রাউজানের যুবককে খুনের ঘটনায় বিদেশি পিস্তলসহ গ্রেপ্তার ৬

রাউজানের যুবককে খুনের ঘটনায় বিদেশি পিস্তলসহ গ্রেপ্তার ৬

ফন্ট সাইজ:

চট্টগ্রাম মহানগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদ এলাকায় যুবক মোহাম্মদ হাসান ওরফে রাজু হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামিসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযানে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উত্তর জোনের উপ-কমিশনার মো. আমিরুল ইসলাম।

গ্রেপ্তাররা হলো- মূল শুটার সৈয়দুল করিম (২৭), অটোরিকশাচালক আবদুল মান্নান (৩৭), মো. ইউনুস, মো. আয়াতুল্লাহ আলী আদনান (২১), মো. আবু বকর সিদ্দিক ওরফে খোকন (৪৮) এবং আজগর আলী ওরফে বাচা মিয়া (৩৯)। পুলিশ জানায়, গত ৭ই মে রাত আনুমানিক ৯টা ৪০ মিনিটে রৌফাবাদ শহীদ মিনারের পাশে বাঁশবাড়িয়া গলির আব্দুল হাইয়ের বাড়ির দেলোয়ারের ভাড়াঘরের সামনে কয়েকজন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গুলি চালায়। এতে মো. হাসান প্রকাশ রাজু (২৪) নিহত হন এবং রেশমি আক্তার (১২) গুরুতর আহত হয়।

এ ঘটনায় নিহত হাসানের মা সকিনা বেগম (৬৩) ৯ই মে বায়েজিদ থানায় মামলা দায়ের করেন। পরে সিসি টিভি ফুটেজ ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত সন্দেহে করিমকে কক্সবাজারের সুগন্ধা সি-বিচ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, দুই রাউন্ড তাজা গুলি এবং ঘটনাস্থলে পরিহিত পোশাক উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া আসামিদের বহনকারী একটি সিএনজি অটোরিকশা উদ্ধার করা হয়। পরে ওই সিএনজিচালক আব্দুল মান্নানকে একই দিন সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে ডবলমুরিং থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর করিমকে সহায়তাকারী হিসেবে ইউনুচ মিয়া ও আলী আদনানকে রাত ১০টা ১৫ মিনিটে রৌফাবাদ ব্রিজ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অন্যদিকে, গ্রেপ্তার সিএনজি চালকের তথ্যের ভিত্তিতে আসামি আবু বক্কর ছিদ্দিক ও আজগর আলীকে গত সোমবার দিবাগত রাত ১টার দিকে চান্দগাঁও থানাধীন কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জানা যায়, গত ২৬শে এপ্রিল রোববার রাতে রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ শমসেরপাড়া এলাকায় নাসির উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় নিহত নাসিরের মেয়ে লাভলী আক্তার হাসান রাজু জড়িত বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন। নাসির প্রবাসফেরত ও যুবদলের কর্মী ছিলেন। এ ছাড়া নাসির এমপি গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন।

অন্যদিকে হাসান রাজু ছিলেন ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ফজল হকের অনুসারী। আর ফজল হকের সঙ্গে সখ্য রয়েছে রাউজানের সাবেক এমপি গোলাম আকবর খোন্দকার গ্রুপের সঙ্গে। উত্তর চট্টগ্রামের ত্রাস, হত্যা, অপহরণসহ বহু মামলার আসামি ফজলুল হক ওরফে ফজল হক দীর্ঘদিন বিদেশে পলাতক থাকার পর দেশে ফিরে ফের অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। খুনসহ নানা অপরাধ কাজে তার নাম বেরিয়ে আসছে। সে রাউজানের মূর্তিমান আতঙ্ক। স্থানীয় সূত্র ও রাজনৈতিক মহলের দাবি, পুরনো সহযোগীদের সঙ্গে নতুন সদস্য যুক্ত করে তিনি একটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। বালি উত্তোলন, মাটি কাটা ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে এলাকায় পুনরায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ জানায়, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক কারবার এবং অপরাধ আখড়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলছে টার্গেট কিলিং। গত ১৯ মাসের ব্যবধানে নগরের বায়েজিদ এবং বাকলিয়া থানা এলাকায় একাধিক টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। খুনের এসব ঘটনার বেশির ভাগের নেপথ্যে ছিল বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ। ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, ইট-বালু-সিমেন্ট সরবরাহ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, বালুমহাল দখল, ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং জায়গা দখল-বেদখলকেন্দ্রিক। এ ছাড়া হাসান রাজুর খুনের ঘটনায়ও জড়িত বড় সাজ্জাদ বাহিনী।

সিএমপি উত্তর জোনের উপ-কমিশনার মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘বায়েজিদে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান আসামিসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার এবং অবশিষ্ট আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে রাউজানে বেড়ে যায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম। গত দেড় বছরে রাউজানে অন্তত ২৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে ১৬টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। সর্বশেষ রাজু হত্যাকাণ্ডও এর ধারাবাহিকতা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন