জনপ্রতি লাখ টাকায় আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগ

জনপ্রতি লাখ টাকায় আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগ

ফন্ট সাইজ:

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ হাসানুল হোসেনের বিরুদ্ধে জনপ্রতি লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার আত্মীয় ও কাছের লোকজন রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য), ফুলবাড়ীয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও জেলা সিভিল সার্জন একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছেন। জানা যায়, গত বছর আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ পাওয়া ১১ কর্মীর মাঝে ৯ জনকে বাদ দিয়ে ২ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসানুল হোসেন। নিয়োগ বাতিল হওয়া ৯ জনের দাবি ১০০ টাকা মূল্যের তিনটি স্ট্যাম্পে তাদের নিয়োগ নবায়ন করে।

নবায়ন করার পর জন জনপ্রতি ৬০ হাজার টাকা করে দাবি করে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। পরে টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় ৯ জনের নিয়োগ বাতিল করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, আমরা ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আউটসোর্সিং কর্মচারী বিভিন্ন পদে কর্মরত আছি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পায় ড্রিন্স সার্ভিসেস লিমিটেড। এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক আকতারুজ্জামান। ২০২৫ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি নিয়োগপ্রাপ্ত হই। টানা চার মাস চাকরি করার পর বেতন দেয়। পরে ১০ মাস আমরা বিনাবেতনে কাজ করে আসছি। আমাদের আশ্বাস দিয়েছিল- নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পেলে আমাদের নিয়োগ নবায়ন করবেন। পরে নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ড্রিন্স সার্ভিসেস লিমিটেড কাজ পায়। আমরা সকলেই সিভিল সার্জনের সঙ্গে চাকরি নবায়নের ব্যাপারে দেখা করি। সিভিল সার্জন চাকরি বলবৎ থাকবে বলে নিশ্চিত করেন।

নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসানুল হোসেন জনপ্রতি ৬০ হাজার টাকা দাবি করার বিষয়টি সিভিল সার্জনকে জানালে তিনি আশ্বস্ত করেন, কোনো প্রকার টাকা লাগবে না। কেউ যদি টাকা দেয়, তার চাকরি থাকবে না বলেও জানান তিনি। অভিযোগে আরও বলা হয়, পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চাকরি নবায়ন করার কথা বলে ১০০ টাকার স্ট্যাম্পে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। পরবর্তীতে আমাদের মাঝে দু’জনকে নিয়ে বাকি ৯ জনের নিয়োগ বাতিল করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। এদিকে আমরা গত ১০ মাস বিনাবেতনে চাকরি করেছি এবং নিয়মিত হাজিরা দিয়েছি। তা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নিকট সংরক্ষিত আছে।

পরে আমাদের নিয়োগ বাতিল করার পর ওই হাজিরা খাতা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা লুকিয়ে ফেলেন এবং ১০ মাসের বেতনের কোনো টাকা দেয়নি। নিয়োগবঞ্চিত ৯ জন হলেন- ওয়ার্ড বয় শফিকুল ইসলাম, নাজমুল হোসেন, নাজমুল হাসান আকাশ, ল্যাব সহকারী মোস্তাফিজুর রহমান, বাবুর্চি মাহমুদুল হাসান সম্রাট, ওটি পরিচারক শুক্ল দেব, আয়া তাসলিমা আক্তার, পরিচ্ছন্নতাকর্মী মোরাদ আহমেদ, নিরাপত্তা প্রহরী খাদেমুল হক।

ভুক্তভোগী বাবুর্চি মাহমুদুল হাসান সম্রাট বলেন, আমরা গত ১৪ মাস ধরে কাজ করে আসছি। এর মাঝে আমরা চার মাসের বেতন পেয়েছি। ওই চার মাসের বেতন থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসানুল হোসেন বিভিন্ন অজুহাতে প্রতি জনের বেতন থেকে ৪ হাজার টাকা করে কেটে নিয়েছে। গত ১০ মাস বিনাবেতনে কাজ করেছি, নতুন চাকরির আশায়। নিয়োগ নিশ্চিত করেও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসানুল হোসেন আমাদের নিয়োগ বাতিল করে এক থেকে দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে তার আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত লোকদের নিয়োগ দিয়েছে। ল্যাব সহকারী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নিয়োগ নিশ্চিত করে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আমাদের কাছে ৬০ হাজার করে টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে আমাদের নিয়োগ বাতিল করে নতুন করে ৯ জনকে জনপ্রতি এক থেকে দেড় লাখ টাকা করে নিয়োগ দিয়েছেন। নিয়োগপ্রাপ্তদের মাঝে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার স্বজন ও পরিচিত লোক রয়েছে।

আমরা ১০ মাস বিনাবেতনে চাকরি করেও কাজ পাইনি। এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক আকতারুজ্জামান বলেন, আমার পছন্দ মতো কোনো লোক নিয়োগ দেয়া হয়নি। নিয়োগের বিষয়টি সিভিল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলতে পারবেন। তাছাড়া আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি আমার জানা নেই। ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসানুল হোসেন বলেন, নিয়োগের বিষয়ে আমার কোনো হাত নেই। সব কার্যক্রম জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের। ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ফয়সাল আহমেদ বলেন, শুধু টেন্ডার প্রক্রিয়া আমার এখানে হয়েছে। বাকি সব করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে।

আমি অনুমোদন দিয়েছি। কে নিয়োগ পেলো, আর কে পেলো না। তা দেখবেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে আমার কিছু করার নেই। ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. প্রদীপ কুমার সাহা বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় সিভিল সার্জন কার্যালয়ে। তবে, নিয়োগ নিয়ে কারোর আপত্তি থাকলে তারা অভিযোগ দিতে পারে। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন