এ এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা

পরিতোষ পাল, কলকাতা থেকে

প্রথম পাতা ২৩ মার্চ ২০২০, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:০৮

যুদ্ধের সময়কার কারফিউ বা ব্ল্যাক আউটের তেমন ভয়াবহ কোনো অভিজ্ঞতা আমার নেই। তেমনি উপদ্রুত এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবে ঘরবন্দি রাখার জন্য জারি করা কারফিউ অভিজ্ঞতাও আমার নেই। একমাত্র রাজনৈতিক দলের বন্‌ধের সঙ্গে খানিকটা পরিচয় রয়েছে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে গতকাল জীবনে এই প্রথম এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলাম। শহরে থেকেও এক অদ্ভুত স্তব্ধতার সাক্ষী রইলাম। ভোরের আলো ফোটার আগে থেকে যে শহরে কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয়ে যায় সেই শহরকে এদিন নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছিল। আমিও বসে বসে উপলব্ধি করছিলাম শব্দহীনতার শূন্যতাকে। জন-কোলাহলের ফলে যে পাখির কলতান এতদিন ঠিকমতো শুনতে পাইনি এদিন যেন সেই পাখীকুল আনন্দে চারিদিক ভরিয়ে দিয়েছিল।
সকালের যে প্রথম ট্রামটি ঘণ্টা বাজিয়ে সকলকে জানিয়ে দিতো ভোর হয়েছে, শুরু হয়েছে জনজীবনের প্রাত্যহিক চঞ্চলতা, সেও এদিন ঘণ্টা বাজায়নি। ভোরের ফাঁকা রাস্তা দিয়ে ছুটে যায়নি কোনো বাসও।

প্রতিদিন যে খবরের কাগজের হকার বাড়ির বেল টিপে তিনতলা-চারতলায় কাগজ পৌঁছে দিতো তারাও এদিন বাড়ির দরজায় এসে কাগজ পৌঁছে দেয়নি। অবশ্য আগের দিনই জানিয়ে গিয়েছিল সে কথাটা। সকালের পার্কে এদিন দেখা যায়নি স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের প্রাতঃভ্রমণ ও শারীরিক কসরতের কোনো দৃশ্য। হঠাৎ করে শহরের পথঘাট-পার্ক-বাজার এমনভাবে মানুষ-শূূন্য হয়ে পড়েছিল তা আগে কখনো দেখা যাযনি। গতকাল ভোর থেকে কলকাতাসহ ভারতেই জনশূন্য চেহারা হার মানিয়েছিল যেকোনো ধর্মঘটের ব্যাপকতাকেও। কোনো বাড়ি বা আবাসনের মধ্য থেকেও এদিন শোনা যায়নি উচ্চগ্রামে কোনো আলাপচারিতা। সকলেই ছিলেন গৃহবন্দি। অবশ্যই স্বেচ্ছায়। তবে খবরের কাগজের শূন্যতা পূরণ করতে সকাল থেকেই খোলা ছিল টিভি। আর মোবাইলের মাধ্যমে চলেছে একে অপরের খোঁজখবর।

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার অভ্যাস তৈরির প্রয়োজনে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর জনতার কারফিউর প্রতি সমর্থন জানিয়ে মানুষ যেভাবে ভোর থেকেই নিজেদের স্বেচ্ছায় ঘরবন্দি রেখেছেন তা এক নজির হয়ে রইল। করোনা সংক্রমণ যেভাবে প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সেখানে এর মোকাবিলায় সামাজিক দূরত্বের যে কোনো বিকল্প নেই সেই বোধটাই এদিনের স্বেচ্ছায় ঘরবন্দি থাকার মনোভাবে স্পষ্ট হয়েছে। কারও কোনো অভিযোগ ছিল না এই ঘরবন্দি থাকা নিয়ে।

এদিন শহরে কোনো বাজারই খোলেনি। দু-একটি দোকান খুললেও মানুষের আসা যাওয়া ছিল না। শহরে সরকারি বাস তথা গণপরিবহন সামান্য সংখ্যায় চলেছে ঠিকই। কিন্তু তাতে ছিল না কোনো যাত্রী। একইভাবে শিয়ালদহ বা হাওড়া স্টেশনের মতো ব্যস্ত স্টেশনে যাত্রীর কোনো দেখা পাওয়া যায়নি। ট্রেন চলেছে হাতেগোনা কয়েকটি। বাকি সব বাতিল। অন্যদিকে মেট্রো বা পাতাল ট্রেন অর্ধেকের কম চলেছে। তাতেও এদিন যাত্রী ছিল না। বাস টার্মিনালগুলোতে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল বেসরকারি বাস মিনিবাস। শহরের ব্যস্ততম এলাকা ও রাস্তার ক্রসিংগুলোতে একমাত্র ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি ছাড়া অন্য কারো দেখা পাওয়া যায়নি। অবশ্য বিমানবন্দরে এদিন থেকে আন্তর্জাতিক উড়ানো বন্ধ করে দেয়া হলেও এদিন সকালে একটি উড়ান এসেছিল কাতার থেকে। বিমানের আড়াইশোর বেশি যাত্রীর শারীরিক পরীক্ষার পর তাদের সরকারিভাবে বাসে করে নিয়ে গিয়ে রাখা হয়েছে রাজারহাটের কোয়ারেন্টিন সেন্টারে।

অবশ্য জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্তরা এদিনও নিবেদিত প্রাণে কাজ করে গিয়েছেন। চালু ছিল হাসপাতালসহ সব জরুরি পরিষেবা। চিকিৎসক, পুলিশ, পুরসভার জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মী থেকে শুরু করে মিডিয়া কর্মীদের অকুতোভয় ভূমিকার জন্য প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে মানুষ এদিন বিকাল ৫টায় অভিনন্দন জানিয়েছেন কাশর-ঘণ্টা, থালা বাজিয়ে এবং হাততালি দিয়ে।

গতকালকের এই জনতা কারফিউ পালনের মধ্য দিয়ে আমরা আগামীদিনের শাটডাউনের অভ্যাসটাই রপ্ত করে নিলাম। যার খুবই প্রয়োজন ছিল। অনেকে অবশ্য বলছেন, আরো আগে হলে ভালো হতো। সংক্রমণের শৃঙ্খলকে (চেইন) তাহলে আগেই ভেঙে দেয়া সম্ভব হতো।

আপনার মতামত দিন



প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

‘লকডাউন’

২৭ মার্চ ২০২০

ছুটির নোটিশ

২৬ মার্চ ২০২০

আজ ২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে মানবজমিন-এর সকল বিভাগ বন্ধ থাকবে। তবে ...



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত