একসময় শান্ত-সৌম্য প্রবাহে আশপাশের জনপদের জীবন-জীবিকার অন্যতম অবলম্বন ছিল খোয়াই নদী। কিন্তু বর্তমানে নদীটির বিভিন্ন অংশে অবাধে বালু ও মাটি উত্তোলনের কারণে পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হবিগঞ্জ সদর থেকে শায়েস্তাগঞ্জ পর্যন্ত নদীর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ড্রেজার মেশিনের বিকট শব্দ আর এস্কেভেটরের দাপটে আতঙ্কে দিন কাটছে নদীপাড়ের হাজারো মানুষ। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বর্ষা মৌসুমে যেকোনো সময় ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিতে পারে, ফলে বিলীন হয়ে যেতে পারে বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। সরজমিন দেখা গেছে, হবিগঞ্জ সদরের কামড়াপুর, গরু বাজার, গোবিন্দপুর, রামপুর, ইনাতাবাদ, মাছুলিয়া, তেতৈয়া, মশাজান ও পাইকপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এবং শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার কলিমনগর, আলাপুর, পূর্ব লেঞ্জাপাড়া ও লক্ষরপুর এলাকায় নদীর তলদেশ থেকে ড্রেজার মেশিনের মাধ্যমে অবাধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে নদীর পাড় ও আশপাশের এলাকা থেকে এক্সকেভেটর দিয়ে মাটি কেটে ট্রাক্টর ও ডাম্প ট্রাকে করে বিভিন্নস্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনকে উপেক্ষা করে একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে এ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। প্রশাসনের অভিযানের খবর পেলেই সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখা হলেও কিছুদিন পর আবার পুরোদমে শুরু হয় বালু উত্তোলন। নদীপাড়ের বাসিন্দারা জানান, গত বছরের আগস্ট মাসে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে খোয়াই নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তখন শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার আলাপুর ও লেঞ্জাপাড়া এলাকার দু’টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। স্থানীয় কৃষকরা জানান, নদীর পাড় কেটে নেয়ার কারণে অনেক স্থানে কৃষিজমি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ভাঙন শুরু হলে কয়েক মৌসুমের মধ্যে শত শত একর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে শুধু কৃষকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে নদী থেকে উত্তোলিত বালু বহনে ব্যবহার করা হচ্ছে অসংখ্য ট্রাক্টর ও ভারী যানবাহন। এসব যানবাহনের কারণে গ্রামীণ সড়কগুলো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের দাবি, তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করছেন। তবে অনুমতির আড়ালে নদীর বিভিন্ন স্পর্শকাতর অংশ থেকেও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশে গভীর গর্ত সৃষ্টি হয়। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয় এবং পানির চাপ সরাসরি নদীতীরে আঘাত হানে। ফলে ভাঙনের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে খোয়াই নদীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ড্রেজার মেশিন ও অবৈধ মাটি কাটার কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে নদীভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, নদী সংরক্ষণে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানোরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
