ইবোলা প্রাদুর্ভাব কতটা উদ্বেগজনক?

ইবোলা প্রাদুর্ভাব কতটা উদ্বেগজনক?

ফন্ট সাইজ:

গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোতে ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। কঙ্গো এবং উগান্ডায় এই সংক্রমণে কমপক্ষে ৮০ জনের মৃত্যুর পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিষয়ক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। এই ভাইরাস নিয়ে এত উদ্বেগের কারণ হলো এর সরাসরি কোনো চিকিৎসা নেই। তবে সম্পূরক চিকিৎসা দিয়ে রোগীকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়। ফলে এ ভাইরাস সংক্রমণে মৃত্যুর হার অনেক বেশি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। 

কয়েক সপ্তাহ ধরে শনাক্ত হওয়ার আগেই এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের এমন একটি অঞ্চলে, যেখানে গৃহযুদ্ধের কারণে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি সমস্যা। তা হলো এবার যে ধরনের ইবোলা ছড়াচ্ছে, তা বিরল। ফলে এই ভাইরাস ঠেকানোর জন্য কার্যকর সরঞ্জাম ও চিকিৎসা তুলনামূলক কম। এই ভাইরাসে আক্রান্তদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মারা যান।

এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি ভাইরাসটি কত দূর পর্যন্ত ছড়িয়েছে। তবে ইতিমধ্যে প্রায় ২৫০টি সন্দেহভাজন সংক্রমণ এবং ৮০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বেশিরভাগ ইবোলা প্রাদুর্ভাব সাধারণত সীমিত আকারের হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মনে এখনো আতঙ্ক জাগায় সেই ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের স্মৃতি। তখন পশ্চিম আফ্রিকায় ২৮ হাজার ৬০০ মানুষ আক্রান্ত হন। যা ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ইবোলা প্রাদুর্ভাব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এ বিষয়ে এবার আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বিষয়ক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলেও এর অর্থ এই নয় যে বিশ্ব এখন কোভিড-ধরনের কোনো মহামারির প্রাথমিক পর্যায়ে। বিশ্বব্যাপী ইবোলার ঝুঁকি এখনো খুবই কম। এমনকি ২০১৪-১৬ সালের প্রাদুর্ভাবেও বৃটেনে মাত্র তিনজন আক্রান্ত হন। তাদের সবাই ছিলেন স্বাস্থ্যকর্মী। 

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যান্ডেমিক সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের ড. আমান্ডা রোজেক বলেন, তবে এটি দেখিয়ে দেয় যে পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে এর জন্য আন্তর্জাতিক সমন্বয় প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ উগান্ডা, দক্ষিণ সুদান ও রুয়ান্ডার জন্য এখনো বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। কারণ এসব দেশের সঙ্গে কঙ্গোর ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য ও যাতায়াত সম্পর্ক আছে। উগান্ডায় ইতিমধ্যে দু’জনের শরীরে ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে একজন মারা গেছেন।

ইবোলা একটি মারাত্মক ও প্রাণঘাতী রোগ, যদিও এটি বিরল। ইবোলা ভাইরাস সাধারণত প্রাণীদের মধ্যে সংক্রমিত হয়, বিশেষ করে ফলখেকো বাদুড়ে। তবে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে সংক্রমিত প্রাণির সংস্পর্শে এলে। এবারের প্রাদুর্ভাব ঘটছে বান্ডিবুগিও প্রজাতির ইবোলা ভাইরাসের কারণে। এটি ইবোলার তিনটি পরিচিত প্রজাতির একটি। তবে তুলনামূলকভাবে এটি কম পরিচিত।

এর আগে মাত্র দু’বার ২০০৭ ও ২০১২ সালে বান্ডিবুগিও প্রজাতির প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল। তখন আক্রান্তদের প্রায় ৩০ শতাংশ মারা যান। বান্ডিবুগিও ভাইরাস মোকাবিলায় বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অন্যান্য ইবোলা প্রজাতির জন্য কিছু অনুমোদিত টিকা ও ওষুধ থাকলেও বান্ডিবুগিওর জন্য এখনো কোনো অনুমোদিত ভ্যাকসিন বা ওষুধ নেই। তবে কিছু পরীক্ষামূলক চিকিৎসা আছে। এ ছাড়া এই ভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষাগুলোও ভালোভাবে কাজ করছে না বলে মনে হচ্ছে। প্রাদুর্ভাবের শুরুতে পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এসেছিল। পরে উন্নত পরীক্ষাগার প্রযুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি বান্ডিবুগিও প্রজাতির ইবোলা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ট্রুডি ল্যাং বলেন, বান্ডিবুগিও মোকাবিলা করাই এই প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি। ধারণা করা হয়, সংক্রমণের দুই থেকে ২১ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

প্রথমদিকে উপসর্গগুলো অনেকটা ফ্লুর মতো। জ্বর, মাথাব্যথা ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। কিন্তু পরে রোগটি গুরুতর আকার ধারণ করে। শুরু হয় বমি ও ডায়রিয়া, শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হতে থাকে। কিছু রোগীর শরীরের ভেতরে ও বাইরে রক্তক্ষরণও হয়। বান্ডিবুগিও ভাইরাসের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অনুমোদিত ওষুধ না থাকায় চিকিৎসা মূলত ‘উন্নত সহায়ক সেবা’র ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, অন্যান্য সংক্রমণের চিকিৎসা, শরীরে তরল ও পুষ্টি সরবরাহ। দ্রুত চিকিৎসা পেলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে।

ইবোলা সংক্রমিত ব্যক্তির শরীরের তরল, যেমন রক্ত বা বমির মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায়। তবে সাধারণত উপসর্গ দেখা দেয়ার আগে এটি সংক্রমিত হয় না। প্রথম শনাক্ত রোগী ছিলেন একজন নার্স। তার মধ্যে ২৪শে এপ্রিল উপসর্গ দেখা দেয়। এরপর প্রাদুর্ভাব নিশ্চিত হতে তিন সপ্তাহ সময় লেগেছে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের ড. অ্যান কোরি বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে সংক্রমণ চলছিল, অথচ প্রাদুর্ভাবটি অনেক দেরিতে শনাক্ত হয়েছে, যা উদ্বেগজনক। এর অর্থ হলো, স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে যে অবস্থানে থাকতে চেয়েছিলেন, তার চেয়ে পিছিয়ে আছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এটি বর্তমানে শনাক্ত ও রিপোর্ট হওয়া সংখ্যার চেয়ে অনেক বড় প্রাদুর্ভাবের ইঙ্গিত দিতে পারে। এক্ষেত্রে প্রধান কৌশল হবে দ্রুত শনাক্ত করা কোন ব্যক্তি আক্রান্ত এবং তিনি কাদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়েছেন। এ ছাড়া হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে সংক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা চালাতে হবে। কারণ রোগীরা তখন সবচেয়ে বেশি সংক্রামক অবস্থায় থাকেন। একই সঙ্গে মৃত ব্যক্তিদের নিরাপদে দাফনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ মৃত্যুর পরও তাদের দেহ সংক্রামক থাকতে পারে।

এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ ইতিমধ্যেই বহু মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। তার ওপর প্রাদুর্ভাবটি ঘটছে কঙ্গোর সংঘাতপীড়িত অঞ্চলে, যেখানে আড়াই লাখের বেশি মানুষ ঘরছাড়া। ট্রুডি ল্যাং বলেন, আক্রান্ত অনেক এলাকা খনি-শহর। সেখানে মানুষের চলাচল অত্যন্ত বেশি ও অস্থায়ী। এই চলাচল মানুষকে এক সম্প্রদায় থেকে আরেকটিতে এবং সীমান্ত পেরিয়ে নিয়ে যাওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।

তবে কঙ্গোর ইবোলা মোকাবিলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের ড. ড্যানিয়েলা মান্নো বলেন, আজকের প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা এক দশক আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। এই প্রাদুর্ভাব দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে, নাকি এক দশক আগের ভয়াবহ পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে, তা নির্ভর করছে এখনকার পদক্ষেপগুলোর ওপর।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন