ট্রাম্প-শি জিনপিং ‘হাইভোল্টেজ’ বৈঠক

ট্রাম্প-শি জিনপিং ‘হাইভোল্টেজ’ বৈঠক

ফন্ট সাইজ:

চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে বৃহস্পতিবার ‘হাইভোল্টেজ’ বৈঠকে মিলিত হয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ইরান, বাণিজ্য ও তাইওয়ানসহ নানা স্পর্শকাতর ইস্যুতে এই শীর্ষ বৈঠক হচ্ছে। স্থানীয় সময় সকাল ১০টার কিছু পরে বেইজিংয়ের জাঁকজমকপূর্ণ গ্রেট হল অব দ্য পিপলে ট্রাম্পকে করমর্দনের মাধ্যমে স্বাগত জানান শি। বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে গভীর উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও এই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করা হয়। ট্রাম্পকে সঙ্গে নিয়ে শি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গেও করমর্দন করেন। তাদের মধ্যে আছেন পেন্টাগনের প্রধান পিটার হেগসেথ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। রুবিও তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বেইজিংয়ের কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

চীনা সামরিক ব্যান্ড যখন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত ‘দ্য স্টার-স্প্যাংলড ব্যানার’ এবং পরে চীনের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে, তখন ট্রাম্প ও শি সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় কামান থেকে তোপধ্বনি করা হয়। রঙিন পোশাক পরা স্কুলশিশুরা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পতাকা নাড়িয়ে ‘ওয়েলকাম, ওয়েলকাম’ স্লোগান দেয়। ট্রাম্প ও শি তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যান।

দুই নেতা সন্ধ্যায় গ্রেট হলে রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশ নেবেন। এছাড়া ট্রাম্প ঐতিহাসিক টেম্পল অব হেভেন পরিদর্শন করবেন। সেখানে একসময় চীনের সম্রাটরা ভালো ফসলের জন্য প্রার্থনা করতেন। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী এই স্থানটি চীনের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক নিদর্শনগুলোর একটি। দুই দিনের এই সফরে বুধবার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে বেইজিং পৌঁছান ট্রাম্প। তার সঙ্গে আছেন কয়েকজন শীর্ষ ব্যবসায়ী। এর মধ্যে এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং এবং টেসলার ইলন মাস্কও আছেন। ট্রাম্প যেসব ব্যবসায়িক চুক্তি করতে চান, তারা তার প্রতীক হিসেবেই প্রতিনিধিদলে জায়গা পেয়েছেন। এটি প্রায় এক দশকের মধ্যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম বেইজিং সফর। এর আগে ট্রাম্প ২০১৭ সালে চীন সফর করেন। তবে এবার তার স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প সঙ্গে নেই।

ট্রাম্পের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে রয়েছে কৃষি, বিমানসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসায়িক চুক্তি। এ কারণে তার প্রতিনিধিদলে যুক্তরাষ্ট্রের বহু শীর্ষ ব্যবসায়ী আছেন। বেইজিংগামী এয়ার ফোর্স ওয়ানে বসে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, তিনি শি জিনপিংকে চাপ দেবেন যেন চীন মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আরও উন্মুক্ত হয়, যাতে এই মেধাবী মানুষগুলো তাদের জাদু দেখাতে পারেন।

তবে নয় বছর আগের তুলনায় এখন ট্রাম্পকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও শক্ত অবস্থানের চীনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে এখনও বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক নানা উত্তেজনা আছে।

বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণেই মার্চে নির্ধারিত সফরটি স্থগিত করতে হয়। ট্রাম্প বলেছেন, ইরান নিয়ে শির সঙ্গে তার দীর্ঘ আলোচনা হবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি তেলের বড় অংশই চীনের কাছে বিক্রি করা হয়। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, আমি মনে করি না ইরানের বিষয়ে আমাদের বেইজিংয়ের কোনো সহায়তা প্রয়োজন।

তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিছুটা ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন। বুধবার ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে রুবিও বলেন, আমরা আশা করছি, পারস্য উপসাগরে ইরান যা করছে এবং করতে চাইছে, সেখান থেকে সরে আসতে তাদের আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চীনকে রাজি করাতে পারব।

শুল্ক যুদ্ধের বিরতি?
দীর্ঘদিনের বাণিজ্যযুদ্ধও বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়। গত বছর ট্রাম্পের ব্যাপক শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের পর পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপে দুই দেশের কর হার ১০০ শতাংশেরও বেশি হয়ে যায়। দক্ষিণ কোরিয়ায় গত অক্টোবরে শেষ বৈঠকে ট্রাম্প ও শি এক বছরের জন্য শুল্কযুদ্ধ স্থগিত রাখতে সম্মত হন। এবার সেই সমঝোতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। তবে সমঝোতা হবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত।

তাইওয়ান ইস্যুও আলোচনায় থাকবে। সোমবার ট্রাম্প বলেন, তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি নিয়ে তিনি শির সঙ্গে কথা বলবেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতির ব্যতিক্রম হতে পারে। কারণ এতদিন ওয়াশিংটন জোর দিয়ে বলে এসেছে, তাইওয়ানকে সমর্থনের বিষয়ে তারা বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনা করবে না। বিষয়টি তাইপে ও এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের নজরে থাকবে।

চীনের বিরল খনিজ রপ্তানির নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দুই দেশের উত্তপ্ত বাণিজ্য সম্পর্কও আলোচনায় উঠতে পারে। উভয় পক্ষই এই বৈঠক থেকে কিছু ইতিবাচক ফল নিয়ে বের হতে চাইবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রভাবসম্পন্ন বেইজিং-ওয়াশিংটন সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টাও থাকবে। এছাড়া ট্রাম্প আশা করছেন, ২০২৬ সালে শির যুক্তরাষ্ট্র সফরের একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করতে পারবেন, যাতে চীনা নেতার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা যায়।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন