হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে গত বছরের ভয়াল অগ্নিকাণ্ডের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই ফের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার রাতে কার্গো ভিলেজের ৯ নম্বর গেট সংলগ্ন এলাকায় আগুন লেগে ডিএইচএল কুরিয়ার সার্ভিসের বেশকিছু মালপত্র পুড়ে যায়। যে কন্টেইনারে আগুন লেগেছে সেখানকার পণ্যগুলো রোববার নিলামে ওঠার কথা ছিল। ইতিমধ্যে সর্বশেষ ঘটনায় করা তদন্ত কমিটির সদস্যরা বেশকিছু অসঙ্গতি পেয়েছেন। সন্দেহভাজন হিসেবে পাঁচ নিরাপত্তাকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছিল। তবে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। শুক্রবারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাতের ক্লু পেয়েছেন।
বারবার এই স্পর্শকাতর স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নানা প্রশ্ন ও রহস্য তৈরি হয়েছে।
রোববার বেলা ১২টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কার্যালয়ে এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম, প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাইজার সোহেল আহমেদ, বাংলাদেশে ডিএইচএল এক্সপ্রেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিয়ারুল হক, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্টস এসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মিজানুর রহমান, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে তদন্ত কমিটি জানায়, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা তথ্য-উপাত্ত, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট দু’জন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিকভাবে শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে- এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঘটনাস্থল থেকে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আগুন লাগার সময় ঘটনাস্থলে থাকা দুই ব্যক্তির আচরণে তাৎক্ষণিক কোনো তীব্র আতঙ্ক বা প্যানিকের লক্ষণ স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়নি। এই বিষয়গুলোও তদন্তের অংশ হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, সব তথ্য-প্রমাণ ও আলামত যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। বৈঠকে তদন্ত কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, এটি কেবল প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ। আগুনের প্রকৃত কারণ, দায়-দায়িত্ব এবং কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা ছিল কি না, তা চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এর আগেও ডিএইচএলের মালপত্র রাখার স্থানে আগুন লেগেছিল। পরপর দু’বার তাদের মালপত্র পুড়ে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। সেইসঙ্গে বিমানবন্দরের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার পর ঘটনাস্থলের কাছে ডিএইচএলের একজন কর্মী অবস্থান করছিলেন। তিনি সেখানে মশারি টাঙিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। আগুন লাগার পরও প্রায় দেড় থেকে দুই মিনিট তিনি শান্তভাবে আগুনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। পরে ফোন করে বিষয়টি অন্যদের জানান, যা সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।
তবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর রাতে প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, প্রাথমিকভাবে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে তিনি এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “শর্ট সার্কিট হবে কেন? এর আগেও যে অগ্নিকাণ্ড হয়েছিল, সেখানেও তদন্ত প্রতিবেদনে শর্ট সার্কিটের কথা বলা হয়েছিল। তাহলে নিশ্চয়ই কোথাও গাফিলতি রয়েছে। আমাদের তা স্বীকার করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, কমিটিকে দ্রুত প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। কারও গাফিলতির কারণে এ ঘটনা ঘটলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, বন্ধের দিনগুলোতে কার্গো ভিলেজে বারবার আগুন লাগার ঘটনা রহস্যজনক। তাদের ধারণা, এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকতে পারে। অতীতে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন হলেও দায়ীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। কার্গো ভিলেজে আমদানি পণ্যের জট কমাতে এবং দ্রুত খালাস নিশ্চিত করতে এর আগে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ বিজিএমইএকে চিঠি দিয়েছিলেন। সেখানে পণ্য দ্রুত খালাস না হলে অগ্নিঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছিল। এর কিছুদিনের মধ্যেই গত শুক্রবার রাত ১১টার দিকে আবার আগুনের ঘটনা ঘটে। তবে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে কার্গো ভিলেজে ১৫০ টনের বেশি কুরিয়ার পণ্য এবং প্রায় ১ হাজার ৬০০ টনের বেশি কার্গো পণ্য জমে আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা সতর্ক করে বলেন, এসব পণ্য দ্রুত খালাস না করা হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। বেবিচকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পণ্যজট কমাতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকে একাধিকবার চিঠি দেয়া হলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
এদিকে, কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমানো এবং পণ্যের জট নিরসনে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবারসহ ২৪ ঘণ্টা কার্গো ভিলেজ খোলা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম (রিতা)।
শুক্রবার রাত ১১টা ২৫ মিনিটে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো বিভাগের ৯ নম্বর গেট সংলগ্ন কনটেইনারে আগুন লাগে। খবর পেয়ে বিমানবন্দরের নিজস্ব ফায়ার ফাইটিং ইউনিট এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। ফলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়। এর আগে, গত বছরের ১৮ই অক্টোবর দুপুর আড়াইটার দিকে শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্সে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ১৩টি ফায়ার স্টেশনের ৩৭টি ইউনিট প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ওই সময় উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ থাকে। আগুন নেভাতে গিয়ে আহত হন আনসার বাহিনীর ২৫ সদস্যসহ মোট ৩৫ জন।
