বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য গল্প এখন কুরাসাও। ইতিহাসে বিশ্বকাপে অংশ নেয়া সবচেয়ে ছোট দেশ এটি। সেখানকার মানুষ খালি পায়ে সৈকতে অনুশীলন করে। জানালাবিহীন স্কুল বাসে ভ্রমণ করে। বিদেশ থেকে খেলোয়াড় নেয়। ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক কোচকে পেয়েছে তারা। মাত্র প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার জনসংখ্যার এটি হলো ক্যারিবীয় দ্বীপ। সেখানে নাইটলাইফ লন্ডন বা নিউইয়র্কের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে বলে বলা হয়। জয় হোক বা পরাজয় হোক, ‘ব্লু ওয়েভ’ হিসেবে পরিচিত দলটি তাদের স্বভাবসুলভ উচ্ছ্বাস ও বর্ণিল স্টাইলে খেলতে গিয়েছে বিশ্বকাপে। তাদের এক খেলোয়াড় তো এমনও বলেছেন, তারা ট্রফি জিততেই গিয়েছেন। তাদের স্কোয়াডে মূলত ডাচ বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের আধিক্য। তারা সানবেড আর কাঠের ছোট দোকানগুলোর পাশে ফুটবল অনুশীলন করে।
ব্রাজিলিয়ান স্টাইলে ভলিবল খেলা, বালিতে পুশ-আপ, আর নীলাভ সমুদ্রে হাসাহাসি- সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তাদের। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডেইলি মেইল।
এটা কল্পনা করাও কঠিন যে, এই দলই বিশ্বকাপে খেলতে গিয়েছে। সম্প্রতি তারা ভাইরাল হয়েছে একটি পুরনো ও ভাঙাচোরা স্কুল বাসে ভ্রমণের কারণে, যার জানালা নেই। খেলোয়াড়রা জানালা দিয়ে মাথা বের করে, বাসের গায়ে আঘাত করে উল্লাস করছিলেন। রোববার তারা মুখোমুখি হবে জার্মানির মতো শক্তিশালী দলের ৭২,০০০ ধারণক্ষমতার হিউস্টন স্টেডিয়ামে। দর্শকদের এই সংখ্যা তাদের দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।
প্রায় ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ সমর্থক তাদের অনুসরণ করে উত্তর আমেরিকায় যাওয়ার কথা। আর দেশে বাকি সবাই ম্যাচের সময় পার্টি করে বড় বড় স্ক্রিনে খেলা দেখবেন। ক্যারিবীয় সাগরের কাছে ভেনেজুয়েলা থেকে মাত্র ৪০ মাইল দূরের এই দ্বীপজুড়ে তখন উৎসবের পরিবেশ তৈরি হবে। এক ভক্ত ব্রেন্টন বালেনটিন বলেন, ম্যাচ চলাকালীন পুরো দ্বীপ থেমে যায়। আমরা খুব ছোট দেশ, এখানে সবাই এক পরিবারের মতো। বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়া আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
দলটি নিজেদের শিকড় ভুলে যায়নি। প্রস্তুতির সময় খেলোয়াড়রা সমর্থকদের সঙ্গে সময় কাটায়, সেলফি তোলে, সাক্ষাৎ করে এবং জার্সি ও বলে সই করে দেয়। দেশবাসীর সঙ্গে খেলোয়াড়দের এক ধরনের পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। যোগ্যতা অর্জনের সময় তারা ১০ ম্যাচে অপরাজিত ছিল। হাইতি, জ্যামাইকা ও ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর মতো দলকে পেছনে ফেলেছে। এতে তারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে যে, বড় মঞ্চেও তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে।
নভেম্বরে তারা জ্যামাইকার সঙ্গে ড্র করে বিশ্বকাপের সম্প্রসারিত ৪৮ দলের টুর্নামেন্টে জায়গা নিশ্চিত করে। সেই ম্যাচে স্টেডিয়ামে আনন্দের ঢেউ নেমে আসে, এমনকি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশও উল্লাসে অংশ নেয়। অন্যদিকে, এই ফলের কারণে সাবেক ইংল্যান্ড কোচ স্টিভ ম্যাকলারেনের জ্যামাইকা প্লে-অফে পড়ে যায় এবং পরে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর কাছে হেরে যায়। জ্যামাইকাকে হারানো সহজ ছিল না। কুরাসাও খেলেছিল অ্যাওয়ে ম্যাচে, যেখানে তারা দুইটি ফ্লাইটে সমর্থক নিয়ে গিয়েছিল কিংস্টনের ৩৫,০০০ ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দর্শক জ্যামাইকার পক্ষেই ছিল, তবুও নীল জার্সির সমর্থকরা পরিবেশ বদলে দেয়।
কুরাসাও অধিনায়ক লিয়ান্দ্রো বাকুনা বলেন, ঈশ্বর সেই রাতে আমাদের সঙ্গে ছিলেন। অনেক সুযোগ তৈরি হয়েছিল, পোস্টে লেগেছিল বল। কিন্তু আমাদের গোলকিপার দুর্দান্ত ছিলেন। মনে হয় এটা আমাদের জন্যই লেখা ছিল। দলের প্রধান কোচ ৭৮ বছর বয়সী ডাচ অভিজ্ঞ কোচ ডিক অ্যাডভোকাট। তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক কোচ হতে যাচ্ছেন। তিনি আগে সান্ডারল্যান্ড ক্লাবের কোচ ছিলেন। ফেব্রুয়ারিতে পদ ছাড়লেও পরে মে ২০২৬-এ আবার দায়িত্বে ফিরে আসেন তিনি।
কুরাসাও দলটি মূলত নেদারল্যান্ডস বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত। কুরাসাওতে জন্মগ্রহণ করেছেন শুধু তাহিথ চং। ২০১০ সালের আগে কুরাসাও আলাদা জাতীয় দলই ছিল না। তখন তারা নেদারল্যান্ডস অ্যান্টিলিসের অংশ ছিল। তাই তাদের এই উত্থানকে অনেকেই অবিশ্বাস্য বলে মনে করেন। র্যাঙ্কিংয়ে তারা ৮২ নম্বরে, যা অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে তৃতীয় সর্বনিম্ন। তবুও তারা আত্মবিশ্বাসী।
রাইট-ব্যাক লিভানো কোমেনেনসিয়া বলেন, আমরা ডাচ ফুটবল শৈলীতে বড় হয়েছি। আমাদের কৌশল ও দক্ষতা ভালো। আমরা অনেককে চমকে দেব। তিনি আরও বলেন, ফুটবলে যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। সবসময়ই ১১ বনাম ১১। এমনকি জার্মানির বিপক্ষেও জয় সম্ভব। তার মতে, গ্রুপ পর্বে পরের ধাপে যেতে চার পয়েন্ট যথেষ্ট হতে পারে- একটি জয় ও একটি ড্র। তিনি আরও যোগ করেন, বিশ্বকাপে অংশ নেয়াই আমাদের জন্য বিশাল অর্জন। অনেকেই আমাদের ইতিমধ্যে বিজয়ী মনে করছে। কিন্তু আমরা এখানে শুধু অংশ নিতে আসিনি। আমরা জিততে এসেছি।
