জুলাইয়ের হত্যা মামলা: প্রতিষ্ঠান দখলে নিতে পুলিশের সঙ্গে মিলেমিশে মিথ্যা মামলা

সহযোগীদের খবর

জুলাইয়ের হত্যা মামলা: প্রতিষ্ঠান দখলে নিতে পুলিশের সঙ্গে মিলেমিশে মিথ্যা মামলা

ফন্ট সাইজ:

ইত্তেফাক

দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ‘প্রতিষ্ঠান দখলে নিতে পুলিশের সঙ্গে মিলেমিশে মিথ্যা মামলা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর ঝিগাতলা মোড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মনেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আব্দুল মোতালিব (১৪)। সেই ঘটনায় ২৬ আগস্ট রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন মোতালিবের বাবা আব্দুল মতিন। একই ঘটনায় ঐ বছরের ৩০ অক্টোবর আদালতে একটি মামলার অভিযোগ দেন শেখ মুহাম্মদ মাছুম বিল্লাহ নামের এক ব্যক্তি। মামলাটি হাজারীবাগ থানায় হত্যা মামলা হিসেবে দায়ের করার নির্দেশ দেয় আদালত। মাছুম বিল্লাহ ভিকটিমের নাম উল্লেখ করেন আব্দুল মোতালেব মুন্না। তার বয়স উল্লেখ করেন ১২ বছর। বাদীর সঙ্গে ভিকটিমের কোনো সম্পর্ক নেই। শিক্ষার্থী মোতালিবের বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায়। আর নতুন মামলার বাদী শেখ মাছুম বিল্লাহর বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুরে।

আব্দুল মতিন এজাহারে ১৭৭ জন আসামির নাম উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান খানকে পুলিশ এই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়েছে। অন্যদিকে মাছুম বিল্লাহ যে অভিযোগ দিয়েছেন, সেখানে আসামি করেছেন ২০ জনকে। তাদের কারো বাসা ঐ এলাকায় নয়, অধিকাংশ রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্তও নয়। আসামিদের মধ্যে পুলিশ তিন জনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডেও নিয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠান দখলে নেওয়ার জন্য এই মামলা বলে আসামিদের অভিযোগ। সর্বশেষ প্রতিষ্ঠানটি মাছুম বিল্লাহ দখল করেছেন বলে জানা গেছে।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক প্রচার সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা এম এ রাজ্জাক ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানটি দখলে নেওয়ার জন্য মাছুম বিল্লাহ এই মামলা করেছেন। ঐ মামলার পর ডিবির একজন এসআই এসে আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে দুই জনকে ধরে নিয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটি মাছুম বিল্লাহর হাতে তুলে দিয়েছে। এখন এদের অন্য মামলায়ও ফাঁসানো হবে বলে টাকা চাচ্ছে পুলিশ। বিষয়টি আমি পুলিশ কমিশনারের কাছে অভিযোগ করেছি।

নিহত শিক্ষার্থীর বাবা আব্দুল মতিন ইত্তেফাককে বলেন, ছেলে হত্যার ঘটনায় আমি নিজে মামলা করেছি। অন্য কেউ কেন মামলা করবে? আমি ঐ ব্যক্তিকে চিনি না। তিনি নিশ্চয় ভালো উদ্দেশ্যে এই মামলা করেননি। হাজারীবাগ থানার ওসি ফোন করে আমাকে জানিয়েছেন মামলার কথা। আমি নিজেও যে মামলাটি করেছি, সেখানে ছাত্ররাই আসামিদের নাম উল্লেখ করেছে। আমি এদের কাউকে চিনি না। তারপরও এই মামলা বাদী আমি।

মামলার সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে আব্দুল মতিন বলেন, থানা থেকে মামলাটি ডিবিতে পাঠানো হয়েছিল। কিছু দিন আমি ডিবির সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু তাদের কাছ থেকে কোনো সদুত্তর পাইনি। এরপর থেকে কেউ আমার সঙ্গেও যোগাযোগ করেনি। ফলে বিচারের ভার আমি আল্লাহর কাছে ছেড়ে দিয়েছি। হাজারীবাগ থানার মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওখান থেকেও এখন আর কেউ যোগাযোগ করে না। মনে হয়, ঐ মামলাটিও ওভাবেই পড়ে আছে। তদন্ত শুরু হলে তো আমার সঙ্গে যোগাযোগ করত?

একইভাবে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ৫ আগস্ট ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় কিশোর মাহমুদুল হাসান। মাসখানেক পর ১২ সেপ্টেম্বর তার বাবা রিকশাচালক মিজানুর রহমান ঢাকার আদালতে যান ছেলে হত্যার ঘটনায় মামলা করতে। আদালত তার জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করে। পরে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ আদালতকে জানায়, ঐ ঘটনায় আগেই একজন মামলা করেছেন। ফলে বাবার আবেদন খারিজ হয়ে যায়। এরপর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, মাহমুদুল (১৫) হত্যায় একটি নয়, আগেই দুটি মামলা হয়েছে। এর একটি ডেমরা থানায়, তাতে আসামি করা হয় ৯৩ জনকে। এতে বলা হয়, মাহমুদুলকে ডেমরা এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয়। অপর মামলাটি যাত্রাবাড়ী থানায়, তাতে আসামি করা হয় ৩৭ জনকে। এই মামলায় বলা হয়, মাহমুদুলকে হত্যা করা হয়েছে যাত্রাবাড়ীতে। দুই মামলায় দুই থানার পুলিশ দুজনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডেও নিয়েছে।

এই দুই মামলার বাদীদের চেনেন না মাহমুদুলের বাবা মিজানুর রহমান। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, আমার ছেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। ছেলেকে গুলি করে হত্যা করা হলো। কিন্তু আমি মামলা করতে পারিনি। ডেমরা ও যাত্রাবাড়ী থানার দুই মামলা এবং ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন আদালতে বাবার করা মামলার আবেদন তিনটির এজাহারে ঘটনাস্থল নিয়ে তিন রকম তথ্য দেওয়া হয়েছে। কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা মিজানুর রহমান ও হাসি বেগম দম্পতির সন্তান মাহমুদুল হাসান। কয়েক বছর আগে মিজানুর ও হাসি বেগমের ছাড়াছাড়ি হয়। এরপর নারায়ণগঞ্জের সানারপাড় এলাকায় নানির কাছে বড় হয় মাহমুদুল।

মিজানুর রহমান বলেন, তার ছেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। তিনি নিজেও যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনে অংশ নেন। মাহমুদুল ৫ আগস্ট সকালে সানারপাড়ের বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। সন্ধ্যায় খবর পান, যাত্রাবাড়ীতে তার ছেলের মাথায় গুলি লেগেছে। মরদেহ রয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে। এ ঘটনায় প্রথম মামলাটি করেন ডেমরা এলাকার বাসিন্দা জুলহাস শেখ। তিনি ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে করা আবেদনে আসামি হিসেবে ৯৪ জনের নাম উল্লেখ করেন। এজাহারে দাবি করা হয়, নিহত মাহমুদুল বাদীর ভাগনে হয়। অথচ মিজানুর রহমান এই জুলহাসকে চেনেন না।

একই ঘটনায় ১০ সেপ্টেম্বর সিএমএম আদালতে ৩৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার আবেদন করেন রবিউল আওয়াল নামের এক ব্যক্তি। ১৮ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী থানায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়। মামলার বাদী রবিউল আওয়াল মাহমুদুলের কোনো আত্মীয় নন। মাহমুদুলের মা-বাবা কেউই মামলা করেননি বলে তিনি এই মামলা করেছেন। পরে মামলা থেকে দুই ব্যবসায়ীর নাম প্রত্যাহার চেয়ে আদালতে আবেদন করেছেন বাদী রবিউল আওয়াল। তার দাবি, আইনজীবীর ভুলে ঐ দুই ব্যবসায়ীর নাম মামলায় উল্লেখ করা হয়েছিল।

একইভাবে সাভারের রেডিও কলোনির নয়াবাড়ি পেট্রোল পাম্পের সামনে গুলিতে মারা যান আল আমিন (৩৮) নামে একজন হকার। এই ঘটনায় নিহতের স্ত্রী সুমী (৩৬) বাদী হয়ে মিরপুর থানায় ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর একটি হত্যা মামলা করেন। আবার আল আমিন নিহতের ঘটনায় ২০২৫ সালের ৪ জানুয়ারি সাভার থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। এই মামলার বাদী আবু হানিফ সেলিম। তার বাড়ি রাঙামাটির লংগদু উপজেলার ১৬ নম্বর খাগড়াছড়ি গ্রামে। অথচ নিহত আল আমিনের বাড়ি মাগুরা জেলার সদর উপজেলার পারনান্দুয়ালি গ্রামে। নিহত আল আমিনের সঙ্গে আবু হানিফ সেলিমের কোনো সম্পর্ক নেই।

আল আমিনের স্ত্রী সুমীর মামলার তদন্ত করতে গিয়ে মিরপুর থানার এসআই রোকনুজ্জামান দুটি মামলার সন্ধান পান। এরপর তদন্ত থামিয়ে তিনি আদালতে পুরো বিষয়টি উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি বলেছেন, আল আমিন সাভারে মারা গেলেও তার স্ত্রী ভুল তথ্য দিয়ে বলেছেন, তিনি মিরপুর ১০ নম্বরের ফায়ার সার্ভিসের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। অথচ আবু হানিফ যে মামলাটি করেছেন সেখানে তিনি সঠিক তথ্য উল্লেখ করলেও কেন তিনি এতদিন পর এই মামলা করলেন তা পরিষ্কার নয়। এজাহার থাকা ফোন নম্বরে যোগাযোগ করেও আবু হানিফকে পাওয়া যায়নি। নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বর্তমান ঠিকানা সাভারের জালেশ্বরে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।

এ প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, অনেকগুলো ঘটনায় এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এখন তদন্তে গিয়ে সত্য উদ্ঘাটিত হবে। আমরা দেখেছি, ৫ আগস্টের আগের অনেকগুলো ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটা মামলা করেছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পরিবার মামলা করতে গিয়ে দেখে পুলিশ মামলা করেছে। পুলিশের মামলায় আসামি করা হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের। ফলে এই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। মামলাগুলো একত্রিত করে তদন্তে সত্য বের করতে হবে। যাতে প্রত্যেকের পরিবার ন্যায় বিচার পায়।

সিনিয়র আইনজীবী সাইদ আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, মিথ্যা অভিযোগকারী কিংবা মামলা দায়েরকারীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারা অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো, ঐ মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে হবে। বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের যদি মনে হয়, আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মিথ্যা, ভিত্তিহীন, তুচ্ছ, বিরক্তিকর বা হয়রানিমূলক এবং আসামির প্রতি চাপ সৃষ্টি করতে মামলাটি করা হয়েছে, তাহলে এ ধরনের মামলা মিথ্যা মামলা হিসেবে গণ্য হবে। মামলা মিথ্যা বা ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হলে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগকারী বা মামলা দায়েরকারীকে দণ্ড দিতে পারেন। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিও মামলা করতে পারেন।

মামলা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হলে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫০ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিতে পারেন। এমনকি আদালত মিথ্যা অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে দণ্ডমূলক ব্যবস্থাও নিতে পারেন। আমলযোগ্য নয়, এ রকম কোনো মামলায় কোনো পুলিশ কর্মকর্তা মিথ্যা প্রতিবেদন দিলে তার বিরুদ্ধেও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫০ ধারা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ দিতে পারেন।

প্রথম আলো

‘পশুর হাট নিয়ন্ত্রণে পুরোনো ধারা’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের নেতা-কর্মী ও তাঁদের ঘনিষ্ঠজনদের কাছেই কোরবানির পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ থাকে। কোথাও তাঁরা সরাসরি ইজারাদার হিসেবে থাকেন, আবার কোথাও নেপথ্যে থেকে হাট পরিচালনা করেন। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ক্ষমতাসীন দলের বাইরে অন্য কেউ দরপত্র দাখিল করার সাহসও পান না। যদিও কাগজে-কলমে দেখানো হয়—নিয়ম মেনেই দরপত্রের মাধ্যমে হাটের ইজারা নেওয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগের (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) শাসনামলে রাজধানীর অস্থায়ী পশুর হাটগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছিল দলটির নেতা-কর্মীদের কাছে। গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই নিয়ন্ত্রণ এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিএনপি ও তাদের ঘনিষ্ঠজনদের কাছে।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় দলটির নেতা-কর্মীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সমঝোতার মাধ্যমে দরপত্র দাখিল করতেন। আগেই ঠিক করা হতো কোন হাট কে ইজারা নেবেন। যদিও পুরো প্রক্রিয়াকে ‘প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ’ দেখানো হতো। একটি হাটে যাতে একাধিক দরপত্র জমা হয়, সেই ব্যবস্থা করতেন তাঁরা। কে কত দর উল্লেখ করবেন, তা সমঝোতার মাধ্যমে ঠিক করে রাখা হতো। আওয়ামী লীগ বা দলটির ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের বাইরে অন্য কেউ যাতে দরপত্র জমা দিতে না পারেন, সেই ব্যবস্থাও থাকত। ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও পুরোনো সেই ধারা খুব বেশি বদলায়নি।

এবার রাজধানীতে অস্থায়ী পশুর হাট বসবে ২১টি। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে ১১টি আর ঢাকা দক্ষিণে ১০টি। উত্তরের সব কটি অস্থায়ী হাট এবার ইজারা পেয়েছেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা। কোথাও সরাসরি ইজারাদার হিসেবে রয়েছেন, কোথাও আবার হাট পরিচালনার নেপথ্যে আছেন তাঁরা। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণে অস্থায়ী ১০টি পশুর হাটের মধ্যে ৮টির ইজারাদার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও তাঁদের ঘনিষ্ঠজনেরা। একটি হাটের ইজারা পেয়েছে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এক ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠান। আরেকটি হাটের ইজারাদার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এক ব্যবসায়ী।

নগর–পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা। আওয়ামী লীগ আমলে যেভাবে চলেছে এখনো যদি সেভাবেই চলে, তাহলে পরিবর্তন হলো কোথায়? এবার কোরবানির পশুর হাটের ইজারার ক্ষেত্রে দেখা গেল প্রায় সব হাট ঘুরেফিরে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ইজারা নিয়েছেন। এসব ভালো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।

দক্ষিণের ৮টিতেই বিএনপি

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, কোনো হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে সরকারি দরের প্রায় চার গুণ বেশি মূল্যে। আবার কোনোটির ইজারামূল্য সরকারি দরের চেয়ে মাত্র ১০ হাজার টাকা বেশি। যেমন ডেমরার আমুলিয়া মডেল টাউন এলাকায় অস্থায়ী পশুর হাটের জন্য সরকারি ইজারামূল্য ছিল ৫৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। এই হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ টাকায়। আবার সিকদার মেডিকেল কলেজ-সংলগ্ন এলাকায় অস্থায়ী হাটের ইজারামূল্য ছিল ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। মাত্র ১০ হাজার টাকা বেশি দরে এই হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে।

পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের পশ্চিম পাশে নদীর পারের পশুর হাট ইজারা পেয়েছেন শ্যামপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মাহবুব মাওলা। এই হাট ৪ কোটি ১ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন তিনি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর এই হাট ইজারা নিতেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মইন উদ্দিন চিশতী; আর গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় এই হাটের ইজারা পেয়েছিলেন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মুহাম্মদ আলী নামের এক ব্যক্তি।

এই হাট ইজারা পাওয়া শ্যামপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মাহবুব মাওলা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে হাট ইজারা নেওয়ার মতো অবস্থা অন্য কোনো দলের কারও ছিল না। এবার হাট ইজারার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ছিল। ২ কোটি ৭১ লাখ টাকার হাট ৪ কোটি ১ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছি।’

উত্তর শাহজাহানপুরে মৈত্রী সংঘ ক্লাব-সংলগ্ন হাট ইজারা পেয়েছেন ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান। তিনি ৩ কোটি ১২ লাখ টাকায় হাটটি ইজারা নিয়েছেন। আনিসুর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। গত বছরও এই হাটের ইজারা পেয়েছিলেন তিনি। এর আগে এই হাট ইজারা নিতেন আওয়ামী লীগের সাবেক কাউন্সিলর হামিদুল হক এবং শাহজাহানপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল লতিফ।

ডেমরার আমুলিয়া মডেল টাউন এলাকার পশুর হাট ইজারা পেয়েছেন ডেমরা থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদীন। ২ কোটি ১৫ লাখ টাকায় হাটের ইজারা পেয়েছেন তিনি। গত বছরও এই হাটের ইজারা তিনি পেয়েছিলেন। এর আগে এই হাটের ইজারা নিতেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এস এম নেওয়াজ সোহাগ নামের এক ব্যবসায়ী।

রহমতগঞ্জ ক্লাবের পাশের হাট ইজারা পেয়েছেন রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটির সভাপতি টিপু সুলতান। তিনি চকবাজার থানা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি। গত বছরও হাটটির ইজারা নিয়েছিলেন তিনি। এর আগে এই হাটের ইজারাদার ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য সোলায়মান সেলিম।

ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের পাশের পশুর হাট ইজারা নিয়েছেন মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন। তিনি মতিঝিল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। ৩ কোটি ১ লাখ টাকায় হাটের ইজারা পেয়েছেন তিনি।

যুগান্তর

দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘এত শিশুমৃত্যুর দায় কার’। প্রতিবেদনে বলা হয়, আড়াই মাসে হামে পাঁচশ শিশুর মৃত্যু। অথচ এই মৃত্যু ঠেকানো যেত, যদি সময়মতো গণটিকা কার্যক্রম চলত। পরপর তিন সরকারের চরম অবহেলা এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সিদ্ধান্তহীনতার মূল্য দিতে হচ্ছে শত শত শিশুর প্রাণে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকার স্বাস্থ্য খাতের সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার বিকল্প ব্যবস্থা না নিয়েই সেটি একেবারে বাতিল করে দেয়। এছাড়া তিন দফায় পেছায় টিকা ক্যাম্পেইন। আর জানুয়ারিতে সংক্রমণ শুরু হলেও ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার দ্রুত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। হাসপাতালগুলোতেও পর্যাপ্ত হাই ফ্লো অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর, আইসিইউ, পিআইসিইউ, শয্যা ও আইসোলেশন নিশ্চিত করা যায়নি। স্বাস্থ্য খাতের এই ধারাবাহিক অবহেলার কারণেই দেশে হামে এত মৃত্যু বলে অভিযোগ জনস্বাস্থ্যবিদদের। সন্তান হারানো পরিবারগুলো বলছে, দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

জানা যায়, স্বাস্থ্য খাতে চতুর্থ ধাপের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর প্রোগ্রাম (এইচএনপিএসপি) শেষ হয় ২০২৪-এর জুনে। পঞ্চম ধাপের কার্যক্রমের প্রস্তুতি চললেও নানা কারণ দেখিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার টিকা ক্রয়ের যথাযথ বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করেই সেটি বাতিল করে এবং ২ বছরের একটি কর্মসূচি হাতে নেয়। কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর আর টিকার জন্য অর্থ ছাড় করা হয়নি। ফলে পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে টিকা ক্রয় ও মজুতে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেয়।

জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ‘ইউনিসেফ’র দাবি, ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতায় সময়মতো গণটিকা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সংস্থাটি সরকারকে একাধিকবার সতর্কও করেছিল। কিন্তু তাতে কর্ণপাত করেনি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান দাবি করেন, ২০২৫ সালে হামের টিকার (রুটিন) অভাবে কোনো মানুষ ফিরে গেছেন বলে জানা যায় না। তাছাড়া গণটিকা ক্যাম্পেইন সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত ‘ইন্টার-এজেন্সি কো-অর্ডিনেশন কমিটি (আইসিসি)’ নিয়ে থাকে। যেখানে ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরাও থাকেন। ইউনিসেফ ‘হামের প্রাদুর্ভাব’ নিয়ে তেমন কিছুই জানায়নি।

এর আগে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছিলেন, তারা টিকার সংকট ও হামের মৃত্যুর ঘটনায় কাজ করছেন। সে সময় এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রোগ্রামে দেশের বাইরে (সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়) আছি। টিকার বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। কাজ চলছে। আমি দেশে এসে অফিশিয়ালি জানাব।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক। সবকিছুই হবে ট্রান্সপারেন্ট (স্বচ্ছ)। টিকা নিয়ে কী হয়েছিল সবকিছুই জানানো হবে।’

এদিকে অভিযোগ-পালটা অভিযোগের মধ্যে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে দুজন এবং উপসর্গে বাকিরা মারা যায়। একই সময়ে ৫৪ জন নিশ্চিত এবং ১২৬১ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট ৬৮ হাজার ৮৬৯ শিশু হামে আক্রান্ত ও ৪৯৯ জনের মৃত্যু হলো। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ৮৫ জন এবং উপসর্গ নিয়ে ৪১৪ জন মারা গেছে। চলতি বছর বিশ্বে এটি হামে সর্বোচ্চ মৃত্যু। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সুদান, দেশটিতে মারা গেছে ৩৭১ জন। তৃতীয় অবস্থানে থাকা পাকিস্তানে প্রাণ গেছে ৭১ জনের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে ২৯ হাজার ১৮৬ জন ভর্তি হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামে ৯ হাজার ৮৫২ জন, রাজশাহীতে ৫ হাজার ৮৯৬ জন, বরিশালে ৫ হাজার ১৪২ জন, সিলেটে ৩ হাজার ১১০, খুলনায় ৪ হাজার ৬০৭ জন, ময়মনসিংহে ১ হাজার ৫৩৫ জন ও রংপুরে ১ হাজার ২১২ জন ভর্তি হয়েছেন। অন্যদিকে ঢাকা বিভাগে ২১০ জন (নিশ্চিত হাম ও উপসর্গ মিলে) মারা গেছে। এরপর রাজশাহী বিভাগে ৮১, চট্টগ্রামে ৫০, সিলেটে ৪৮, বরিশালে ৪৮, ময়মনসিংহে ৩৬, খুলনায় ২১ জন ও রংপুরে ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসংশ্লিষ্টরা যুগান্তরকে জানান, দাতা সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ১৯৯৮ সালে স্বাস্থ্য খাতে সেক্টর প্রোগাম (এইচএনপিএসপি) শুরু হয়। ২০২২ সালে চতুর্থ সেক্টর প্রোগ্রামের মেয়াদ শেষ হয়। দেশের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ায় ২০২২-২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আগামীতে কোনো সেক্টর প্রোগ্রাম না করার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে চতুর্থ সেক্টর প্রোগ্রাম কর্মসূচির মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ায়। হাম-রুবেলার (এমআর) ক্যাম্পেইনের গণটিকা আনার আগেই চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতন হয়।

সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে দেশে ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সি শিশুদের হামের রুটিন টিকা দেওয়া হয়। ইপিআই সংশ্লিষ্টরা বলেন, দেশে কখনোই রুটিন টিকাদান ব্যাহত হয়নি। রুটিন কর্মসূচিতে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে প্রতি ৪ বছর অন্তর দেশব্যাপী হামের গণটিকা ক্যাম্পেইন করা হয়। ২০২০ সালের পর ২০২৪ সালে গণটিকা ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হয়নি।

কালের কণ্ঠ

‘হামে শিশুমৃত্যু ৫০০ ছুঁই ছুঁই’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ক্রমে বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। সংক্রমণ বাড়ার পাশাপাশি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে শিশুমৃত্যু।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আরো ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুই শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছিল, আর ৯ জন উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৪৯৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৮৫ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছিল এবং ৪১৪ শিশু উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে।

ঢাকায় সবচেয়ে বেশি, ২১০ জন মারা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে এক হাজার ২৬১ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে। সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ৫৪০। আক্রান্তদের বড় অংশই শিশু, বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর দ্রুত ও সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে দেরি হওয়ায় পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাঁদের মতে, সময়মতো ব্যাপক টিকাদান, রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা নির্দেশিকা, অক্সিজেনসহ জরুরি সেবা নিশ্চিত করা গেলে এত মৃত্যু এড়ানো সম্ভব ছিল।

তাঁরা বলছেন, শুধু টিকাদান বাড়ালেই হবে না, একই সঙ্গে শিশুদের পুষ্টি, দ্রুত চিকিৎসা, অক্সিজেন সাপোর্ট এবং স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করতে হবে। তাঁদের মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে সামনে আরো বড় মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। কারণ হাম শুধু একটি ভাইরাসজনিত রোগ নয়, এটি দেশের জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাকেও স্পষ্ট করে তুলেছে।

দেশে এর আগে সর্বোচ্চ হাম রোগী শনাক্ত হয়েছিল ২০০৫ সালে, তখন আক্রান্ত ছিল ২৫ হাজার ৯৩৪ জন। এরপর টিকাদান কর্মসূচির কারণে সংক্রমণ অনেক কমে আসে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মাত্র ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। তার আগের পাঁচ বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে দুই হাজার ৪১০, ২০৩, ৩১১, ২৮১ ও ২৪৭। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। কিন্তু কোনো সময়েই হামের রোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়ায়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় দেশে হামের নজরদারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশে হামে একজনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৭ সালে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ১০ শিশুর মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে আরো ছয় শিশুর মৃত্যু হলেও তাদের নমুনা সংগ্রহ করা যায়নি। সর্বশেষ ২০২০ সালে বান্দরবানে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। তবে এবারের মতো এত ব্যাপক মৃত্যু ও সংক্রমণের নজির আগে দেখা যায়নি।

আক্রান্তের ৮১% ছোট শিশু

জাতিসংঘ বাংলাদেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০ মে পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলায় ৫৭ হাজার ৮৫৬ জন সন্দেহভাজন এবং আট হাজার ৬৭ জন নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৮১ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৯ এপ্রিল থেকে প্রতি সপ্তাহে সংক্রমণ উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং দৈনিক গড় আক্রান্তের সংখ্যা এক হাজার ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। যদিও সাম্প্রতিক টিকাদান কর্মসূচির পর কিছু উপজেলায় সংক্রমণ কমতে শুরু করেছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কক্সবাজার ও ভাসানচরের ক্যাম্পগুলোতে ৫৯৫ জন সন্দেহভাজন এবং ৬০ জন নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছে। সেখানে পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের ৬৩ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এর মধ্যে ২০ শতাংশ শিশুর বয়স ৯ মাসের নিচে, যারা নিয়মিত এমআর টিকার আওতায় ছিল না।

সমকাল

দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘অভিযানে গিয়ে বারবার আক্রান্ত হচ্ছে পুলিশ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে অনেকটা গতি ফিরলেও অভিযানে গিয়ে একের পর এক হামলার শিকার হওয়ায় ঘটছে ছন্দপতন। এমনকি অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ১ মে থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানের মধ্যেও থেমে নেই আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। চলতি মাসে এ পর্যন্ত ঢাকাসহ ৯ জেলায় অন্তত ১৩টি স্থানে হামলা হয়েছে। এতে আহত হন পুলিশ ও র‍্যাবের অন্তত ৩২ সদস্য। এ ছাড়া চলতি বছরের প্রথম চার মাসে আরও ২১৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। পৃথক ঘটনায় সিলেট ও চট্টগ্রামে মারা গেছেন পুলিশ ও র‍্যাবের দুই সদস্য।

এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে সারাদেশে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে পট পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় 'মব' ও হামলার শিকার হয় পুলিশ। এতে পুলিশের মনোবল ভেঙে যায়। আবার অনেক পুলিশ সদস্য মামলা, সংযুক্তি, প্রত্যাহার ও চাকরি হারানোর মতো পরিস্থিতির শিকার হতে পারেন-এমন আতঙ্কে রয়েছেন। তাই পুলিশ এখনও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তাই অপরাধীরা মনে করছে পুলিশ এখনও দুর্বল অবস্থানে আছে; হামলা করলে কিছুই হবে না। এর বিপরীতে তারা নিজেদের শক্তিশালী ভাবছে; তাদের কাছে অবৈধ অস্ত্র আছে।

গতকাল শুক্রবার রাতে অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, অনেকের মধ্যে আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। পুলিশের কোনো সদস্যদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের কিছুটা ঘাটতি আছে। আইন প্রয়োগ করতে গেলেও এক ধরনের ভয় কাজ করছে। কোথাও আবার এর জন্য জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়। অঙ্গিন প্রয়োগ করা নিয়ে তাদের মধ্যে দোদুল্যমানতা দেখা যায়। কোনো অপরাধী মনে করেন, অপকর্মে জড়ালে শক্ত ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে না।

তিনি বলেন, কয়েকটি জায়গায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়া অভিযান চালাতে গিয়ে মামলার শিকার হয়েছে পুফিশ। অভিযানের মধ্যে পুলিশের ওপর হামলার কয়েকটি ঘটনার পর আমরা ফোর্সদের মানাবল শক্ত রাখার বার্তা দিয়েছি। প্রতি জায়গায় শক্ত মামলা নিয়ে কড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। পুলিশ সদস্যদের আমরা সাহস দিচ্ছি। যাতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

সিলেটে এক মাদককারবারির ছুরিকাঘাতে ইমন আচার্য্য নামের র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (ব‍্যাব-৯) একজন সদস্য নিহত হয়েছেন। শুক্রবার দুপুরে নগরের কোতোয়ালি মডেল থানার পাশে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে পালানোর চেষ্টা করালে ইমন ওই মাদক কারবারিকে জাপটে ধরার চেষ্টা করে। ও সময় র‍্যাব সদস্যের বুকের বাম পাশে চাকু দিয়ে আঘাত করা হয়।

এদিকে চট্টগ্রাম নগরের বাকসিয়ায় চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত বৃহস্পতিবার পুলিশকে ছয় ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। বিকেল ৪টার দিকে পুলিশের গাড়ি আটাকে বিক্ষোভ শুরু করে স্থানীয় লোকজন। একপর্যায়ে পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নিতে চান তারা। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি খাওয়া চলে। পুলিশের একটি পিকআপ ভানে আগুন ধরিয়ে দেন স্থানীয়রা। পরে রাত সোয়া ১০টার দিকে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কৌশলে ঘটনাস্থল থেকে হেফাজতে নেয় পুলিশ।

রাজধানীর দনিয়ায় ব্রাইট স্কুল আন্ড কলেজের এক ছাত্রীর আত্মহত্যার জেরে শিক্ষার্থীদের বিয়েনাভের মুখে পুলিশের সামনেই প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মাসুদ হাসান লিটনের ওপর হামলার ঘাটনা ঘটে। গত বৃহস্পতিবার অবরুদ্ধ চেয়ারম্যানকে উদ্ধার করে পুলিশ বের করার চেষ্টা করলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তার ওপর চড়াও হয় এবং গণপিটুনি দেয়।

নয়া দিগন্ত

‘অস্বস্তিকর পরিস্থিতি, চাপা আতঙ্ক’-এটি দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, আট বছরের ফুটফুটে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় দেশ যখন উত্তাল ঠিক তখনই বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে আরেক শিশু ধর্ষণের ঘটনায় নিন্দার ঝড় উঠেছে। দেশে একের পর এক নারী ও শিশু নিপীড়ন-ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড, ডাকাতি-ছিনতাই, চুরি এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাংবাদিকের ওপর হামলায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি ও চাপা আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে সিলেটের সুরমা ক্বিন এলাকায় মাদককারবারিদের ধরতে গিয়ে এক মাদকসেবীর ছুরিকাঘাতে র‌্যাব সদস্য নিহত হয়েছেন।

এ ছাড়া গতকাল ভোরে সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ থানার পুরাতন কালারুকা গ্রামে মায়মুনা জান্নাত তোহা নামে দেড় বছরের কন্যা শিশুকে ঘুমন্ত অবস্থায় হাত-পা বেঁধে গলাকেটে হত্যার অভিযোগ উঠেছে মায়ের বিরুদ্ধে। এ সময় তার আরেক শিশু সন্তানকেও হত্যা করতে গেলে শিশুটি পালিয়ে মসজিদের ভেতর আশ্রয় নিয়ে তার বাবাকে বিষয়টি জানায়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত নারীকে আটক করে পুলিশে দিয়েছেন স্থানীয়রা।

এ দিকে অপরাধীদের ধরতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার সাংবাদিক, তুচ্ছ কারণে রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের ওপর হামলা এবং হত্যার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে। পাশাপাশি নিজের সন্তানকে হত্যার ঘটনাও সাধারণ মানুষের মনকে নাড়া দিচ্ছে।

গতকাল সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাভারে মাদককারবারিদের হামলায় দেশ টিভির রিপোর্টার ও ক্যামেরাম্যান গুরুতর আহত হয়েছেন। মাদককারবারিরা তাদের গাড়ি ভাঙচুর করে। এরআগে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের খবর নিতে গিয়ে হামলার শিকার হন তিন টিভি সাংবাদিক। আহতরা হলেন- চ্যানেল ওয়ানের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান শাহনেওয়াজ রিটন, ক্যামেরাপারসন অমিত দাশ ও স্টার নিউজের ক্যামেরাপারসন জালাল উদ্দিন। তার একদিন আগে বুধবার রাজধানীর মিরপুরের কালশী বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় অবৈধ বস্তি উচ্ছেদের সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনা ঘটে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের উচ্ছেদ অভিযানের খবর সংগ্রহের সময় ফেসবুক লাইভ চলাকালে পুলিশের হামলার শিকার হন দুই সংবাদকর্মী। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ব্যাপক সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ওই বছর ৬২২ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার হন।

পুলিশ সদর দফতরের হিসাব অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত গত চার মাসে সারা দেশে শুধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ১৪২টি। নারী ও শিশুর প্রতি নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৯৫৮টি। এ ছাড়া ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ১৮৪টি। অপহরণের শিকার হয়েছেন ৩৪৭ জন। আর চুরির ঘটনা ঘটেছে ৪ হাজার ৯৯টি। আবার পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন ২১৩ জন পুলিশ সদস্য।

বণিক বার্তা

দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম ‘বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি: মেয়াদ শেষ হচ্ছে ডিসেম্বরে নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে পানি বণ্টনের ভিত্তি নির্ধারণে জটিলতা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে চলতি বছর ডিসেম্বরে।

এরপর দুই দেশের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টনে বিদ্যমান চুক্তিটিই নবায়ন হবে নাকি নতুন করে চুক্তি হবে—এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের কারিগরি দল এ বিষয়ে প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজ শুরু করেছে। বেশকিছু বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে বলেও জানা গেছে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্যের মূল বিষয় হলো পানিপ্রবাহের ভিত্তি। ভারতীয় পক্ষ চাইছে ফারাক্কা পয়েন্টে পানিপ্রবাহের ভিত্তিতে চুক্তির ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড় করাতে, অন্যদিকে বাংলাদেশের দাবি পুরো নদীর প্রবাহকে বিবেচনায় নিয়ে পানি ভাগাভাগি করা। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে সরকারের (বাংলাদেশের) একটি অগ্রাধিকার হলো ১৯৭৭ সালের সমঝোতা স্মারকের আলোকে চুক্তি সংশোধন করা।’

দেশের নদী গবেষকরা বলছেন, পানির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে প্রবাহের ভিত্তি ফারাক্কা পয়েন্ট নয়, বরং সমগ্র নদীর প্রবাহকেই বিবেচনায় নিতে হবে। এক্ষেত্রে শুধু বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পরিবর্তে সমগ্র গঙ্গা বেসিনকে বিবেচনা করে বাংলাদেশ-ভারত-নেপালের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমান চুক্তিতে ফারাক্কায় প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে পানি বণ্টন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সমস্যাটি হচ্ছে ফারাক্কা পয়েন্টের আগে গঙ্গার উজানে প্রায় ৯৭৫টি বাঁধ রয়েছে এবং এসব বাঁধে পানি প্রত্যাহারের পর ফারাক্কা পয়েন্টে অবশিষ্ট পানি পৌঁছে। ফলে এখানে ন্যায্যতার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। এমনকি ভারতের ফারাক্কার অংশের অধিবাসীদেরও অভিযোগ আছে যে উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে তারা ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না। এ সমস্যার একটি সমাধান হতে পারে সমগ্র গঙ্গা বেসিনকে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট সব দেশের মধ্যে পানির ন্যায্য বণ্টনে উদ্যোগ নেয়া। সেক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পরিবর্তে নেপালকে অন্তর্ভুক্ত করে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হতে পারে। সমগ্র নদী অববাহিকাকে কেন্দ্র করে বিশ্বে অনেকগুলো সফল চুক্তির উদাহরণ রয়েছে।’

ফারাক্কা বাঁধের অবস্থান বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ১৮ কিলোমিটার উজানে পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলায়। ফারাক্কা ব্যারাজ নিয়ে এ ভূখণ্ডে অসন্তোষের ইতিহাস প্রায় ৭৫ বছরের। ১৯৫১ সালে ভারত যখন গঙ্গা নদীতে ব্যারাজটি নির্মাণের পরিকল্পনা করে, তখনই এ নিয়ে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে অসন্তোষ তৈরি হয়। স্বাধীনতার পর গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি মিলিয়ে মোট পাঁচটি চুক্তি হয়েছে। ১৯৭৩ সালে ভারতের সঙ্গে গঙ্গা নিয়ে প্রথম গোলটেবিল বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় দুই দেশে পানি বণ্টন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছার পরই ফারাক্কা চালু হবে। ১৯৭৫ সালে প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে ভারতকে ২ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৪০ দিনের জন্য পানি প্রত্যাহারের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার আগেই ভারত ব্যারাজটি পুরোপুরি চালু করে দেয়। এবং ৪০ দিনের সম্মতি শেষ হওয়ার পরও গঙ্গা থেকে পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রাখে। এমনকি পানি প্রত্যাহারের পরিমাণও আগের তুলনায় বাড়ানো হয়।

১৯৭৬ সালের মে মাসে পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চ করেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তার আহ্বান সারা দেশে আলোড়ন তৈরি করে এবং ৯৬ বছর বয়সে তিনি ওই লংমার্চের নেতৃত্ব দেন। এর পরই বিষয়টি আবারো গুরুত্ব পেতে শুরু করে। জিয়াউর রহমান জাতিসংঘের ৩১তম অধিবেশনে ফারাক্কার বিষয়টি উত্থাপন করেন। জাতিসংঘ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পরামর্শ দেয়। ১৯৭৭ সালে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে পাঁচ বছরের চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ওই চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল গ্যারান্টি ক্লজ—যার মাধ্যমে পানির নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল। গ্যারান্টি ক্লজ অনুযায়ী বাংলাদেশকে শুষ্ক মৌসুমে আগের প্রবাহ বিবেচনায় অন্তত ৮০ শতাংশ পানির নিশ্চয়তা দেয়া হয়।

১৯৮২ সালে পাঁচ বছরের এ চুক্তির মেয়াদ যখন শেষ হয় তখন ক্ষমতায় ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি ওই বছরই ভারত সফরে গিয়ে পানি বণ্টনে দুই বছরের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন। তবে এতে গ্যারান্টি ক্লজটি বাদ দেয়া হয়। ১৯৮৫ সালের ২২ নভেম্বর তিন বছরের জন্য আরেকটি সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়। এর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন কোনো চুক্তি না হওয়ায় ভারত গঙ্গা থেকে পানি প্রত্যাহারের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দেয়।

আজকের পত্রিকা

‘নারী ও শিশু নির্যাতন: মামলায় সাজা কম, খালাসের হার বেশি’-এটি দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম। প্রতিবেদনে বলা হয়, সিলেটে ৬ মে চার বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা, ১৪ মে ঠাকুরগাঁওয়ে চার বছর বয়সী আরেক শিশু ধর্ষণের পর খুন, ১৬ মে মুন্সিগঞ্জে ১০ বছরের মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা, ১৯ মে পাবনায় পঞ্চম শ্রেণির এক শিশুকে ধর্ষণ। একই দিন (১৯ মে) রাজধানী ঢাকার পল্লবীতে আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা মানুষকে নাড়া দিয়েছে।

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য বলছে, দেশে গত এক দশকে অন্তত ৫ হাজার ৫৯৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে অন্তত ২৭৪ শিশু। তবে এগুলোর অধিকাংশ মামলার বিচার দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে। অনেক মামলায় আসামিরা খালাসও পেয়েছে। এক বছর আগে সারা দেশে আলোড়ন তোলা মাগুরার শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায় হয়েছে। তবে উচ্চ আদালতে আপিল শুনানির অপেক্ষায়।

এক গবেষণার তথ্য বলছে, নারী ও শিশু নির্যাতন-সংক্রান্ত মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়ে যায়।

মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের বেপরোয়া করে তুলেছে। দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অপরাধ অনেকাংশে কমে আসতে পারত।

পল্লবীর আট বছরের শিশুর ওপর নৃশংসতা মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। এ ঘটনার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানুষ সোচ্চার হয়েছে। এর মধ্যেই চট্টগ্রামে গত বৃহস্পতিবার ও গতকাল শুক্রবার দুই শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবারের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ মানুষ অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। চলতি মাসে পল্লবীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার শিকার হওয়া শিশুদের বয়স ৪-১০ বছরের মধ্যে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি ভুক্তভোগীর পূর্বপরিচিত বা প্রতিবেশী।

গণমাধ্যমে যেসব ঘটনা এসেছে, তাতে দেখা গেছে, ১৪ মে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে নিখোঁজের এক দিন পর চার বছর বয়সী এক মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার নবম শ্রেণির এক ছাত্র জিজ্ঞাসাবাদে তাকে ধর্ষণের পর হত্যার কথা স্বীকার করেছে। এর দুদিন পর মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ ওঠে। ১৯ মে পাবনার চাটমোহরে টাকার প্রলোভন দেখিয়ে পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে বলেছে, ৬ মে সিলেটের জালালাবাদে চার বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।

চট্টগ্রাম মহানগরের পৃথক দুটি স্থানে বৃহস্পতিবার ও গতকাল দুটি শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে। এর আগে মার্চে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার পর গলা কেটে হত্যাচেষ্টার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি মারা যায়।

মানবাধিকার সংগঠন ও আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য থেকে জানা যায়, দেশে গত এক দশকে অন্তত ৫ হাজার ৫৯৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ২৭৪ শিশুকে। এসব ঘটনায় করা অধিকাংশ মামলার এখনো বিচার শেষ হয়নি। আর যেসব মামলার বিচার শেষ হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে আসামিরা খালাস পেয়েছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ১ হাজার ২৮ জন নারী ও মেয়েশিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মেয়েশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ৪৭৯টি ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৭৬ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে আরও ১৫৩ শিশু।

দেশ রূপান্তর

দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘আইনের বেড়াজালে বিচার’। খবরে বলা হয়, গোটা জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল মাগুরায় আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। ২০২৫ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহের এ ঘটনার দুই মাস ১২ দিন পর শুরু হয় বিচার এবং মাত্র ২১ দিনে (১৩ কার্যদিবস) শুনানি নিয়ে আলোচিত এ মামলায় রায় দেয় আদালত। ওই বছরের ১৭ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল প্রধান আসামি আছিয়ার বড় বোনের শ্বশুর হিটু শেখকে প্রাণদন্ডাদেশ দেয়। মৃত্যুদন্ডাদেশ নিশ্চিতে রায়ের চার দিনের মাথায় হিটু শেখের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদনের নথি) পাঠানো হয় হাইকোর্টে। তবে, এক বছর পার হলেও এ মামলার শুনানি এখনো শুরু হয়নি।

দেশের ফৌজদারি মামলার ইতিহাসে আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি ছিল দ্বিতীয় দ্রুততম রায়। ২০২০ সালে ৩ অক্টোবর বাগেরহাটের মংলায় ৭ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ মামলায় ৫৩ বছর বয়সী আব্দুল মান্নান সরকারকে আসামি করা হয়। অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশের পর মাত্র সাত কার্যদিবস শুনানি শেষে একই মাসের ১৯ অক্টোবর মান্নানকে যাবজ্জীবন সাজার রায় দেয় বাগেরহাটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।

ধর্ষণের মতো ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এ দুটি ঘটনা ব্যতিক্রম। বাস্তবতা হলো, শিশুহত্যা, শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় চূড়ান্ত বিচার প্রক্রিয়া যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। ঘটনার পর মামলা, অভিযোগপত্র, অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু, সাক্ষ্য গ্রহণ, আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন, যুক্তিতর্কের শুনানি অধস্তন আদালতে এ কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে মামলার রায় হয়। এর মধ্যে কোনো কোনো মামলায় সাক্ষীর গড়হাজিরা কিংবা সময়ের আবেদনে শুনানি হয় ধীরগতিতে। যা চলে বছরের পর বছর। রায়ে কোনো আসামির সাজা হলে অবধারিতভাবে হাইকোর্টে আপিল কিংবা জেল আপিল হয়। হাইকোর্টের রায়ের পর আপিল বিভাগে আপিল হয়। আইন ও আদালতের এই প্রতিটি স্তরে পার হয় বছরের পর বছর। আর লাখ লাখ মামলার জট তো আছেই। মামলা পড়ে এক ধরনের বেড়াজালে। সংগত কারণে হত্যা ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের বেশিরভাগ মামলায় আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করা যায় না বলে বিভিন্ন গবেষণা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসছে।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারার বিধান অনুযায়ী, অধস্তন আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদ-ের রায় হলে তা কার্যকরে উচ্চ আদালতের অনুমোদন ও শুনানি হতে হয়। এ জন্য অধস্তন আদালতের রায়ের অনুলিপি ও মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হলে এটি ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদ- অনুমোদন) হিসেবে নথিভুক্ত এবং শুনানির জন্য পেপারবুক (মামলার রায়সহ যাবতীয় নথি) প্রস্তুত হয়। পাশাপাশি কারাগারে থাকা আসামি হাইকোর্টে আপিল কিংবা জেল আপিলের সুযোগ পান। গত এক দশকের পরিসংখ্যান বলছে, ফাঁসির মামলা হাইকোর্টের কার্যতালিকায় আসতে কমপক্ষে পাঁচ বছর লাগে। তবে, আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলার ক্ষেত্রে অনেক সময় অগ্রাধিকারভিত্তিতে পেপারবুক তৈরি ও শুনানি হয়। আছিয়া হত্যা মামলাসহ একাধিক শিশুহত্যা মামলার বিষয়ে সবশেষ পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) ২০২৫ সালে ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ মাসে নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতন সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই সময়ে ৩ হাজার ১১ নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৪৩ নারী ও শিশু। এদের ৫৫০ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। অর্র্থাৎ তারা শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৭ ভুক্তভোগীকে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন

‘স্বপ্নের ঘরে দুঃস্বপ্নের জীবন’-এটি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, নিজের কোনো ভিটেমাটি নেই। তবু সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটি ঘরও জোটেনি ভ্রাম্যমাণ সবজি বিক্রেতা নুরুন্নবীর। বগুড়া সদরের শেখেরকোলা নয়াপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে তিনি এখন থাকছেন অন্যের বরাদ্দ পাওয়া ঘরে। যে ঘরের প্রকৃত মালিক শহিদুলের নিজস্ব বাড়ি রয়েছে অন্যত্র। তাই নুরুন্নবীকে থাকতে দিয়ে নিজের বাড়িতেই বসবাস করছেন তিনি। একই প্রকল্পে আরও কয়েকটি ঘর দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। অথচ প্রকৃত ভূমিহীনরা ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে। দেশের গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম বড় উদ্যোগ ছিল আশ্রয়ণ প্রকল্প। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, অনেক জায়গায় সেই প্রকল্প এখন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দখলবাণিজ্যের চিত্রে পরিণত হয়েছে। কোথাও বরাদ্দ পাওয়া লোকজন থাকছেন না, কোথাও ঘর বিক্রি বা ভাড়া দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও নির্মাণ ত্রুটি ও পরিবেশগত সমস্যায় ঘরগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। চুরি হয়ে গেছে নলকূপসহ প্রয়োজনীয় নানা উপকরণ। ফলে হাজার হাজার সরকারি ঘর খালি পড়ে থাকছে বছরের পর বছর।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের স্বপ্নের ঘরে দুঃস্বপ্নের জীবনের করুণ চিত্র। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বাসুদেবপুর এলাকায় তিনটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৫৭টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হলেও অধিকাংশ ঘরেই এখন তালা ঝুলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে এমন লোকদের ঘর দেওয়া হয়েছে যাদের নিজস্ব বাড়ি রয়েছে। ফলে তারা সরকারি ঘরে না থেকে আত্মীয়স্বজনকে থাকতে দিচ্ছেন অথবা ঘর ফাঁকা রেখেছেন। মরিয়ম নামে এক নারী জানান, তার নামে কোনো বরাদ্দ নেই। স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির সহায়তায় তিনি পাঁচ বছর ধরে একটি খালি ঘরে থাকছেন। তিনি বলেন, ‘আসল মালিককে কোনোদিন দেখিনি।’ নওগাঁর রাণীনগরের মালিপুকুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে দেখা গেছে আরও ভয়াবহ চিত্র। গৃহহীনদের জন্য দেওয়া সরকারি ঘর সেখানে প্রকাশ্যে কেনাবেচা হচ্ছে। ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় একাধিক ঘর হাতবদলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ঘর একাধিকবার বিক্রিও হয়েছে। সরকারি ঘর কিনে সেখানে বিলাসবহুল সাজসজ্জা করে বসবাস করছেন কেউ কেউ।

স্থানীয়দের দাবি, ৩২টি ঘরের মধ্যে অন্তত ১২টি ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। নড়াইলের কালিয়া উপজেলার আটঘরিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধিকাংশ ঘর এখন বসবাসের অনুপযোগী। জরাজীর্ণ বেড়া, নষ্ট ছাউনি, জলাবদ্ধতা ও নিরাপত্তাহীনতায় বাসিন্দারা ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। ১৮টি ঘরের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৫টিতে মানুষ বসবাস করছে। বাসিন্দা আসলাম শেখ সুদে টাকা এনে নিজের ঘর সংস্কার করে কোনোভাবে টিকে আছেন। অন্যদিকে প্রকল্পের একাধিক ঘর সচ্ছল পরিবারের দখলে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ঘর আবার ভাড়াও দেওয়া হয়েছে।

বরিশালের চরবাড়িয়া ও চরআবদানী এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলোতেও একই চিত্র। ৬০টি ঘরের মধ্যে প্রায় অর্ধেক খালি। বর্ষায় চার-পাঁচ ফুট পানিতে তলিয়ে যায় পুরো এলাকা। নীরু বেগম নামে এক বাসিন্দা বলেন, ‘এখানে থাকতে হলে আলাদা করে টাকা খরচ করে ঘর ঠিক করতে হয়।’ অথচ একই প্রকল্পে টিনের ঘর ভেঙে পাকা ভবন নির্মাণ করেছেন কয়েকজন সচ্ছল ব্যক্তি। অভিযোগ রয়েছে, জেলা প্রশাসনের গাড়িচালকসহ প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যরাও ঘর পেয়েছেন।

টাইমস অব বাংলাদেশ

দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হতে চান হাসিনা। এটি টাইমস অব বাংলাদেশের শিরোনাম। এতে বলা হয়,
মৃত‍্যুদণ্ডের আদেশ মাথায় নিয়ে দেশে ফিরতে চান ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হতে চান তিনি। সম্প্রতি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে অংশগ্রহকারী এবং তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এমন একাধিক নেতা টাইমস অব বাংলাদেশকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। দলীয় প্রধানের দেশে ফেরা উপলক্ষে নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি গ্রহণের জন্যেও বলা হয়েছে বলে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন।
আওয়ামী লীগ নেতারা শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে যাই বলছেন না কেন, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে স্ট‍্যান্টবাজি হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করছেন, এটি দলের কর্মীদের চাঙ্গা রাখার কৌশল মাত্র। আসলে তিনি বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশে ফিরবেন না।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী ও গণহত্যা মামলায় ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ফাঁসির রায় দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘শেখ হাসিনা দেশে দ্রুত সময়ে ফিরতে চান। সেজন্য যেসব প্রক্রিয়া গ্রহণ করা দরকার, তা আমরা করছি। তিনি যেভাবে ভারতে গিয়েছেন সেভাবেই বীরদর্পে দেশে ফিরবেন।’ এ ধরনের বক্তব্যের আসলে বাস্তবতা আছে, নাকি কর্মীদের চাঙা করার কৌশল এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একটু অপেক্ষা করুন। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা উপলক্ষ্যে বিপুল জনসমাগম করতে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে দলের অসহায় নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াতেই দেশে ফিরবেন শেখ হাসিনা।’

সম্প্রতি শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ইউরোপ আওয়ামী লীগের এক নেতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমসকে তিনি বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হতে চান। তার এই মনোভাবের কথা ভারত সরকারকে জানানো হয়েছে। এমনকি তিনি আগামী ১৫ আগস্টের আগেই দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছে ট্রাভেল পাসও চাইতে পারেন।’

সম্প্রতি দলের নেতাদের সঙ্গে টেলিগ্রামের একটি গ্রুপ কলে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘তার এখন যে বয়স, তাতে আর সর্বোচ্চ কয়েক বছর বাঁচতে পারেন। দেশে এসে গণতন্ত্রের জন্য যদি তাকে ফাঁসির মঞ্চেও যেতে হয়, তাতেও তার কোনো কষ্ট থাকবে না’, বলেন ইউরোপ আওয়ামী লীগের ওই নেতা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকেই আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। বহু নেতা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের ২৭ অক্টোবর নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করে। পরে চলতি বছরের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করলে আরও চাপে পড়ে আওয়ামী লীগ।

তৃণমূল নেতাকর্মীদের বড় অংশ এখন মামলা, গ্রেপ্তার আতঙ্ক ও আর্থিক সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এমন প্রেক্ষাপটে আসলেই শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বক্তব্য কী শুধু বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ নাকি দলটির এ বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা রয়েছে, তা জানার চেষ্টা করেছে টাইমস।

দলটির কয়েক ধাপের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করলেও সেখানে তিনি নিয়মিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন।

শেখ হাসিনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ভারত সরকার তার সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের বৈঠক করারও সুযোগ করে দিচ্ছে। সেখানে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য নির্দেশ দিচ্ছেন। দলীয় প্রধানের এমন দৃঢ় মনোভাবের পর দলের মাঠের নেতাকর্মীদের প্রস্তুত করতে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি সারা দেশে এখন নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলছেন।

আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছেন, শেখ হাসিনা যেদিন দেশ ছেড়েছিলেন নিরাপত্তার শঙ্কায় তাকে ভারতে পাঠানো হয়েছিল। এখন দেশে একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে। তাই এখন দেশে ফিরলে তার জীবনের নিরাপত্তার শঙ্কা নেই। তিনি আইন-আদালত ফেস করতে পারবেন। এ ছাড়া, বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারলে আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক করা সম্ভব বলেও মনে করছে দলটি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন