এখনো ভাবনায় ই-রিকশা

এখনো ভাবনায় ই-রিকশা

ফন্ট সাইজ:

রাজধানীর সড়কে বেপরোয়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার লাগাম টানতে ই-রিকশা নামানোর পরিকল্পনা করেছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। বুয়েটের নকশাকৃত ই-রিকশার অনুমোদনও দেয়া হয়েছিল। নগরবাসীকে ভোগান্তি থেকে রেহাই দিতে পুরনো অটোরিকশা তুলে নিয়ে সড়কে আধুনিক এই রিকশা ছাড়তে চেয়েছিল ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার। সেসময় ঘটা করে পাইলট প্রজেক্ট শুরু করা হয়েছিল। দুই সিটির আফতাবনগর ও জিগাতলা এলাকায় কিছু রিকশা পরীক্ষামূলক নামানো হয়েছিল। কিন্তু অনেকটা থমকে যায় সেই কার্যক্রম। সড়কেও দেখা মিলে না এসব রিকশার। এরপর কার্যক্রম চালিয়ে নিতে ফের বুয়েটের গবেষক দলের সঙ্গে আলোচনা করেছে দুই সিটি। এখন পর্যন্ত আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ই-রিকশার ভবিষ্যৎ।

জানা যায়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এহসানের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের গবেষক দল রিকশার একটি নকশা তৈরি করে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অধ্যাপক এহসান এ নকশা নিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে দৌড়ঝাঁপ করেন। কিন্তু কাজ হয়নি। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগ্রহ দেখায়। সীমিত সংখ্যক ই-রিকশা তৈরির অনুমোদন পায় আকিজ, হাইটেক পাওয়ার ও মনির অটোরিকশা ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। চলতি বছরের ৩রা জানুয়ারি রাজধানীর আফতাবনগর ও জিগাতলায় তিন চাকার স্বল্প গতির ব্যাটারিচালিত রিকশার পরীক্ষামূলক পাইলট কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। এরই মধ্যে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। দুই সিটিতে নতুন প্রশাসক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যদিও তারা এ প্রজেক্টের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে নতুন করে দেখা দিয়েছে জটিলতা। এখনো রাজধানীর সড়কে ২০ লাখ অটোরিকশা চলাচল করছে। এসব তুলে দিয়ে নতুন রিকশা নামানোকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

যা থাকছে বুয়েটের নকশার ই-রিকশায়
প্রচলিত রিকশায় শুধু পেছনের চাকায় ব্রেক থাকে। কিন্তু বুয়েটের মডেলে সামনের ও পেছনের তিন চাকাতেই শক্তিশালী ডিস্ক ব্রেক দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও হাইড্রোলিক ব্রেকিং সিস্টেম রাখা হয়েছে। যা দ্রুতগতি নিয়ন্ত্রণ এবং সুষমভাবে থামাতে সাহায্য করে। ফলে উল্টে যাওয়ার ভয় থাকে না। ঢালু রাস্তায় রিকশা যাতে গড়িয়ে না যায়, সেজন্য আলাদা পার্কিং ব্রেক বা হ্যান্ড ব্রেক যুক্ত করা হয়েছে। রিকশার ভরকেন্দ্র বা সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি নিচে রাখা হয়েছে। যা উচ্চ গতিতেও রিকশাকে স্থিতিশীল বা ব্যালেন্সড রাখে। ব্যাটারির চার্জ এবং মোটরের গতি নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আধুনিক কন্ট্রোলার ব্যবহার করা হয়েছে। রাতে চলাচলের জন্য এতে হাই-বিম ও লো-বিম সংবলিত শক্তিশালী হেডলাইট এবং ডানে-বামে মোড় নেয়ার জন্য সিগন্যাল লাইট বা ইন্ডিকেটর যুক্ত করা হয়েছে।

দু’পাশে দু’টি লুকিং গ্লাস বা আয়না দেয়া হয়েছে। উচ্চ শব্দসম্পন্ন ইলেকট্রিক হর্ন যুক্ত করা হয়েছে। চালকের সামনে কাঁচের উইন্ডশিল্ড বা উইন্ডস্ক্রিন দেয়া হয়েছে। রিকশার কাঠামোটি এমনভাবে তৈরি যাতে এটি ৩২৫ থেকে ৪২৫ কেজি ওজন অনায়াসে বহন করতে পারে। ভাঙা রাস্তায় আরামদায়ক যাতায়াতের জন্য উন্নতমানের শক অ্যাবজরবার বা সাসপেনশন ব্যবহার করা হয়েছে। যাত্রী ও চালকের জন্য মজবুত এবং টেকসই ছাদ বা ছাউনি নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে ৩৮ ভোল্টের পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে। এটি প্রচলিত এসিড ব্যাটারির তুলনায় হালকা এবং দীর্ঘস্থায়ী। যা একবার পূর্ণ চার্জে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে সক্ষম। এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও রিকশাগুলোতে জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। যার ফলে এটি নির্ধারিত এলাকার বাইরে বা মহাসড়কে প্রবেশ করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকেত দেবে বা বন্ধ হয়ে যাবে। প্রতিটি চালককে বিশেষ কারিগরি প্রশিক্ষণ দেয়া হবে এবং তাদের কিউআর কোড সংবলিত ডিজিটাল লাইসেন্স প্রদান করা হবে।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি অধ্যাপক মো. এহসানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছে দুই সিটির প্রতিনিধিদল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ সিটি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম। আলোচনা সভায় তিনি প্রজেক্টটি এগিয়ে নেয়ার আশ্বাস দেন। এরই মধ্যে ১০টির অধিক কোম্পানি ই-রিকশা তৈরিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে, এই প্রজেক্ট নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কারণ, সড়কে এখনো ২০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এসব রিকশা কীভাবে প্রতিস্থাপন করা হবে নেই তার নির্দিষ্ট রোডম্যাপ। শুরু হয়নি চালকদের ট্রেনিং প্রক্রিয়া। বন্ধ হয়নি অটোরিকশা তৈরি। এখনো অলিতে-গলিতে তৈরি হচ্ছে এসব রিকশা। ই-রিকশা নামানো হলে এখনো কেন পুরনো রিকশা তৈরি কার্যক্রম বন্ধ হয়নি তা নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। এদিকে, সামনে সিটি করপোরেশন নির্বাচন।

নির্বাচনের পর নতুন মেয়র দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এরই মধ্যে রাজধানী থেকে পুরনো রিকশা তুলে দিয়ে ই-রিকশা নামানো একটি চ্যালেঞ্জের বিষয়। তবে ই-রিকশা সংক্রান্ত আইন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিধিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। বিধিমালা চূড়ান্ত হলে আশার আলো দেখতে পারে ই-রিকশা। এ বিষয়ে বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এহসান মানবজমিনকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পাইলটিং প্রজেক্ট হিসেবে দুই জায়গায় ই-রিকশা নামানো হয়েছিল। সরকার পরিবর্তনের পর আর কাজ এগোয়নি। তবে দুই সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। তারাও কাজটি এগিয়ে নিতে চান। সব পদে নতুন লোক এসেছে। কাজটি বুঝে নিতে সময় লাগবে। আশা করি, কাজ দ্রুত এগিয়ে নেয়া হবে। জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম মানবজমিনকে বলেন, সব পুরনো রিকশা তুলে দেয়া খুবই কঠিন কাজ হবে।

এজন্য ইতিমধ্যে ই-রিকশা সংক্রান্ত আইন করা হয়েছে। তবে বিধিমালা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। বিধিমালা চূড়ান্ত হলে সেই অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে। এর আগে অনেক চালককে ট্রেনিং দেয়া হয়েছিল। ট্রেনিংপ্রাপ্ত সকল চালকদের রাখা হবে। প্রয়োজনে নতুন চালকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। তিনি বলেন, আগের রিকশাগুলো কীভাবে পুনর্ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে। ব্যাটারিচালিত রিকশার ৫টি প্রতিষ্ঠানের কারখানা পরিদর্শন করে রিপোর্ট স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রেরণ করা হয়েছে। বাণিজ্যিক উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণের সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয় দিবে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তের আলোকে রিকশাগুলো সিটি করপোরেশন এবং পুলিশের সমন্বয়ে পর্যায়ক্রমে তুলে দেয়া হবে।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন