বিতর্ক ও বাণিজ্যের বিশ্বকাপ খেসারত কতোখানি?

বিতর্ক ও বাণিজ্যের বিশ্বকাপ খেসারত কতোখানি?

ফন্ট সাইজ:

শুরুর আগে থেকেই এবারের ফিফা বিশ্বকাপ নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। কখনো ভূ-রাজনীতির আবার কখনো আকাশচুম্বী খরচের কারণে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা হতে যাওয়া এবারের বিশ্বকাপ। অবশ্য এ বিতর্ককে এড়িয়ে যাওয়ার সব চেষ্টাই করেছেন ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ানি ইনফান্তিনো। এবারের আসরকে মানবজাতির দেখা সর্বশ্রেষ্ঠ আয়োজন বলে অভিহিত করেছেন। বাস্তবে স্পোর্টসওয়াশিং, যুদ্ধবিগ্রহ আর বাণিজ্যিকীকরণের প্রভাবে সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা কমেছে। সেইসঙ্গে মাঠে গড়ানোর আগেই বাড়ছে বিতর্ক।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো আয়োজক দেশ টুর্নামেন্টে অংশ নেয়া অন্য একটি দেশের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের সামরিক উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক এ আসরে। টুর্নামেন্ট শুরুর এক মাস আগে ইরান দল তাদের বেস ক্যাম্প অ্যারিজোনা থেকে মেক্সিকোতে সরিয়ে নেয়। এর ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের কর্মকতা ও ব্যাকরুম স্টাফরা ভিসা পাননি। খেলোয়াড়দের ভিসাও ঝুলিয়ে রেখেছিল মার্কিন প্রশাসন।

ইরানের খেলোয়াড়দের দেয়া হয়েছে কঠোর নির্দেশনা। ম্যাচের দিন আমেরিকায় প্রবেশ করে ম্যাচ শেষেই সেদিনই দেশটি হতে ইরান দলকে ত্যাগ করতে হবে। ৪৮ দলের বিশ্বকাপে একটি দলের জন্য এমন নীতি চরম বৈষম্যমূলক। এদিকে টিকিটের চড়া দাম নিয়েও সমর্থকদের মাঝে ক্ষোভ দেখা গেছে। ২০১৮ সালে যৌথ বিড জয়ের সময় আয়োজক তিন দেশ ফাইনালের জন্য টিকিটের সর্বোচ্চ মূল্য ১,৫৫০ ডলার রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই দাম বেড়ে এখন ৫ গুনেরও বেশি হয়েছে। ফাইনাল দেখতে টিকিট প্রতি খরচ হবে ৮,৬৮০ ডলার। একে সমর্থক গোষ্ঠীগুলো মহাপ্রতারণা বলে অভিযোগ করেছেন। খরচ বাড়ার কারণে সাধারণ ফুটবল ভক্তরা সরাসরি মাঠে বসে খেলা উপভোগ করতে পারবেন না। যদিও চাহিদা অনুযায়ী দাম ওঠানামা করার ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ পদ্ধতি চালু করায় এবং ফিফার অফিসিয়াল রিসেল প্ল্যাটফরমে কৃত্রিমভাবে টিকিটের দাম বাড়িয়ে দেয়ায় নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সির কর্তৃপক্ষ ফিফার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তের ফল এখনো প্রকাশ হয়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব থেকে বাদ যাননি ম্যাচ অফিসিয়াল ও সাধারণ সমর্থকরা। সোমালিয়ার ইতিহাসে প্রথম রেফারি হিসেবে বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলেন ওমর আরতান। কিন্তু আমেরিকায় ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তালিকায় সোমালিয়ার নাম থাকায় তাকে মার্কিন ভিসা দেয়া হয়নি। পরে ফিফার তালিকা থেকে তার নাম কাটা হয়েছে। টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী ৪৮টি দেশের মধ্যে এক-চতুর্থাংশেরই বেশি দেশের সমর্থকরা কঠোর ভিসা নীতির কারণে হয়রানির শিকার হন। ১৫,০০০ ডলার অর্থ জামানত দেয়ার মতো সক্ষমতা না থাকায় অনেকে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। এর বাইরে এবারের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দল বাড়ার কারণে পরিবেশ দূষণের মাত্রাও বাড়বে। খেলোয়াড়দের অভ্যন্তরীণ যাতায়াত বিমানকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রায় ৯ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হবে। যা গত চার বিশ্বকাপের গড় নির্গমনের প্রায় দ্বিগুণ। ১৬ ভেন্যুর ১৪টিতেই তাপমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রা ছাড়াবে। আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকীর মধ্যে বৈশ্বিক এ টুর্নামেন্ট সফল করা স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা একে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। ফিফা এবারের আসর থেকে রেকর্ড ৯ বিলিয়ন ডলার আয় করবে বলে ভাবা হচ্ছে। আমেরিকার ট্রিলিয়ন ডলারের স্পোর্টস মার্কেট ধরার যে বাণিজ্যিক স্বপ্ন ফিফা দেখছে, তার মূল্য চোকাতে হচ্ছে সাধারণ ফুটবল ভক্তদের।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন