আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রথম পাতার খবর ‘হামের পরিস্থিতি: ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের, দ্বিমত সরকারে’। প্রতিবেদনে বলা হয়, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দুই মাসের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে গেল। রোগটির প্রকোপ ঠেকাতে টিকাদান কর্মসূচি চললেও আক্রান্ত আর মৃত্যুর সংখ্যা কমার কোনো লক্ষণ এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। এই অবস্থায় হামের প্রাদুর্ভাবকে ‘স্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা বা মহামারি হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত জরুরি পদক্ষেপের তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন জনস্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্ববিদেরা। তবে এর সঙ্গে একমত নয় সরকার। তাদের দাবি, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণেই আছে।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘মহামারি ঘোষণার প্রয়োজন নেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। টিকাদান কর্মসূচির আওতায় চলে এসেছে ৯৬ শতাংশ শিশু। বাকিটা চলমান। সংক্রমণ বেশি, এমন এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা জোরদার করা হয়েছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চার শিশু হামে এবং সাত শিশু হাম উপসর্গে মারা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে নিশ্চিতভাবে ৬৫ শিশু ও উপসর্গ নিয়ে ৩৪৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৪০৯ জনে। এ সময় ৪৯ হাজার শিশু উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রায় ৩৫ হাজার শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গত মাসে জানিয়েছিল, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। আর ওই মাসের শেষ দিকে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে ৬১ জেলায় সংক্রমণের কথা বলা হয়। সর্বশেষ গত শনিবার রাজধানীতে এক গোলটেবিল আলোচনায় দেশের ৬৪ জেলাতেই হামের সংক্রমণ বিদ্যমান বলে দাবি করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা।
এই পরিস্থিতি এখন আর বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক প্রাদুর্ভাব নয়, বরং একটি জাতীয় পর্যায়ের মহামারিসদৃশ পরিস্থিতি বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, হামের সংক্রমণ গত কয়েক বছরের গড় প্রবণতা ছাড়িয়ে গেছে এবং মহামারির (এনডেমিক) সংজ্ঞাগত শর্তও পূরণ করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহামারি ঘোষণা করা হলে রোগ নিয়ন্ত্রণে সরকারি ব্যবস্থাপনা আরও দ্রুত এবং সমন্বিত হয়। বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। জরুরি ভিত্তিতে ওষুধ, টিকা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ সহজ হয়। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় সময় বেশি লাগে, সেখানে জরুরি পরিস্থিতিতে তা প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন হয়। একই সঙ্গে আপৎকালীন পরিকল্পনা (কন্টিনজেন্সি প্ল্যান) কার্যকর হয়। সংক্রমণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা এবং সব সংস্থাকে একযোগে মাঠে নামানোর লক্ষ্য থাকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রত্যাশার বাইরে কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে তাকে মহামারি বলা হয়। গত পাঁচ বছরের গড়ের সঙ্গে তুলনা করলে এবারের হামের সংক্রমণ অনেক বেশি। এটি মহামারির পর্যায়ে পড়ে।’
মহামারি ও স্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থার পার্থক্য ব্যাখ্যা করে ডা. বে-নজির আহমেদ আরও বলেন, ‘মহামারি (এনডেমিক) হলো রোগতাত্ত্বিক শ্রেণিবিন্যাস, আর স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হলো ব্যবস্থাপনাগত সিদ্ধান্ত। রোগের বিস্তার, মৃত্যুহার, স্বাস্থ্যসেবার চাপ ও আন্তর্জাতিক ঝুঁকি বিবেচনায় মহামারি নির্ধারিত হয়। এরপর সরকার চাইলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারে।’
সুমাইয়া বেগম মনে করেন, টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। সে জন্য নিজের দেড় বছর বয়সী ও চার বছর বয়সী দুই সন্তানকে টিকা দেননি।
এই বস্তিতে প্রথম আলোর প্রতিবেদক ১০টি পরিবারের মা–বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রতিটি পরিবারে ছয় মাস বয়স থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশু আছে। এদের মধ্যে তিনজন শিশু টিকা পেয়েছে, সাতজন পায়নি।
গতকাল বিকেলে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর পদচারী–সেতুর ওপর নাতি নয়নকে নিয়ে ভিক্ষা করেছিলেন লাইলী বেগম। কথা বলে জানা যায়, নয়নের বয়স দুই বছর চার মাস। হামের টিকা সে কখনো পায়নি।
গোলচত্বর পেরিয়ে মিরপুর গার্লস আইডিয়াল স্কুলের সামনে ভ্যানে ফল বিক্রি করছিলেন রূপালী আক্তার। সঙ্গে ছিল তাঁর তিন বছর বয়সী ছেলে তানভীর। এখনো হামের টিকা পায়নি শিশুটি। রূপালী আক্তার বলেন, ‘সারা দিন বাইরে বাইরে থাকি। কী জানি কখন টিকা দেয়। বাচ্চাদের হাম হচ্ছে শুনেচি। টিকার কথা তো শুনি নাই।’
খুলনা জেলার সুন্দরবন সংলগ্ন একটি উপজেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, ওই উপজেলায় দুই শর বেশি শিশু এখনো টিকা পায়নি। তাদের খুঁজে বের করে টিকা দেওয়া শুরু হবে মঙ্গলবার থেকে।
বরগুনা জেলায় টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে ৫ এপ্রিল থেকে। জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয় জানায়, এখনো ৫ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে।
এখন কী দরকার
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই গোলটেবিল বৈঠকে ইউনিসেফের কর্মকর্তা রিয়াদ মাহমুদ বলেছিলেন, সব শিশুকে টিকার আওতায় আনার জন্য সব পক্ষকে কাজ করতে হবে।
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের সহায়তা নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা যেন বাদ পড়া শিশুদের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এ নিয়ে বাড়তি প্রচারও করা হবে।
বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনার জন্য ব্যাপক প্রচার দরকার বলে অনেকেই মনে করেন। জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজীর আহমেদ বলেন, গণমাধ্যমে প্রচার চালানো দরকার। এলাকায় এলাকায় মাইকিং করা দরকার। র্যালি হওয়া প্রয়োজন। কেন ছয় মাস বয়সীরা টিকা নেবে, তা মানুষকে বোঝানো দরকার। সবার মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি না হলে সব শিশু টিকার আওতায় আসবে না।
মৃত্যু ৪০০ ছাড়াল
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবে (শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে ৭ জন ও নিশ্চিত হামে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হামে মৃত্যু চার শ ছাড়িয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৪৪ জনের এবং নিশ্চিত হামে ৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগের দিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছিল, হামের উপসর্গ নিয়ে ও নিশ্চিত হামে ৩৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এত দিন একাধিক জেলার তথ্য ঠিকমতো প্রকাশ করেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকাল তা প্রকাশ করায় মৃত্যুর সংখ্যা ৪৬ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০৯–এ।
প্রথম আলো
‘সব শিশু টিকা পাচ্ছে না, হামে মৃত্যু ৪০০ ছাড়াল’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, হামে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদের সাতজনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে, বাকি চারজনের নিশ্চিত হামে। এ নিয়ে হামের উপসর্গ ও হামে ৪০৯ জনের মৃত্যুর খবর দিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু ঠেকাতে সরকার দেশজুড়ে টিকার ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। তবে সব শিশু টিকার আওতায় আসছে না। ইউনিসেফের দেওয়া তথ্য পেয়ে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে যাচাই করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। টিকাদান পরিস্থিতি দ্রুত যাচাই পদ্ধতি (আরসিএম) থেকে ইউনিসেফ বলছে, এখনো শহর এলাকায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং গ্রাম এলাকায় ১৫ শতাংশ শিশু টিকা পায়নি।
রাজধানীর কাঁঠালবাগান এলাকায় একটি বাড়িতে ছোট ছোট ঘরে ১৪টি পরিবার বাস করে। নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো এখানে ভাড়া থাকে। পরিবারগুলোতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী পাঁচটি শিশু আছে। গতকাল রোববার সকালে একজন মা প্রথম আলোকে বলেন, সব বাচ্চা টিকা পেয়েছে। এলাকার খান হাসান আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এসব শিশু টিকা নিয়েছে।
কাঁঠালবাগান ঢাল থেকে হাঁটাপথে কারওয়ান বাজার আসতে সময় লাগে ১০ থেকে ১২ মিনিট। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কারওয়ান বাজার মেট্রোরেল স্টেশনের সিঁড়ির নিচে কথা হয় লামিয়ার সঙ্গে। ময়মনসিংহের একটি গ্রাম থেকে এসে লামিয়া সংসার পেতেছেন রাজধানীর ফুটপাতে, মেট্রোরেল স্টেশনের সিঁড়ির নিচে।
লামিয়ার দুটি সন্তান। একটির বয়স সাত মাস। বড়টির আড়াই বছর। লামিয়া জানালেন, কোনো সন্তানই টিকা পায়নি। হামের টিকা দেওয়া হচ্ছে, এ কথা লামিয়া জানেন না। কোথায় গিয়ে টিকা নিতে হবে, সেই তথ্য তাঁর কাছে নেই।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (সিডিসি) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, টিকার ব্যাপারে প্রচার-প্রচারণার ঘাটতি আছে। মানুষের মধ্যে দ্বিধা আছে। আগে ৯ মাস বয়সীদের টিকা দেওয়া হতো, এখন বয়স কমিয়ে ৬ মাস করা হয়েছে। এতে শিশুর ক্ষতি হবে কি না, তা মায়েদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি করতে পারে। এর জন্য দরকার ছিল স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে মায়েদের মুখোমুখি যোগাযোগ। সেটি হয়নি।
৫ এপ্রিল দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। ১২ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশের শহরে ও নগরে টিকা দেওয়া শুরু হয়। চলবে ২০ মে পর্যন্ত।
টিকা ক্যাম্পেইনে ১ কোটি ৮০ লাখ ১৬ হাজার ৯১৪ জন শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল রাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, লক্ষ্যমাত্রার ৯৯ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।
টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের সংখ্যা জানার চেষ্টা করা হয় র্যাপিড কনভিনিয়েন্ট মনিটরিং (আরসিএম) বা দ্রুত যাচাই পদ্ধতিতে। তাতে দেখা যাচ্ছে, শহরে ও গ্রামে কোনো কোনো শিশু হামের টিকা পায়নি।
গত পরশু বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে হামবিষয়ক একটি গোলটেবিল বৈঠকে ইউনিসেফের টিকা বিভাগের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, আরসিএম হয়েছে এমন এলাকার মধ্যে শহরে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং গ্রামে ১৫ শতাংশ শিশু টিকা পায়নি।
ঢাকা ও ঢাকার বাইরের চিত্র
গতকাল প্রথম আলোর তিনজন প্রতিবেদক রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানার চেষ্টা করেছেন ছয় মাস বয়স থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা হামের টিকা পেয়েছে কি পায়নি।
গতকাল সকালে রাজধানীর মিরপুরের ভাষানটেক বস্তি এলাকায় ১২টি পরিবার ঘুরে জানা যায়, পরিবারগুলোর সব শিশু হামের টিকা পেয়েছে। বাসিন্দারা এ–ও জানান যে ব্র্যাকের স্বাস্থ্যকর্মীরা তাঁদের শিশুদের টিকা দিতে সহায়তা করেছেন।
দুপুরে শাহবাগ এলাকায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা নিতে আসা বেশ কয়েকজন শিশুর মা–বাবার সঙ্গে প্রথম আলোর প্রতিনিধির কথা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা এক বাবার কোলে আড়াই বছরের মেয়ে ছিল। ওই বাবা বলেন, তাঁর মেয়ে ৯ মাস বা ১৫ মাস বয়সে কোনো টিকা পায়নি। এখনো কোনো টিকা পায়নি। কেন টিকা পায়নি, তা বলতে চাননি তিনি।
নরসিংদী থেকে আসা এক দম্পতি জানান, তাঁদের তিন বছরের ছেলের অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হচ্ছে। তাই তাঁরা হামের টিকা ছেলেকে দেননি। তাঁদের ধারণা, এই সময় টিকা নিলে ছেলের ক্ষতি হতে পারে।
ফেনী থেকে আসা এক দম্পতি বলেন, তাঁরা বুঝতে পারছেন না, মেয়েকে টিকা দেওয়া উচিত কি না। মেয়ের বয়স ১১ মাস। ৯ মাস বয়সে তাকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর শাহজাহানপুর এলাকার গাজী বস্তিতে হামের টিকা না পাওয়া শিশুর খোঁজ পাওয়া গেছে। সাত মাস বয়সী আয়েশা মনির পাশে বসে বাবা সানোয়ার হোসেন বলেন, মুঠোফোনে কিছু ভিডিও দেখে তিনি টিকার বিষয়ে নিরুৎসাহিত হয়েছেন। তাই মেয়েকে টিকা দেননি।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘জমবে এবার ভোটের লড়াই’। প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের শেষ দিকে দেশজুড়ে বাজবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দামামা। সরকারের পক্ষ থেকে এমন ঘোষণার পরই গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র বইতে শুরু করেছে ভোটের হাওয়া। ব্যানার, পোস্টার আর আগাম গণসংযোগে সরগরম হয়ে উঠেছে পাড়া-মহল্লা ও চায়ের আড্ডা। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের এই নির্বাচন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে ব্যাপক প্রচারণা। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা।
এই দৌড়ে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এনসিপি এরই মধ্যে ১০০ উপজেলা ও পৌরসভায় নিজেদের চেয়ারম্যান ও মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। জামায়াতেরও প্রার্থী তালিকা প্রায় চূড়ান্ত। অন্যদিকে, দেশের অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপির কেন্দ্র থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও, দলটির স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা বসে নেই; তারা পুরোদমে নিজেদের মাঠ গুছিয়ে নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে এবার জমজমাট ভোটের লড়াইয়ের অপেক্ষায় সাধারণ মানুষ।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্য যুগান্তরকে জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিএনপির প্রস্তুতি রয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় কাজ করছেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে দল প্রার্থী চূড়ান্ত করবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, প্রার্থী বাছাই অনেকটাই সম্পন্ন। যে কোনো সময় চূড়ান্ত তালিকা আসবে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, রোববার প্রথম ধাপে চেয়ারম্যান ও মেয়র পদে ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। পরে বাকি প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হবে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, চলতি বছরের শেষদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন শুরু হবে। ধারণা করা হচ্ছে, ডিসেম্বরেই এ নির্বাচন শুরু হতে পারে।
ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে (চসিক) মেয়র পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। ২০ এপ্রিল নগর জামায়াতের রুকন সম্মেলন থেকে দলীয় প্রার্থী হিসাবে অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালীর নাম ঘোষণা করা হয়। তিনি নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক। এদিকে চসিক নির্বাচন যখনই হোক, বিএনপি থেকে বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন পুনরায় নির্বাচন করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। চসিকে বিএনপি মনোনীত সাবেক মেয়র এম মনজুর আলমকে নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। তাকে এনসিপি দলে ভিড়িয়ে মনোনয়ন দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তিনি বিএনপি থেকে পুনরায় মেয়র পদে মনোনয়ন চাইতে পারেন। এছাড়াও বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য শামসুল আলম, নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করসহ অনেকের নাম শোনা যাচ্ছে।
এদিকে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হতে চসিকের বিভিন্ন ওয়ার্ডে বিএনপি নেতাদের অনেকে পোস্টার সাঁটিয়েছেন। আলকরণ ওয়ার্ডে বিএনপি নেতা মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী মিন্টু, জামালখান ওয়ার্ডে সাহেদ বক্স, দেওয়ানবাজার ওয়ার্ডে আবদুল মান্নান, হেলাল চৌধুরী, ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ডে ইসমাঈল বালিসহ অনেকের পোস্টার দেখা গেছে।
জামালপুর: জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট ও দোয়া চাইছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। কেউ গণসংযোগ, কেউ উঠান বৈঠক আবার কেউ লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপি সমর্থিত নেতাকর্মীরাই সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীরাও প্রচার শুরু করেছেন। বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা ভোটারদের মন জোগাতে এলাকার উন্নয়ন, সড়ক সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মাদক ও সন্ত্রাস দমনসহ নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
পাবনা: বিএনপি ও জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীরা এলাকায় জনসংযোগ শুরু করেছেন। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত এ দুটি দলের নেতাদের ছবি সংবলিত পোস্টারে ছেয়ে গেছে। কেউ কেউ বড় বড় বিলবোর্ডও লাগিয়েছেন। জামায়াত ইতোমধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা ও পৌরসভায় তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে রয়েছেন-পাবনা পৌরসভায় মেয়র পদে মাওলানা আব্দুল গাফ্ফার খান, ঈশ্বরদী পৌরসভায় গোলাম আজম, সাঁথিয়ায় মোস্তফা কামাল মানিক, বেড়ায় মাওলানা আবু দাউদ, আটঘরিয়ায় মাওলানা সাইদুল ইসলাম মোল্লা, ফরিদপুর পৌরসভায় মো. মজিবুর রহমান ও সুজানগর পৌরসভায় ফারুক ই আজম।
চাঁদপুর ও হাজীগঞ্জ: হাজীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ, পৌর মেয়র ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচারণায় ব্যস্ত। তারা ব্যানার-পোস্টার ও গণসংযোগে সরগরম করে রেখেছেন মাঠ। একই উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে মোজাম্মেল হোসেন মজুমদার পরান, ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিএম কলিম উল্যাহ ও পৌর মেয়র পদে জাকির মজুমদারের নাম ঘোষণা করেছে জামায়াত। তবে হাইমচর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম শফিক জানান, এ উপজেলায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারণা তেমন একটা নেই।
মাগুরা: বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেকে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রঙিন ব্যানার ও পোস্টার টানিয়েছেন। পাশাপাশি দলীয় নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সমর্থন আদায়ে দৌড়ঝাঁপ ও লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। মেয়র পদে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাসান ইমাম সুজা, আলমগীর হোসেন, পৌর বিএনপির সভাপতি মাসুদ হাসান খান কিজিল, বিএনপি নেতা মুন্সী মঞ্জুরুল হাসান পিংকু এবং জেলা যুবদল সভাপতি অ্যাডভোকেট ওয়াসিকুর রহমান কল্লোল প্রচারণা চালাচ্ছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। প্রার্থীরা সাধারণ ভোটারদের সমর্থন পেতে বাড়ি বাড়ি যোগাযোগ, পাড়া-মহল্লায় মতবিনিময় সভা এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামী থেকে মেয়র পদে মাসুদুল আলমকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
কালের কণ্ঠ
‘যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে ধাক্কা’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় ধাক্কা লেগেছে। দেশটির ‘রিসিপ্রোকাল’ শুল্কনীতির প্রভাবই এই রপ্তানি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এর বাইরেও দেশটিতে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়া, উচ্চ সুদের হার ও বৈশ্বিক নানা কারণকেও এই রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধারায় আঘাত লাগার কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে। তথ্য-উপাত্ত বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে উল্লেখযোগ্য ধীরগতি দেখা গেছে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে।
বাংলাদেশের প্রতিযোগী ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো দেশ পোশাক রপ্তানিতে স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখলেও বাংলাদেশের এভাবে কমে যাওয়া খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাবিয়ে তুলছে। শুধু যে রপ্তানি কমছে তাই নয়, আরো উদ্বেগের বিষয় হলো দেশটিতে ক্রেতারা বাংলাদেশি পোশাকের দামও কম দিচ্ছেন—যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের দপ্তরের (অটেক্সা) সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৈশ্বিক বাণিজ্যে এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। মার্কিন পাল্টা শুল্ক, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানিসংকট এবং দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে রপ্তানি খাতের ওপর চাপ বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। ওই বাজারে রপ্তানি কমে গেলে দেশের পোশাকশিল্প সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরই মধ্যে অনেক বৈশ্বিক ক্রেতা অর্ডার কমিয়েছেন। পণ্যের দামের ওপর চাপ বাড়ছে। ক্রেতারা এখন বড় অর্ডারের বদলে ছোট ও স্বল্পমেয়াদি অর্ডারে ঝুঁকছেন। সামনে আরো কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।’
মার্কিন সংস্থা অটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি ছিল ৫৯৯ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭.৮০ শতাংশ কম। জানুয়ারি-মার্চ সময়ে দেশটির মোট আমদানি কমে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭৭৩ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ১১.৬৩ শতাংশ কম। বাংলাদেশ থেকে মার্চ ২০২৬-এ যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৬৬ কোটি ৪৯ লাখ ডলার, যা মার্চ ২০২৫-এর তুলনায় ৮.০৮ শতাংশ কম।
জানুয়ারি-মার্চ সময়ে রপ্তানি কমেছে ৮.৩৮ শতাংশ, মোট আয় দাঁড়িয়েছে ২০৪ কোটি ডলারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা চাহিদা হ্রাস, উচ্চ সুদের হার এবং আমদানি ব্যয়ের অনিশ্চয়তা বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্যে চাপ সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি নতুন ট্যারিফ নীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খলের জটিলতাও আমদানি প্রবাহকে প্রভাবিত করছে।
প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনাম তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। মার্চে দেশটির রপ্তানি ২.৫২ শতাংশ এবং জানুয়ারি-মার্চ সময়ে ২.৭৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে কম্বোডিয়ার প্রবৃদ্ধি আরো শক্তিশালী—মার্চে ১৬.২২ শতাংশ এবং প্রথম প্রান্তিকে ১৭.৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে চীনের রপ্তানি বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে। মার্চে ৩৭.২৪ শতাংশ এবং জানুয়ারি-মার্চ সময়ে ৫২.৯১ শতাংশ কমেছে। ভারতের ক্ষেত্রেও রপ্তানি কমেছে ২৭ শতাংশের বেশি।
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রথম পাতার খবর ‘আইএমএফের আপত্তি সত্ত্বেও ভর্তুকি বাড়াচ্ছে সরকার’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভর্তুকি কমাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপ থাকলেও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব মোকাবিলায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনার পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফের সঙ্গে ঋণচুক্তির সময় ভর্তুকি কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রতিবছরই এ খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ বাবদ মূল বরাদ্দ ছিল এক লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে তা বাড়িয়ে এক লাখ ১৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে এ বরাদ্দ কমিয়ে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা করা হয়। সেই হিসাবে সংশোধিত বাজেটের তুলনায় আগামী বাজেটে বরাদ্দ বাড়ছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নেও অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রয়োজন হবে।
২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়ার পর উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিভিন্ন খাতে বেশি ভর্তুকি দেওয়া কঠিন হবে। যদিও এলডিসি উত্তরণে আরও তিন বছর সময় চেয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমানোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে জোরালো পরামর্শ দিয়ে আসছে আইএমএফ।
গত মাসে অনুষ্ঠিত আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার-সংক্রান্ত সমন্বয় কাউন্সিল ও সম্পদ কমিটির বৈঠকে এসব অঙ্ক চূড়ান্ত করা হয়। একই বৈঠকে ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার যৌক্তিকীকরণ নিয়ে আইএমএফের আপত্তি নিয়েও আলোচনা হয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করে আইএমএফ। পরে ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৫৫০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ঋণ পাওয়ার শর্ত হিসেবে বাংলাদেশ ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয়। এর অংশ হিসেবে জ্বালানি তেলের দাম বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নির্ধারণ শুরু হয় এবং ভর্তুকি কিছুটা কমানো সম্ভব হয়। তবে বিদ্যুৎ খাতে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এখনই এসব খাতে ভর্তুকি কমানো সম্ভব নয়। এ বিষয়গুলো নিয়ে আইএমএফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
আগামী অর্থবছরেও সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে। এ খাতে ভর্তুকি বাবদ ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি বাজেটেও একই পরিমাণ বরাদ্দ ছিল। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৩৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র যুক্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ আরও বাড়বে বলে সম্প্রতি অর্থ বিভাগকে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
ইত্তেফাক
‘সরকারি তথ্যেই হামে প্রাণ গেছে ৪০৯ শিশুর’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, হামের সংক্রমণ এবং মৃত্যু বেড়েই চলেছে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সরকারি তথ্যেই হাম ও উপসর্গে প্রাণ গেছে ৪০৯ শিশুর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু কমতে আর দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে। তারা বলেছেন, সারা বিশ্বেই হাম বেড়েছে, তবে বাংলাদেশের মতো এত শিশুর মৃত্যু কোথাও হয়নি। বিশেষজ্ঞরা হামের এই প্রাদুর্ভাবের কারণ হিসেবে শিশুকে এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিড না করানো, সময়মতো টিকা না দেওয়া, ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন না হওয়া, পুষ্টিহীনতা এবং সর্বোপরি শিশুর রোগ প্রতিরোধে ঘাটতিকে দায়ী করেন।
সংক্রমণ চিত্র:
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, নিশ্চিত হামে এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৬৫ শিশুর। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে এ পর্যন্ত ৩৪৪ জনের। হাম ও এ রোগের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০৯ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ১১ শিশুর। মৃত্যু হওয়া ১১ শিশুর মধ্যে ৪ শিশুর নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে এবং বাকি ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে। গতকাল শনিবার সকাল ৮টা থেকে রবিবার সকাল ৮টা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো হামবিষয়ক প্রেস বিজ্ঞপ্তি থেকে এসব তথ্য জানা যায়। বিজ্ঞপ্তিতে আরো উল্লেখ করা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে আরো ১৫০৩ জন। এসময়ের মধ্যে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ২০৫ শিশুর শরীরে। অর্থাত্, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৭০৮ শিশু। নিশ্চিত হামে ঢাকায় ৩ শিশু ও বরিশালে ১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হামের উপসর্গে ঢাকায় ৩, চট্টগ্রামে ২ ও সিলেটে ২ শিশু মারা গেছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৪৯ হাজার ১৫৯ শিশুর। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৪ হাজার ৯০৯ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে ৩০ হাজার ৮৬২ শিশু। গত ১৫ মার্চ থেকে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ৮১৯ জন।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পেডিয়াট্রিক ইনফেকশন ডিজিজের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম বলেন, করোনা মহামারিজনিত টিকাদান কার্যক্রম বিঘ্নের কারণে সৃষ্ট রোগ প্রতিরোধ ঘাটতি (ইমিউনিটি গ্যাপ) হামের সংক্রমণ বাড়ার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে নিউমোনিয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, কোনো এলাকায় টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের ‘হার্ড ইমিউনিটি’ সীমার নিচে নেমে গেলে সেখানে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। হাম মোকাবিলায় ব্যবস্থাপনা কৌশলের অংশ হিসেবে আক্রান্ত শিশুর জন্য বাধ্যতামূলক ভিটামিন ‘এ’ নিশ্চিত করা জরুরি। মির্জা জিয়াউল বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুর অন্যতম কারণ নিউমোনিয়া। পাশাপাশি শিশুর শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অতিরিক্ত জ্বর, খেতে না পারা কিংবা তীব্র ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান—(আইইডিসিআর)-এর প্রধান উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সারা বিশ্বে হামের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো এত মৃত্যুহার বাড়েনি। দেশের চলমান হামের প্রাদুর্ভাব আরো এক থেকে দুই মাস থাকবে। তবে মুশকিল হলো, পরিত্রাণের পর আমরা আবার হাম মোকাবিলার কথা ভুলে যাব।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে বলেন, সারা দেশে শিশুদের প্রথম ছয় মাস মায়ের বুকের দুধ খাওয়ার প্রবণতা কমে গেছে। ছয় মাস শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত ভ্যাকসিন দিতে হবে। সেই সঙ্গে শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রথম পাতার খবর ‘আ’লীগের পুনর্বাসন নিয়ে কোনো চাপে নতি স্বীকার করবে না সরকার’। প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আঞ্চলিক কূটনীতিতেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে- কোনো বিদেশী চাপ, বিশেষ করে ভারতের দিক থেকে, এই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে কি না। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কোনো ধরনের বহিরাগত চাপের কাছে নতি স্বীকার করার প্রশ্নই আসে না; রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কেবল দেশের সংবিধান, আইন এবং জনগণের স্বার্থের ভিত্তিতেই নেয়া হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পুনর্বাসন বিতর্ক মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণের ফল। একটি বড় রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ ভূমিকা, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন- এসব বিষয় নিয়েই আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি অংশ মনে করে, বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের জন্য উপযুক্ত নয়। অন্য দিকে ফ্যাসিবাদের সমালোচকদের যুক্তি, অতীত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং জনমতের প্রতিফলন বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যারা রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস ও ফ্যাসিবাদ কায়েমের জন্য অভিযুক্ত তাদের আইনের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহের বাইরে গিয়ে পুনর্বাসনের সুযোগ নেই।
আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনে ভারতীয় চাপের প্রসঙ্গটি সাধারণত দুই দেশের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে আলোচিত হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সহযোগিতা রয়েছে। ফলে যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন আঞ্চলিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হয়। তবে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের প্রভাব নেই এবং থাকবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিতর্কের মূল বিষয় হলো স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি। যদি কোনো রাজনৈতিক দলকে ভবিষ্যতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হয়, তবে তা আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই হতে হবে। একই সাথে জাতীয় ঐক্য, আইনশৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশী বিনিয়োগ, রফতানি প্রবৃদ্ধি এবং জ্বালানি খাতে রূপান্তরের জন্য একটি পূর্বানুমেয় রাজনৈতিক পরিবেশ দরকার। তাই সরকারের ওপর চাপের ধারণা নয়; বরং নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতার ওপরই জোর দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। সার্বিক বিবেচনায়, আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন বিতর্ক কেবল একটি দলীয় ইস্যু নয়; এটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকার যেহেতু বহিরাগত চাপের বিষয়টি অস্বীকার করছে, তাই আগামী দিনে সিদ্ধান্তগুলো কিভাবে সাংবিধানিক কাঠামো ও জনমতের ভিত্তিতে অগ্রসর হয়, সেটিই মূল পর্যবেক্ষণের বিষয় হবে।
এ দিকে আওয়ামী লীগের ‘পুনর্বাসন’ বিতর্ক এখন আর কেবল দেশীয় আলোচনার বিষয় নয়; এটি এখন ওয়াশিংটন থেকে দিল্লি এবং বেইজিং থেকে রিয়াদ পর্যন্ত বিস্তৃত এক জটিল কূটনৈতিক দাবার চালে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে বিজেপির রাজনৈতিক আধিপত্য এই সমীকরণকে আরো সংবেদনশীল করে তুলেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গত দুই বছরে এক আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান কেবল অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যই পরিবর্তন করেনি; বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় ও বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে ভারত দীর্ঘকাল পরিচিত। দিল্লির কাছে আওয়ামী লীগ ছিল একটি ‘প্রেডিক্টেবল’ বা নির্ভরযোগ্য শক্তি, যারা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে নজিরবিহীন সহযোগিতা করেছে।
বণিক বার্তা
‘ডুবে যাওয়া ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধারে গ্রিসকে অনুসরণ করতে পারে বাংলাদেশ’-এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ২০০৮ সাল-পরবর্তী সময়ে এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছিল গ্রিস। দেশটির সেই বিপর্যয়কে বিশ্বের গত অর্ধশতকের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পুরো ইউরোজোনকে নাড়িয়ে দেয়া এ সংকটে গ্রিসের প্রায় সব ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল। গ্রিসজুড়ে ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেয়ার হিড়িক পড়েছিল। গ্রাহকের অর্থ উত্তোলনের চাপ সামাল দিতে না পেরে দেশটির বেশির ভাগ এটিএম বুথ বন্ধ করে দেয়া হয়। এক সময় খেলাপি ঋণ পৌঁছায় ৪৯ শতাংশে। বিপর্যস্ত গ্রিসের সেই ব্যাংক খাত আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দেশটির ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার নেমে এসেছে মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশে। আর শক্তিশালী ব্যাংকের ওপর ভর করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে গ্রিসের অর্থনীতিও।
ব্যাংক খাতে গ্রিস গত এক দশকে আমূল সংস্কার বাস্তবায়ন করেছে। সংকট শুরুর সময় ২০০৮ সালে দেশটিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৬৪। অর্থনীতিকে টেনে তোলা ও সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে ব্যাংকের সংখ্যা এখন মাত্র চারটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। বৃহৎ এ ব্যাংকগুলোকে মূলধন জোগান দেয়া হয়। অন্য ব্যাংকগুলো হয় বন্ধ করে দেয়া হয়, নয়তো পুনর্মূলধনীকরণের পর বড় চার ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সংস্কার কার্যক্রমে ব্যাংকগুলোকে মূলধন জোগান দেয়া হয় প্রায় ৫০ বিলিয়ন ইউরো; বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ইউরো ১৪৫ টাকা হিসাবে)। গ্রিস সরকার ও ইউরোপীয় তহবিল থেকে এ অর্থের জোগান দেয়া হয়।
অবশ্য কেবল মূলধন জোগানই নয়, হেলেনিক অ্যাসেট প্রটেকশন স্কিমের (এইচএপিএস) আওতায় ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ব্যাংক পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে গ্রিস। ‘হারকিউলিস’ নামে পরিচিত রাষ্ট্রীয় এ গ্যারান্টি স্কিমের আওতায় প্রায় ৫৭ বিলিয়ন ইউরোর খেলাপি ঋণ সিকিউরিটাইজ করে ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিংয়ে উন্নতির পাশাপাশি গ্রিস এ মুহূর্তে পুরো ইউরোপের অন্যতম বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।
গ্রিসের মতো দেউলিয়াত্বের মুখোমুখি না হলেও কয়েক বছর ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি, প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ না হওয়া, সরকারের ঋণ ও ঋণের সুদ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্বসহ বিভিন্ন সংকটের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেয়ার পর এসব সংকট বর্তমান সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আরো খারাপ পরিস্থিতি দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে। দেশের ৬২টি ব্যাংকের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই এখন দুর্বল। এর মধ্যে এক ডজন ব্যাংক গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। মূলধন ঘাটতিতে পড়া ব্যাংকের সংখ্যা ঠেকেছে ২৪-এ। আর পুরো ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে। অবশ্য গত বছরের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের এ হার ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
ব্যাংকের চেয়ে আরো খারাপ পরিস্থিতিতে আছে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০টিরও বেশি এখন অস্তিত্ব সংকটে। এর মধ্যে নয়টি প্রতিষ্ঠান বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এগুলোর কোনো কোনোটির ৯৯ শতাংশ ঋণই এখন খেলাপি। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গড় খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ১১ শতাংশে। দেশের ৮২টি বীমা কোম্পানির এক-তৃতীয়াংশের অবস্থাও নাজুক।
অর্থনৈতিক মন্দা ও ব্যাংক খাতের সংকট উত্তরণে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পথ খুঁজছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংক খাত সংস্কারে কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও সেগুলোর সফল সমাপ্তি হয়নি। বরং শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, তা এখন ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আর পুনঃতফসিল ও নীতিসহায়তা দিয়ে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার যে চেষ্টা হচ্ছে, সেটিও টেকসই সমাধান নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যাংক নির্বাহীসহ খাতসংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও ব্যাংক খাত সংস্কারে গ্রিসের মডেল অনুসরণ করতে পারে বাংলাদেশ। বিভিন্ন সময় গ্রিসের মতো সংকটে পড়েছিল এশিয়া, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার অনেক দেশ। তবে সংকটের উত্তরণ ঘটিয়ে দেশগুলো একসময় সমৃদ্ধির পথে এগিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সংকট উত্তরণের প্রাথমিক পর্যায়েই ঘুরপাক খাচ্ছে।
দেশ রূপান্তর
‘সৌরবিদ্যুতে হঠাৎ বাড়াবাড়ি’-এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। সাধারণ মানুষ বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার খেলায় নাজেহাল হয়ে ওঠে। দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও জ্বালানির অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হয়। সরকারের তরফ থেকে তড়িঘড়ি ঘোষণা আসে আগামী চার বছরে নতুন করে ১০ হাজার মেগাওয়াট বা ১০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবিষ্যৎ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অবশ্যই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু এখন যে কেন্দ্রগুলো রয়েছে তার সঙ্গে সমন্বয় করে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। এমনটি না করা হলে জীবাশ্ম জ্বালানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দাম যোগ হয়ে বিদ্যুৎ খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির চাপ সৃষ্টি হবে। এমনকি আমাদের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা আদৌ এই বিদ্যুতের প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারবে কি না পরিকল্পনায় সেই বিবেচনাও করা হয়নি।
পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান ২০১০ অনুযায়ী দেশে ৭ ভাগ জিডিপি প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়। তবে করোনা মহামারী এবং নানা কারণে ৭ ভাগ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়নি। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগ ৭ ভাগ প্রবৃদ্ধি ধরে কেন্দ্র নির্মাণ করায় দেশে চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ ক্ষমতার কেন্দ্র নির্মাণ হয়েছে। একই সঙ্গে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক এবং প্রতিবেশী দেশের অনেক কোম্পানিকে পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যানের বাইরে সুযোগ দিতে গিয়ে কিছু বড় কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে। এরপর পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান ২০১৬ এবং সমন্বিত জ্বালানি এবং বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা ২০২৩ প্রণয়ন করে। সবশেষ পরিকল্পনায় দেখা যায় সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে নেট জিরো পরিকল্পনা ২০৫০ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াতে কার্বন নির্গমনের হার শূন্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করে।
সেই পরিকল্পনায় দেখা যায় ১৬ গিগাওয়াটের সোলার পার্ক স্থাপনের পাশাপাশি সোলার সেচ প্রকল্প থেকে ৬ গিগাওয়াট এবং সোলার রুফটপ থেকে আরও ১২ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা। যদিও এই পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সন্দেহ রয়েছে। এর মধ্যে সম্প্রতি নতুন সরকার ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছে। এমনিতেই দেশে অন্তত ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকে। এর সঙ্গে আরও ১০ হাজার মেগাওয়াট কেন্দ্র যোগ হলে অলস কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়বে।
১০ হাজার মেগাওয়াটের বিপুল ব্যয়
প্রতি এক মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয় এখন ৯ কোটি টাকার মতো। সেই হিসাবে ১০ হাজার মেগাওয়াটের নির্মাণ ব্যয় দাঁড়াবে ৯০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ক্যাবল, স্ট্রাকচার, বিদ্যুতের গ্রিড লাইনের যন্ত্রাংশ এবং সাবস্টেশন বাবদ অন্তত ৮০ ভাগ খরচ হয়। যার পুরোটাই বৈদেশিক মুদ্রায় করতে হয়। সেই হিসাবে ৭২ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন হবে। এখনকার বাজারদর প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে হিসাব করলে ৫৮৫ কোটি ডলার বা ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হবে। চার বছরের হিসাবে প্রতি বছর বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াবে এক দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। দেশি-বিদেশি মুদ্রা মিলিয়ে প্রতি বছর কেবল সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি খাত মিলিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে এত বিপুল বিনিয়োগের কোনো রেকর্ড অতীতে নেই। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানানো হলে সৌরবিদ্যুতের দাম পরিশোধ করতে হবে ডলারে। সে ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও দর পরিশোধে ডলারের বাজার অস্থির হবে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০০৮ সালে যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি করা হয় তখন ৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু প্রায় ১৮ বছরে সরকার এক হাজার মেগাওয়াট গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে পেরেছে। কাজেই যারা ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন তারাও বিষয়টি বিশ্বাস করে করছেন বলে মনে হয় না। তবে এটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে খুব জুতসই বলে মনে করেন তিনি।
