অতিরিক্ত খাদ্য বর্জ্য ও তার সঠিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পৃথিবীর অন্যতম বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জকেই সম্ভাবনায় রূপান্তর করেছেন মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশের মেয়ে বৃষ্টি খাতুন। আমেরিকান নাগরিক ইদ্রিস হপিকে সঙ্গে নিয়ে বৃষ্টি মালয়েশিয়ার মাটিতে গড়ে তুলেছেন টেকসই ও নিরাপদ কৃষির এক নতুন মডেল, যা দেশটিতে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য যেমন অনুপ্রেরণার, তেমনি আধুনিক কৃষিব্যবস্থাপনায় এসেছে এক নতুন দিগন্ত।
মালয়েশিয়ার সানওয়ে ইউনিভার্সিটিতে গবেষণারত বৃষ্টি খাতুনের এই উদ্ভাবনী প্রকল্পের মূল ভিত্তি হলো খাদ্য বর্জ্যকে সারে রূপান্তর করা এবং সেই সারে উৎপাদিত ফসলকেও নিরাপদ করা। তবে তিনি শুধু কাগজে কলমে গবেষণা নিয়ে পড়ে থাকেননি। দূর প্রবাসে শত বাঁধা দূর করে তিনি স্পন্সর খুঁজে সেই স্পন্সরকৃত কোম্পানির সঙ্গে গড়ে তুলেছেন ব্যবসায়ী যৌথ কৃষি খামার।
সেই খামারকে প্রাণ দিতে বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট, দোকান ও বাজারের খাদ্য বর্জ্য সংগ্রহ করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তৈরি করছেন উচ্চমানের এক জৈব সার। এই সার ব্যবহারের পর উৎপাদিত ফল ইউনিভার্সিটির ল্যাবে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা করছেন তারা। গবেষণাগারের ফলাফল বলছে, এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত কৃষিপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা অন্যান্য ক্ষতিকারক উপাদানের উপস্থিতি খুবই কম।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও উচ্চতর গবেষণাগুলো বলছে, মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ভয়াবহ উপস্থিতির কথা। এ বিষয়ে বাংলাদেশি বৃষ্টি খাতুনের সঙ্গে কাজ করা আমেরিকান ইদ্রিস হপি মানবজমিনকে বলেছেন আশার কথা। তিনি জানিয়েছেন, আমাদের যৌথ এ গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অন্যান্য ফলের তুলনায় আমাদের উদ্ভাবিত সার এবং নিজেদের ফার্মে উৎপাদিত ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে।
গবেষণাগার কিংবা একাডেমিক আলোচনার বাইরেও বৃষ্টি তার জ্ঞানকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন সাধারণ মানুষের মাঝে। গত কয়েক বছরে তিনি প্রায় ৫ হাজার স্থানীয়, ভিনদেশি ও প্রবাসী বাংলাদেশিকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। বৃষ্টির স্বপ্ন, মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশি প্রবাসীরা শুধু প্রথাগত কাজে সীমাবদ্ধ না থেকে আধুনিক কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার। এরই ধারাবাহিকতায় তার নিজস্ব এগ্রি ফার্মে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি কর্মী নিয়মিত কাজ করছেন এবং নতুন নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে হাতে-কলমে শিখছেন তারাও।
সরজমিন ইউনিভার্সিটি পুত্র মালয়েশিয়ার তাদের ফার্মে ১ বছর ধরে কাজ করা বাংলাদেশি আব্দুল আলিমের সঙ্গে কথা হয়। তিনি মানবজমিনকে বলেন, এখানে কাজ করে আমি নিজেকে খুব গর্বিত মনে করি। কারণ একজন বাংলাদেশি নারীর তত্ত্বাবধানে এবং একজন আমেরিকানের সঙ্গে কাজ করে অনেক কিছু শিখতে পারছি। আমি মন দিয়ে শিখছি যাতে ভবিষ্যতে আমি দেশে ফিরে খামার বা এমন কিছু করে খেতে পারি।
আমেরিকান ইদ্রিস হপি এবং বাংলাদেশের বৃষ্টি খাতুন এই দুই ভিন্ন মনা, ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভিন্ন মহাদেশ থেকে আসা দুই তরুণ যখন হাত মিলিয়েছেন, তখন মালয়েশিয়ার কৃষি ও পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্র হয়েছে এক অনন্য উচ্চতার। তাদের এই যৌথ উদ্যোগে খাদ্য বর্জ্য আজ জমিতে সার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, আর মাটি ও পরিবেশ পাচ্ছে এক অর্গানিক প্রাণ।
সে প্রাণ সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে নানা ভাবে বিভক্ত মালয়েশিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটিকে আহ্বান জানিয়ে বৃষ্টি খাতুন বলেন, মালয়েশিয়ার কৃষিখাতে বাংলাদেশিদের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। আমি আমার প্রবাসী ভাই-বোনদের আহ্বান জানাই, কৃষিকে কেবল গতানুগতিক পেশা হিসেবে না দেখে একে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করুন। ঐক্যবদ্ধভাবে কৃষি ও টেকসই শিল্পে কাজ করতে পারলে আমরা মালয়েশিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের সুনাম আরও অনেক দূর নিয়ে যেতে পারব।
কমিউনিটির অনেকেই বলছেন, তাদের এই সফল যাত্রা শুধু মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের নয় বরং বিশ্বজুড়ে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত। উদ্ভাবন, মেধা এবং কমিউনিটির প্রতি দায়বদ্ধতার এই মেলবন্ধন প্রমাণ করে যে, সদিচ্ছা ও আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে প্রবাসেও নিজের দেশের পতাকাকে গৌরবোজ্জ্বল করা সম্ভব।
