মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন প্রকাশ্যে ইরানের সামরিক শক্তিকে ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত’ বলে দাবি করলেও, গোপন মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। এ মাসের শুরুর দিকের শ্রেণিবদ্ধ মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান তাদের বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, মোবাইল লঞ্চার এবং ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আবারও কার্যকর প্রবেশাধিকার ফিরে পেয়েছে। সাংবাদিক অ্যাডাম এনটাউস, ম্যাগি হ্যাবারম্যান ও জোনাথন সোয়ানের লেখা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয় যে, মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো- হরমুজ প্রণালির পাশে থাকা ইরানের ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মধ্যে ৩০টিই আবার কার্যকর হয়ে উঠেছে। এই ঘাঁটিগুলো থেকে ইরান মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং তেলবাহী জাহাজকে টার্গেট করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরান ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটিগুলোর ভেতরে থাকা মোবাইল লঞ্চার ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্র অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারছে। কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি ওই ঘাঁটি থেকেই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতাও রয়েছে। মাত্র তিনটি ঘাঁটি পুরোপুরি অকার্যকর অবস্থায় আছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরান এখনও তাদের মোবাইল লঞ্চারের প্রায় ৭০ শতাংশ ধরে রেখেছে এবং যুদ্ধের আগের ক্ষেপণাস্ত্র মজুতেরও প্রায় ৭০ শতাংশ অক্ষত রয়েছে। এই ভাণ্ডারের মধ্যে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা আঞ্চলিক দেশগুলোকে লক্ষ্য করতে পারে এবং তুলনামূলক কমসংখ্যক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, যা স্থল ও সমুদ্রের স্বল্পপাল্লার লক্ষ্যবস্তুতে ব্যবহৃত হতে পারে।
স্যাটেলাইট চিত্রসহ বিভিন্ন নজরদারি তথ্যের ভিত্তিতে মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ইরান তাদের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ ও উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশে আবার প্রবেশাধিকার ফিরে পেয়েছে। এসব স্থাপনাকে এখন আংশিক বা পুরোপুরি কার্যকর হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এই তথ্যগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের প্রকাশ্য বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ট্রাম্প মার্চে বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি ধ্বংস হয়ে গেছে। দেশটির সামরিক অর্থে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। অন্যদিকে পিট হেগসেথ এপ্রিল মাসে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’কে এমন একটি অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেন, যা ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে ‘বহু বছরের জন্য যুদ্ধে অক্ষম’ করে দিয়েছে। কিন্তু নতুন গোয়েন্দা মূল্যায়ন বলছে, বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস আবারও ট্রাম্পের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ইরানের সামরিক শক্তি ‘চূর্ণবিচূর্ণ’ হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, যে কেউ মনে করে ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করেছে, সে হয় বিভ্রান্ত, নয়তো ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপসের মুখপাত্র। পেন্টাগনের ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র জোয়েল ভালদেজ সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা করে বলেন, কিছু গণমাধ্যম ইরানের ‘জনসংযোগ প্রতিনিধি’র মতো আচরণ করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে- প্রায় ১১০০টি দীর্ঘপাল্লার স্টিলথ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ১০০০টির বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৩০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র। এই অস্ত্রভাণ্ডার পুনরায় পূরণ করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
যদি বর্তমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায় এবং পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ আবার শুরু হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও গভীরভাবে নিজেদের অস্ত্র মজুত ব্যবহার করতে হতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি দুর্বল হতে পারে, বিশেষ করে চীন বা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে।
তবে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন মঙ্গলবার কংগ্রেসে বলেন, বর্তমান দায়িত্ব পালনের জন্য আমাদের পর্যাপ্ত অস্ত্র রয়েছে। অন্যদিকে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল দাবি করেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে নিজেদের স্বার্থ ও জনগণকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব সক্ষমতাই রয়েছে।
