কোরবানির ঈদের আগে দেশের ব্যাংকগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ভিড় নতুন কোনো চিত্র নয়। কিন্তু এবারের চিত্রটি ভিন্ন, সেই ভিড়ের মানুষগুলো টাকা তুলতে আসেননি কেবল উৎসবের আনন্দে, এসেছেন বেঁচে থাকার প্রয়োজনে। চিকিৎসার খরচ, দৈনন্দিন সংসার, পশু কেনার সামান্য পুঁজি এই ন্যূনতম চাহিদাটুকুও পূরণ করতে পারছে না দেশের একাধিক ব্যাংক। টাকশালে কাগজ আর কালির সংকট, বাজারে ছেঁড়া-ফাটা নোটের ছড়াছড়ি, আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ধারণাতীত নির্ভরশীলতা এই সব মিলিয়ে যে ছবিটি দাঁড়িয়েছে, তা কেবল একটি মৌসুমী সংকটের নয়, এটি একটি দীর্ঘ অবহেলার ক্ষতচিহ্ন।
প্রশ্ন হলো, এই সংকট কি হঠাৎ এসেছে? মোটেই না। বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক প্রভাবে অনুমোদিত ঋণ, দুর্বল সুশাসন, খেলাপি ঋণের পাহাড় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখ বন্ধ রাখার সংস্কৃতি এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের এই বিপর্যয়। গ্লোবাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি, আইসিবি, ইউনিয়ন, এক্সিম, পদ্মা ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের নাম এখন তারল্য সংকটের তালিকায় উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু এই নামগুলো শুধু ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের পরিচয় নয়, এগুলো একটি ব্যর্থ ব্যবস্থার দর্পণ।
তারল্য সংকটের মূল কথাটি সহজ ব্যাংকের কাছে কাগজে সম্পদ আছে, কিন্তু হাতে নগদ নেই। বিনিয়োগ আছে, কিন্তু তা দ্রুত নগদে রূপান্তরযোগ্য নয়। এই ফাঁকটুকুই একটি ব্যাংককে অকার্যকর করে দেয়। বাংলাদেশে এই ফাঁকটি তৈরি হয়েছে কারণ ঋণের অর্থ ফেরত আসছে না, নতুন আমানত আসছে না, আর সরকার নিজেই ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়িয়েছে। ফলে একটি ব্যাংক যেন তিনদিক থেকে চাপে পিষ্ট হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো, বিশেষত সুইজারল্যান্ডের মতো দেশ, এই ধরনের সংকট মোকাবেলায় কী করে? সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) কখনোই সংকটকে হঠাৎ আসতে দেয় না। তারা আগে থেকেই ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করে পর্যাপ্ত তারল্য বাফার রাখতে, অর্থাৎ এমন একটি সঞ্চয় যা দুর্দিনে কাজে আসে। ক্রেডিট সুইসের পতনের পর সুইজারল্যান্ড তাৎক্ষণিকভাবে ইউবিএসের মাধ্যমে একটি সংকট ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করেছে এবং পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য আরও কঠোর মূলধন সংরক্ষণের বিধান প্রণয়ন করেছে। এর মূল শিক্ষাটি হলো সংকট এলে দমন নয়, আগেই প্রতিরোধ।
আমেরিকায় ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর ডড-ফ্র্যাংক আইনের মাধ্যমে ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণকে আমূল ঢেলে সাজানো হয়েছিল। ব্যাংকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা ‘স্ট্রেস টেস্ট’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে সংকটের আগেই জানা যায় কোন ব্যাংক কতটুকু চাপ সামলাতে পারবে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকও একই পথে হেঁটেছে দুর্বল ব্যাংককে শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করে দিয়েছে, প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় মূলধন সহায়তা দিয়েছে, কিন্তু সবসময় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার শর্তে।
ভারতের অভিজ্ঞতাও প্রাসঙ্গিক। ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ভারতের বেশ কয়েকটি সরকারি ব্যাংক তীব্র খেলাপি ঋণের সংকটে পড়েছিল। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক সেখানে ‘প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন’ বা পিসিএ কাঠামো চালু করে দুর্বল ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ সীমিত করে দিয়েছিল, পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এনেছিল এবং পুনর্গঠনের পথ দেখিয়েছিল। ফলে কয়েক বছরের মধ্যে ভারতীয় ব্যাংকিং খাত অনেকটাই স্থিতিশীলতায় ফিরে এসেছে।
বাংলাদেশের জন্য এই তুলনামূলক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়ার সুযোগ এখনো আছে। তবে সেই শিক্ষাকে কার্যকর করতে হলে কেবল বক্তৃতায় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়, দরকার একটি সুনির্দিষ্ট, সাহসী এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কর্মপরিকল্পনা।
প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি প্রকৃত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্ষদ পর্যন্ত প্রতিটি নিয়োগ যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়, তাহলে নিয়ন্ত্রণ কখনো কার্যকর হয় না। সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য বা জার্মানিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা কেবল আইনি নয়, সাংস্কৃতিকভাবেও প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশেও এই সংস্কৃতি গড়তে হবে।
দ্বিতীয়ত, খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর আইনি কাঠামো অপরিহার্য। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে মামলা করলেই যদি তা বছরের পর বছর আদালতে ঝুলতে থাকে, তাহলে ব্যাংক কখনো সুস্থ হবে না। ভারতের ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপ্টসি কোড বা আইবিসি-এর মতো একটি দ্রুত ও কার্যকর দেউলিয়া আইন বাংলাদেশেও প্রয়োজন, যেখানে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ঋণ নিষ্পত্তি বাধ্যতামূলক।
তৃতীয়ত, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে অনির্দিষ্টকাল বাঁচিয়ে রাখার নীতি পরিহার করতে হবে। একটি মৃতপ্রায় ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ দিয়ে টিকিয়ে রাখা মানে জনগণের করের টাকায় ব্যর্থতাকে ভর্তুকি দেওয়া। বরং দুর্বল ব্যাংককে শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা অথবা প্রয়োজনে তার লাইসেন্স বাতিল করে আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এটিই দীর্ঘমেয়াদী সমাধান।
চতুর্থত, আমানত বীমা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে আমানত বীমার সুরক্ষাসীমা অত্যন্ত কম এবং কার্যকারিতাও সীমিত। আমেরিকার এফডিআইসি বা ইউরোপের আমানত গ্যারান্টি স্কিমের মতো একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য আমানত বীমা কাঠামো থাকলে ব্যাংক সংকটের সময় গ্রাহকের আতঙ্ক অনেকটাই কমে যায়। ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেয়ার ঢল যাকে ‘ব্যাংক রান’ বলে তখন আর এতটা তীব্র হয় না।
পঞ্চমত, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এই সংকটের একটি তাৎক্ষণিক উপশম হতে পারে। যত বেশি লেনদেন নগদমুক্ত হবে, তত কম নগদের প্রয়োজন পড়বে। কেনিয়া থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়া অনেক উন্নয়নশীল দেশই মোবাইল ব্যাংকিংকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হাতিয়ার বানিয়েছে। বাংলাদেশের বিকাশ-নগদের অবকাঠামো আছে, দরকার শুধু নীতিগত সদিচ্ছা এবং নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা।
ষষ্ঠত, সরকারের ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সরকার যখন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, তখন বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য ঋণ কমে যায় অর্থনীতিতে। এটিকে ‘ক্রাউডিং আউট’ বলে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি কখনো স্বাভাবিক হবে না।
এখন যে প্রশ্নটি সবচেয়ে জরুরি, তা হলো এই উপলব্ধিগুলো কি শুধু কলামের পাতায় থাকবে, নাকি নীতিনির্ধারকদের টেবিলে পৌঁছাবে? সরকারের আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংস্কার হবে। এই প্রতিশ্রুতি আশার আলো জ্বালায়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছে, অনেক আলো দেখেছে যা শেষ পর্যন্ত নিভে গেছে ক্ষমতার বাতাসে।
তারল্য সংকট কেবল ব্যাংকের সমস্যা নয়। এটি সেই মানুষটির সমস্যা, যিনি হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছেন ব্যাংক থেকে টাকা বের করতে পারলে চিকিৎসা হবে। এটি সেই কৃষকের সমস্যা, যিনি ঈদের আগে পশু কিনতে পারছেন না। এটি সেই ছোট ব্যবসায়ীর সমস্যা, যার কাছে ব্যাংকে টাকা আছে কিন্তু পাচ্ছেন না। একটি রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থা যখন সাধারণ মানুষের এই ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ হয়, তখন বুঝতে হবে সংকটটি কেবল অর্থনৈতিক নয় এটি নৈতিকও।
ভাঙা কলস দিয়ে জল বহন করা যায় না। বাংলাদেশের ব্যাংকিং কাঠামোকে আগে মেরামত করতে হবে সৎ হাতে, স্বচ্ছ নীতিতে এবং রাজনৈতিক সাহসের সঙ্গে। তা না হলে প্রতিটি ঈদের আগে এই একই দৃশ্য ফিরে আসবে, আর মানুষ শুধু অপেক্ষা করবে ব্যাংকের দরজার সামনে, নিজের টাকার জন্য।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি। ই-মেইল: [email protected]
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট ও উত্তরণের পথ
সহিদুল আলম স্বপন
অনলাইন
২৫ দিন আগে
১৫ মে (শুক্রবার), ২০২৬, ১ঃ২৪ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
