানান।
আবুল কালাম প্রশ্নে বলেন, ইহা সত্য কিনা যে, আমদানি নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগের পরও ডলার পরিস্থিতির উন্নতি হইতেছে না; বৈদেশিক লেনদেনের আর্থিক হিসাবে ঘাটতি বাড়িতেছে; এবং প্রশ্নের উত্তর সত্য হইলে, আর্থিক হিসাবে ঘাটতি হ্রাসকল্পে আমদানি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া আর কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন? উত্তরে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে সঠিক নয়। বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে চাপ থাকলেও সরকারের সামপ্রতিক নীতিগত পদক্ষেপের ফলে বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আমদানি ব্যবস্থাপনা, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় বাড়ানোর উদ্যোগ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে অর্থায়ন আলোচনা এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
আমদানি নিয়ন্ত্রণই সরকারের একমাত্র কৌশল নয়। সরকার বৈধ চ্যানেলে প্রবাস আয় বাড়ানো, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, স্বল্পসুদি ও দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক অর্থায়ন আহরণ, মুনাফা ও মূলধন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিনিময় হারকে আরও বাজারভিত্তিক ও পূর্বানুমানযোগ্য রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিরুৎসাহিত করলেও উৎপাদন, কৃষি, জ্বালানি, শিল্প ও রপ্তানি খাতের প্রয়োজনীয় আমদানি যাতে ব্যাহত না হয় সে বিষয়ে সতর্ক রাখা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো, রিজার্ভ শক্তিশালী করা, বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়ানো এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যকে টেকসই ভিত্তিতে উন্নত করা।
ব্যাংকিং খাতে সুশাসন: ৫ ইসলামী ব্যাংক একীভূত, আমানত সুরক্ষা বেড়ে ২ লাখ
ব্যাংকিং খাতকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এবং সুশাসন নিশ্চিতে নানামুখী কঠোর ও যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে দেশের পাঁচটি সমস্যাপীড়িত ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে। একইসঙ্গে আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে বীমার (সুরক্ষিত আমানত) পরিমাণ এক লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে এসব তথ্য জানান- অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমানের (প্রশ্ন নং-২০৬১) এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। লুৎফর রহমান জানতে চেয়েছিলেন, ব্যাংকিং খাতকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার বিশেষ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কি না; করলে তা কী?
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংকিং খাতকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকার একটি সুসংগঠিত ও বহুমাত্রিক রেজ্যুলুশন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে। যার আইনি ভিত্তি হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ‘ব্যাংক রেজ্যুলুশন আইন-২০২৬’ কার্যকর করা হয়েছে। এই কাঠামোর আওতায় পাঁচটি সমস্যাপীড়িত ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে, যা একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।
তিনি আরও জানান, ‘আমানত সুরক্ষা আইন-২০২৬’ এর মাধ্যমে আমানতকারীদের সুরক্ষিত আমানতের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর আমানতকারীরা আগে এই সুরক্ষার বাইরে থাকলেও বর্তমানে তাদেরও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
