মিরপুরের আকাশে মেঘের আনাগোনা আর ঝুম বৃষ্টি ছাপিয়ে গতকাল বাইশগজে আধিপত্য ধরে রাখে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। প্রথম ইনিংসের ২৭ রানের লিডকে পুঁজি করে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে টাইগাররা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। সফরকারী পাকিস্তানের বিপক্ষে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে গতকাল চতুর্থ দিন শেষে ৩ উইকেটে ১৫২ রান তোলে স্বাগতিকরা। সবমিলিয়ে টাইগারদের বর্তমান লিড দাঁড়িয়েছে ১৭৯ রানে।
যদিও বৃষ্টির বাগড়ায় খেলা হয়েছে মাত্র ৪৮.৪ ওভার। দিনের শুরুতে ওপেনিং জুটির দ্রুত বিদায় বাংলাদেশকে কিছুটা চাপে ফেললেও ৩য় উইকেটে নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুমিনুল হকের ১০৫ রানের অনবদ্য জুটি সেই চাপ উড়িয়ে দেয়। ক্যারিয়ারের নতুন মাইলফলক স্পর্শ করা মুমিনুল ৫৬ রান করে বিদায় নিলেও অধিনায়ক শান্ত ৫৮ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন। তার সঙ্গে ১৬ রানে অপরাজিত আছেন অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহীম।
দিনের বাকি সময়টা প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ভেসে গেলেও স্বাগতিকদের জয়ের স্বপ্ন এখন বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। আজ পঞ্চম দিনে লক্ষ্য থাকবে বড় সংগ্রহের। পঞ্চম দিনের খেলা এবং দলের পরিকল্পনা নিয়ে নিজেদের ভাবনার কথা জানিয়েছেন টাইগারদের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল। তিনি বলেন, ‘ইনিংস ঘোষণার লক্ষ্যমাত্রা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে আমরা জয়ের জন্যই খেলছি। বৃষ্টি না হলে ৯৮ ওভার খেলার সুযোগ থাকবে। আমাদের শক্তিশালী স্পিন ও পেস অ্যাটাক নিয়ে যদি ৭০-৭৫ ওভার বোলিং করতে পারি, তবে জয়ের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে ইনশাআল্লাহ।’
শুরুটা অবশ্য মোটেও সুখকর ছিল না। মাহমুদুল হাসান জয় মাত্র ৫ রান করে মোহাম্মদ আব্বাসের বলে এলবিডব্লিউর শিকার হলে শুরুতেই ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি জয়। এরপর দ্রুতই সাজঘরের পথ ধরেন অন্য ওপেনার সাদমান ইসলাম। হাসান আলির বাড়তি বাউন্সে পরাস্ত হয়ে গালিতে ক্যাচ দেওয়ার আগে তার সংগ্রহ ছিল ১০ রান। ২৩ রানে ২ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা দলের ত্রাতা হয়ে দাঁড়ান ২ বাঁহাতি অভিজ্ঞ সৈনিক।
শেরে বাংলার ঘাসের উইকেটে যখন বল কিছুটা অসমান বাউন্স নিচ্ছিল, তখন চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় লড়াই শুরু করেন নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুমিনুল হক। শুরু থেকেই শান্ত ছিলেন আগ্রাসী মেজাজে, আর মুমিনুল ছিলেন সতর্ক। শাহীন শাহ আফ্রিদি কিংবা আব্বাসের তোপ সামলে তারা বড় সংগ্রহের ভিত গড়ে দেন। ব্যক্তিগত ১৫ ও ৪৩ রানে ২ বার জীবন পেয়ে তা শতভাগ কাজে লাগান মুমিনুল।
সালমান আলি আগার বলে মোহাম্মদ রিজওয়ান ক্যাচ ছাড়লে ১ম বার রক্ষা পান তিনি। এরপর নোমান আলির বলে আব্দুল্লাহ ফাজাল শর্ট লেগে সহজ সুযোগ হাতছাড়া করলে আবারও বেঁচে যান মুমিনুল। এই সুযোগে নিজের ক্যারিয়ারে ৫০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন এই বাঁহাতি। পাকিস্তানের বোলারদের হতাশ করে তারা ১০০ রানের জুটি গড়েন। টি ব্রেকে যাওয়ার আগ পর্যন্ত টাইগারদের স্কোরবোর্ডে ছিল ২ উইকেটে ৯৯ রান।
আবহাওয়া বিরূপ হওয়ার কারণে দীর্ঘক্ষণ খেলা বন্ধ থাকলেও মাঠে ফেরার পর এই জুটি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। শান মাসুদের দল যখন একের পর এক আক্রমণ করেও ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন বাংলাদেশ নিজেদের লিড ১৫০ ছাড়িয়ে নেয়। বৃষ্টির প্রবল প্রতাপে মাঠের এক বিশাল অংশ ঢেকে রাখতে হলেও মাঠকর্মীদের প্রচেষ্টায় শেষ সেশনে খেলা শুরু হয়। লড়াইয়ের ৯ম ৫০ রানের জুটি গড়তে তারা খরচ করেন ১৭৫ বল। ক্যারিয়ারের সাবলীল ব্যাটিংয়ে শান্ত ৯০ বলে স্পর্শ করেন নিজের অর্ধশতক। ঠিক ১ বল পরেই প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন মুমিনুল।
আফ্রিদির বলে রিজওয়ানের হাতে ক্যাচ দেওয়ার আগে ১২০ বলে ৫৬ রান আসে তার ব্যাট থেকে। এতেই ভেঙে যায় ১০৫ রানের জমাট বাধা জুটি। নতুন ব্যাটসম্যান হিসেবে মাঠে আসা মুশফিকুর রহিমকে নিয়ে দিনের বাকিটা সময় নির্বিঘ্নে পার করে দেন অধিনায়ক। আলোকস্বল্পতার কারণে খেলা যখন আগাম শেষ ঘোষণা করা হলো, তখন টাইগারদের রান ৩ উইকেটে ১৫২। শান্ত অপরাজিত আছেন ৫৮ রানে, যাতে ৬টি চারের মার ছিল।
অন্যদিকে মুশফিক ৩১ বলে ১৬ রান করে সঙ্গ দিচ্ছেন অধিনায়ককে। ১ম ইনিংসের মেহেদী হাসান মিরাজের ৫ উইকেটের কল্যাণে পাওয়া ২৭ রানের লিড এখন টাইগারদের বড় পুঁজি। গতকালকের আকাশ মেঘলা থাকলেও উইকেটে বোলারদের জন্য কিছুটা সহায়তা দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তান এখন বাংলাদেশের চেয়ে ১৭৯ রানে পিছিয়ে। আজ সকাল পৌনে ১০টায় ৫ম দিনের খেলা শুরু হওয়ার কথা। বাংলাদেশের লক্ষ্য থাকবে দ্রুত আরও ১০০ থেকে ১৫০ রান যোগ করে ইনিংস ঘোষণা করা। মিরপুরের এই উইকেটে শেষ ইনিংসের ৩০০-এর কাছাকাছি রান তাড়া করা কঠিন।
