স্যালুট দিলো না আমাকে(দ্বিতীয় পর্ব)

বই থেকে নেয়া ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৫:২৮

মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম ছয়বারের সংসদ সদস্য। মন্ত্রী ছিলেন ২ বার। তাঁর সদ্য প্রকাশিত আত্মজৈবনিক বই ‘সৈনিক জীবন গৌরবের একাত্তর রক্তাক্ত পঁচাত্তর'। 

প্রথমা থেকে প্রকাশিত বইটিতে তিনি লিখেছেন,
একাত্তরের ফেব্রুয়ারির শেষ ভাগে সেনাবাহিনী দলের হয়ে জাতীয় ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য পাঞ্জাবের মুলতান শহরে পৌঁছালাম। আমি ও ক্যাপ্টেন মাহমুদ হাসান ল্যান্সারের অফিসার্স মেসে অবস্থান করি। মার্চের প্রথম সপ্তাহে প্রতিযোগিতা শুরু হলো। প্রতিযোগিতায় সেমিফাইনালে আমরা পরাজিত হয়ে বিদায় নিই। ১৪ মার্চ তারিখে সব খেলোয়াড়কে নিজ ইউনিটে ফিরে যাওয়ার জন্য সেনা কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দেয়।
ইতিমধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে, কিন্তু মুলতানে এর কোনো উত্তাপ অনুভূত হয়নি। বাঙালি অফিসাররা রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কারও সঠিক ধারণা ছিল না।
সেনাবাহিনীতে রাজনৈতিক আলোচনা নিষিদ্ধ, কিন্তু তবু মাঝে-মধ্যে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানিদের মধ্যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হতো।
ইতিমধ্যে একটি ভারতীয় বিমান ছিনতাই হওয়ার কারণে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটে। ভারত তার ভূখ-ের ওপর দিয়ে পাকিস্তানি বিমান উড্ডয়ন নিষিদ্ধ করে দেয়। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ঢাকাগামী বিমানের টিকিট পাওয়া কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুলতানের কোর কমান্ডার লে. জেনারেল ওয়াসি উদ্দিনের এডিসি পদে কর্মরত ছিলেন আমাদের পল্টনের ক্যাপ্টেন সানোয়ার হুদা। তাঁর সহযোগিতায় লাহোর-ঢাকা রুটে বিমানের একটি সিট পেলাম। ১৬ই মার্চ ’৭১ দুপুরে ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করি। প্রায় এক মাস পশ্চিম পাকিস্তানে থাকার কারণে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমি মোটেই অবহিত ছিলাম না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে ছাত্র সমাবেশে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন, ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ইত্যাদি সম্পর্কে কিছুই জানা সম্ভব ছিল না পশ্চিম পাকিস্তানে।
ঢাকা বিমানবন্দরের পরিস্থিতি উত্তপ্ত বলে মনে হলো। এয়ারপোর্টে শত শত বিহারি গাঁট্টি-বোঁচকা, পরিবার-পরিজন নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য কয়েকদিন ধরে অপেক্ষা করছে। সেনাবাহিনীর জওয়ানেরা উদ্যত সঙিন নিয়ে তাদের পাহারা দিচ্ছে, বাঙালি পেলেই দুর্ব্যবহার করছে। আমাদের পল্টনের ক্যাপ্টেন মনসুর ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গোয়েন্দা বিভাগে কর্মরত। তার মেসে রাত কাটানোর ইচ্ছা ছিল। কোনো গাড়ি পাওয়ার আশায় ইতিউতি তাকাচ্ছি ব্যাগেজ সংগ্রহ করার পর। পাশ দিয়ে যাচ্ছিল পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একজন হাবিলদার, ডিউটি এনসিও ব্যাজ লাগানো। আমি তাকে ফৌজি স্টাইলে ডাকলাম, ‘হাওলাদার, ইধার আও (এদিকে এসো)।’ আমার পরনে সিভিল পোশাক। সে কাছে আসার পর আমার পরিচয় দিলাম। সে স্যালুট করা তো দূরের কথা, আমার প্রতি ক্রুব্ধ দৃষ্টি হেনে অন্যদিকে চলে গেল কথার কোনো জবাব না দিয়েই। এ সময় উদয় হলো পাঞ্জাব রেজিমেন্টের উর্দি পরা এক লেফটেন্যান্ট। মনে হলো পিএমএতে তাকে দেখেছি। সে আমাকে স্যালুট করে বললো, ‘স্যার, আপনি আমাদের বিএসইউও ছিলেন। কী করতে পারি আমি?’ হাবিলদারের ব্যবহারে তখন আমার গা জ্বলছে। পাকিস্তান আর্মিতে এ তো অকল্পনীয়।
‘আগে তোমার এনসিওর ডিসিপ্লিন ঠিক করো,’ বললাম আমি।
‘সরি স্যার, আমি বিষয়টি দেখছি।’ পাঞ্জাবি লেফটেন্যান্ট বললো।
‘থ্যাঙ্কস, সি ইউ’, বলে চলে এলাম।
দুই পা এগোতেই আমার কাছে দ্রুত পদক্ষেপে চলে আসে ২য় ইস্ট বেঙ্গলের ডিউটি এনসিও। সে ঘটনাটি দূর থেকে দেখেছে বলে মনে হলো।
উত্তেজিত স্বরে আমাকে বলে, ‘স্যার, দেশের অবস্থা ভালো নয়। পাইয়াদের (পাঞ্জাবি) সঙ্গে কথা না বলাই ভালো, সময় খারাপ। আমার সঙ্গে গাড়ি আছে। আপনি কোথায় যাবেন?
এক মাস দেশের বাইরে থাকায় উত্তপ্ত পরিস্থিতির কিছুই জানি না। চট্টগ্রামে, উত্তরবঙ্গে ইতিমধ্যে বাঙালি-বিহারি ছোটখাটো দাঙ্গা চলছে। পাঞ্জাবি সৈনিকেরা বিহারি কলোনিতে পাহারা বসিয়েছে বলে আমাকে জানাল বাঙালি হাবিলদার। আমি ক্যান্টনমেন্টে যাওয়ার প্রোগ্রাম বাতিল করে তাকে বললাম আমাকে কমলাপুর রেলস্টেশনে নামিয়ে দেয়ার জন্য।
‘অবশ্যই স্যার, চলুন,’ এনসিও বললো।
রাস্তায় যানবাহন কম। সবকিছু কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। ফার্মগেট এলাকয় দেখলাম ছাত্ররা চেকপোস্ট বসিয়ে এয়ারপোর্টগামী বিহারিদের গাড়ি, বাক্সপ্যাটরা ইত্যাদি তল্লাশি করছে। সেনানিবাস এলাকার বাইরে ছাত্রদের শাসন চলছে বলে ধারণা হলো।
কমলাপুরে এসে রাতের ট্রেনে চেপে সকালে যশোর রেলস্টেশনে পৌঁছালাম। পল্টনে খবর দিতে পারিনি। কোনো গাড়িও আসেনি আমাকে নেয়ার জন্য। অটোরিকশাওয়ালারা ক্যান্টনমেন্ট যেতে চাচ্ছে না। তাদের চোখেমুখে আতঙ্ক। অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে একজন অটোচালককে রাজি করিয়ে ক্যান্টনমেন্টে রওনা দিলাম। ক্যান্টনমেন্টের প্রবেশপথে শানতলায় একটি চেকপোস্ট বসিয়েছে ২৫ বালুচ। সেন্ট্রি মেশিনগান তাক করে ইশারায় থামাল আমার অটোরিকশা। আমি পরিচয় দিলাম, বললাম, ১ম ইস্ট বেঙ্গলে যাচ্ছি। পরিচয় পাওয়ার পরও বালুচ সৈনিক কোনো সম্মান প্রদর্শন না করে বললো, ‘অটো ভেতরে যাবে না, নেমে যান।’
‘কেন যাবে না অটো?’ আমি রাগত স্বরে শুধালাম।
‘অর্ডার নেই, ব্যাস,’ রুক্ষভাবে জবাব দিলো এবং অটোচালকের প্রতি ক্রুদ্ধ দৃষ্টি হানলো।
আতঙ্কিত অটোচালক বললো, ‘স্যার, আমাকে ছেড়ে দিন। আমি স্যুটকেসসহ রাস্তায় নামতেই আতঙ্কিত অটোচালক ভাড়া না নিয়েই দ্রুত অটো চালিয়ে চলে গেল। আমি চেকপোস্টের ভেতরে ঢুকে ফিল্ড টেলিফোনে পল্টনে কল দিলাম গাড়ি পাঠাতে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে পল্টনের জিপ নিয়ে এলো দু’জন সশস্ত্র সৈনিক। জিপে উঠে অফিসার্স মেসে এলাম। জিপ ড্রাইভার বললো, ‘স্যার পাইয়ারা খুবই বাড়াবাড়ি করতাছে।’ আরও জানালো, যশোর কাঁচাবাজারে দোকানিরা পাঞ্জাবিদের কাছে শাকসবজি, মাছ-মাংস বিক্রয় করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আমাদের পল্টনের সৈনিকেরা সাদা পোশাকে বাজারে গিয়ে ওদের ইউনিটের জন্য বাজার নিয়ে আসে। শুনে অবাক হলাম বাঙালিদের এত ঘৃণা জমেছে পশ্চিম পাকিস্তানিদের ওপর।
৪ মেসে এসে দেখি সব রুম খালি। সিও লে. কর্নেল রেজাউল জলিল এবং টুআইসি মেজর ইকবাল কোরেশী ছাড়া পল্টনের সবাইকে সীমান্ত এলাকায় ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে দুই সপ্তাহ আগে। এ সময় আমাদের পল্টনে সৈনিকের সংখ্যা ছিল সাড়ে তিন শ’। একটি পদাতিক ব্যাটালিয়নে সাত শ’ সৈনিক থাকার কথা। আমাদের পল্টন জুন মাসে দুই বছরের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের শিয়ালকোটে যাওয়ার নির্দেশ পেয়েছে। এ কারণে সাড়ে তিন শ’ সৈনিক প্রি-এমবারকেশন ছুটি ভোগ করছিল। এরা ফিরে এলে বাকি সাড়ে তিন শ’ ছুটিতে যাবে।
পরদিন ১৮ মার্চ আমাকেও পাঠিয়ে দেয়া হলো পাকিস্তান-ভারত সীমান্তে। মহেশপুর থানার এক গ-গ্রামে এসে ‘এ’ কোম্পানির দায়িত্ব নিলাম। যুদ্ধবিদ্যার নানা কার্যক্রম, যেমন আক্রমণ, রেইড, অ্যামবুশ ইত্যাদির মহড়া চলছে দিবারাত্রিব্যাপী। পল্টনের সিও লে. কর্নেল জলিল অবস্থান করছেন যশোর সেনানিবাসে। সপ্তাহে একদিন এক্সারসাইজ এরিয়ায় এসে পরবর্তী ছয় দিনের প্রোগ্রাম দিয়ে, ঘণ্টা তিনেক থেকে ফিরে যান সেনানিবাসে। আমাদের সৈনিকদের জন্য রেডিও শোনা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে কী ঘটছে, এ সম্পর্কে আমাদের কিছুই জানা ছিল না। সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমরা দূরবর্তী সীমান্ত এলাকায় ট্রেনিংয়ে নিমগ্ন ছিলাম।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Zaglul Haider

২০২০-০৫-০৮ ০৪:০২:৩৭

Thanks, Major (Rtd.) Hafiz, I read it very attentively and find the story really interesting. It reflects the actual scenario of the then East Pakistan. It is a very reliable source of information for present and future researchers. I recommend the book to all readers.

মো: রফিকুল ইসলাম

২০২০-০৩-১২ ০৯:৫৯:০৬

একজন সৈনিক জীবনের বাস্তবিক জীবনি শুনে বেদনায় পরলেও তাঁর সাফল্যে আনন্দ লেগেছে। স্যার বিহারী বা বালুস সীলিউট দেয়নি বলে কি হয়েছে আমরা বাংলার মানুষতো আপনাকে সীলিউটের চেয়েও সম্মান দিয়ে ছয়বার এম.পি এবং দুইবার মন্ত্রী করা হয়েছে। ধন্যবাদ স্যার ধন্যবাদ।

Engr. M. Kamal

২০২০-০২-২৯ ১০:১৩:১১

Good Hafiz sab

আপনার মতামত দিন

বই থেকে নেয়া অন্যান্য খবর

বাংলাদেশ: ভবিষ্যত অভিযাত্রা-

জাতীয় অগ্রগতির পাঁচ দফা কর্মসূচি (প্রথম পর্ব)

২০ জুন ২০২০

তোমার আমার ঠিকানা থেকে

‘টেকড়ু’ শুনে পাঞ্জাবিরা হেসেছিল(প্রথম পর্ব)

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০



বই থেকে নেয়া সর্বাধিক পঠিত