গত ১ বছর অর্থাৎ, ২০২৫ সালে ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষকে সেবা দিয়েছে এনজিও সংস্থা ব্র্যাক। এর ধারাবাহিকতায় আগামী ৫ বছরে ১০ লাখ মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করবে প্রতিষ্ঠানটি। ব্র্যাক বলছে, বর্তমান সময়ে বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা। সেই সমস্যার সমাধানকে আগামী পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে তারা। সোমবার ব্র্যাকের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে গত বছরের প্রতিবেদন তুলে ধরে এই পরিকল্পনার কথা জানান প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ। এ সময় আসিফ সালেহ বলেন, আগামী পাঁচ বছরে নারী ও যুবসমাজকে কেন্দ্র করে পাঁচ ধরনের কাজকে অগ্রাধিকার দেবে ব্র্যাক।
সেগুলো হলোÑ অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও জলবায়ু সহনশীলতা। ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত স্যার ফজলে হোসেন আবেদ বলতেন, মানুষের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানকে খাপ খাওয়াতে হবে। নইলে ব্র্যাকের কাজের গুরুত্ব থাকবে না। ব্র্যাক সময়ের সঙ্গে মানুষের পরিবর্তিত চাহিদার দিকে দৃষ্টি দেয়। বর্তমান সময়ে বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা, সেই সমস্যাকে তাদের সামর্থ্যরে মধ্যে সমাধান করতে চায় ব্র্যাক। প্রতিবেদনে ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০২৫ সালে দেশের প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ব্র্যাকের বিভিন্ন সেবা ও সহায়তার আওতায় এসেছে, যা বাংলাদেশের প্রতি ৭ জনে ১ জন মানুষের সমান। এ ছাড়া ১ কোটি ৯০ লাখ নারী এবং ২ লাখ ২৩ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ব্র্যাকের সহায়তা পেয়েছেন। ব্র্যাক যাদের কাছে সরাসরি পৌঁছেছে, তাদের প্রতি ৩ জনে ২ জন নারী।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আর্থিক সেবায় অন্তর্ভুক্তি, দুর্যোগ ও সংকট মোকাবিলা, নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, অভিবাসন এবং দক্ষতা উন্নয়নসহ নানাক্ষেত্রে এসব সহায়তা দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দারিদ্র্যবিমোচনে ৫ বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার সম্পদ দেয়া হয়েছে। ৩ লাখ ১২ হাজার অতিদরিদ্র পরিবার অতিদারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়েছেন। মোট ঋণ সহায়তার পরিমাণ ২৯ হাজার কোটি টাকা থেকে সাড়ে ৪৮ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। গত ৫ বছরে ২১ লাখ মা নিরাপদ প্রসবসেবা পেয়েছেন। ৩৫ লাখ মানুষের অসংক্রামক ব্যাধি, প্রতিবন্ধিতা ও চোখের সমস্যা শনাক্ত হয়েছে। ১০ লাখের বেশি যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার আওতায় এসেছেন। ৬ লাখ ৪৪ হাজার শিক্ষার্থী ব্র্যাকের শিক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে, যাদের ৫৬ শতাংশ ছাত্রী দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের মেধাবিকাশ বৃত্তি দেয়া হয়েছে। ১ হাজার ৭৪০টি স্কুলে ৮ লাখ ৮ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ খাবার পানি, স্যানিটেশন ও হাত ধোয়ার সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। প্রায় ১১ লাখ দুর্যোগকবলিত পরিবার মানবিক সহায়তা পেয়েছে। ১ লাখ ৩৩ হাজার পরিবার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় উপযুক্ত সমাধান পেয়েছেন। ১ লাখ ৫ হাজার ৭২৯ জন দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষ জলবায়ুসহিষ্ণু প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিরাপদ পানি পেয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, নারী, কিশোরী ও তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশ, আইনি সহায়তা এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ব্র্যাকের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ৫ বছরে ৯৮ হাজার ৬০০ নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত অভিযোগ নথিভুক্ত করেছেন এবং আইনি সহায়তা পেয়েছেন। ১ লাখ ২ হাজার কিশোরী আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং লক্ষ্য অর্জনে উদ্বুদ্ধকরণ সহায়তা লাভ করেছেন। ২০২৫ সালে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে ২ হাজার ২৩৭টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রতিবেদনে ব্র্যাক উল্লেখ করে, আগামী ৫ বছরে ৭টি সমন্বিত উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অগ্রাধিকারের মাধ্যমে ১০ লাখ কর্মসৃজন, ১৯ লাখ শিক্ষার্থীর শিখন ঘাটতি পূরণে সহায়তা পাবে, ২ কোটি মানুষ আর্থিক সেবার আওতায় আসবে, প্রতি বছর ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়া হবে, চর, হাওর, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় এলাকায় ২০০টি নতুন আর্থিক সেবাকেন্দ্র চালু করা হবে, বছরে ৭০ হাজার পরিবার আল্ট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করবে। শহরাঞ্চলে আল্ট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন কর্মসূচির কার্যক্রম ১৭ জেলা থেকে ৩০ জেলায় সম্প্রসারিত হবে, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি জেলায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে, ১২ লাখ ৫০ হাজার নারী কৃষকের কাছে সহায়তা পৌঁছাবে, ২৬৮টি উপজেলায় ৬৫ হাজার কিশোরী প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবে, ২৬৮টি লিগ্যাল এইড ক্লিনিকের মাধ্যমে আইনি সেবা আরও সহজলভ্য করা হবে, ৩৯ জেলায় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেনÑ ব্র্যাকের অ্যাডভোকেসি, কমিউনিকেশনস অ্যান্ড এনগেজমেন্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন পরিচালক কে এ এম মোর্শেদ, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট, সেফগার্ডিং অ্যান্ড সোশ্যাল কমপ্লায়েন্স পরিচালক আ ফ ম শহিদুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন পরিচালকরা।
