ডায়েরির পাতায় শাহিনের বয়ান, জুঁই পরকীয়ায় আসক্ত
Monday, 16 August 2010
Sample Image
নূরুজ্জামান/হাফিজ উদ্দিন: পরপুরুষের সঙ্গে মোবাইল ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতো জুঁই। প্রতিবাদ করলে স্বামী ও শাশুড়ির গায়ে হাত তুলতো। কথায় কথায় হত্যার হুমকি দিতো।
মৃত্যুর আগে ডায়েরির পাতায় এসব নির্যাতনের কথা লিখে যান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক শাহ আলম শাহিন। শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে সাভারের ব্যাংক কলোনির বাসায় তাকে পিটিয়ে হত্যা করে স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস জুঁই, তার   পিতা নুরু মুন্সী ও ভাই সোহাগ। মৃত্যুর পর পুলিশ ওই বাসা থেকে শিক্ষকের ডায়েরিটি উদ্ধার করে। পারিবারিক ও ডায়েরি সূত্রে জানা যায়, জান্নাতুল ফেরদৌস জুঁই ছিল বেপরোয়া। টেনেটুনে পাস করেছিল এইচএসসি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মেধা ও যোগ্যতা কোনটিই ছিল না। তারপরও ভর্তি হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। এ সুযোগ তৈরি হয় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক  শাহিনকে বিয়ের পর। স্বামীর কোটায় ভর্তি হয়ে সেই স্বামীকেই নির্মমভাবে খুন করে জুঁই ও তার সহযোগীরা। শনিবার রাতে শিক্ষক শাহ আলম শাহিনের  লাশ সিরাজগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। ঘাতক স্ত্রী, শ্বশুর ও শ্যালকের শাস্তির দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছে। বাংলা বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানায়, জুঁই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও মনোযোগী ছিল না পড়াশোনায়। ঠিকমতো ক্লাসও করতো না। ক্লাসের নাম করে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতো। খুনের শিকার শাহিনের নিজ হাতের স্পষ্ট অক্ষরে ডায়েরির পাতায় পাতায়  লেখা রয়েছে স্ত্রীর নানা নির্যাতন, স্বেচ্ছাচার ও অনাচারের কাহিনী। সে ডায়েরি নিয়ে তোলপাড় চলছে। সাভার থানা পুলিশ মামলার আলামত হিসেবে তা জব্দ করেছে। সেখানে জুঁইয়ের পরকীয়ার সন্ধান পাওয়া গেছে। ডায়েরি সূত্রে জানা যায়, জুঁই পরকীয়ায় আসক্ত। স্বভাবে উচ্চাভিলাষী। তাই স্বামীর কাছ থেকে জোর করেই টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিতো। না পারলে চুরি করে টাকা নিয়ে বাইরে বের হতো। বাসায় থাকলে দরজা বন্ধ করে দিতো। স্বামীর অনুপস্থিতিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল ফোনে কথা বলতো। বাসায় ছিল অসুস্থ শাশুড়ি। তার সামনেই চলতো এসব অনাচার। প্রতিবাদ করলে অগ্নিমূর্তি ধারণ করতো। কথায় কথায় স্বামী ও শাশুড়ির গায়ে হাত তুলতো। হত্যার হুমকিও দিতো। মৃত্যুর আগে এসব নির্যাতন ও অনাচারের কথা  ‘জুঁইয়ের সমস্যা’ শিরোনামে ডায়েরির পাতায় লিখে যান প্রভাষক শাহিন। সেখানে জুতার নিচে পিষে মারার হুমকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া তার মাকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলেছে। রান্নার কথা বললে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠতো। বলতো, আমি কি কাজের মেয়ে?। তোর জন্য কেন চুলার ঘরে যাবো। কুশলাদি জিজ্ঞেস করলে বলতো, জানার দরকার  নেই। শাশুড়িকে কখনও মা বলে ডাকেনি। বরং তাকে উদ্দেশ্য করে বলতো, তুই তো জামাইয়ের ভাত খেতে পারিসনি। এজন্য আমার ঘরে জ্বালাতে এসেছিস। এ কথা বলেই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিতো।  চলাচল ছিল বেপরোয়া। যখন তখন বাসা থেকে বের হয়ে যেতো। কাউকে তোয়াক্কা করতো না। কথায় কথায় হাত তুলতো। এছাড়া ওষুধ আনার কথা বলে তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে বলে শাহিন তার ডায়েরিতে উল্লেখ করেছে।  এছাড়া দুপুর ১২ টার আগে ঘুম থেকে উঠতো না। কখনও সকালের খাবার তৈরি করতো না। কখনও তার মোবাইল ধরতে দিতো না। বাইরে থেকে তার মেবাইলে ফোন দিলে তা রিসিভ করতো না। শাহিনের মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ প্রতিবেদকের কাছে বলেন, খুনের আগের রাতে জুঁই তার স্বামীর সঙ্গে চরম প্রতারণা করে। সোহাগ করার কথা বলে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় বিষাক্ত পদার্থ লাগিয়ে দেয়। এতে তার ছেলে অবশ ও অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরের দিন সকালে জুঁই, তার পিতা ও ভাই মিলে তার ছেলেকে নির্মমভাবে খুন করে। তাকেও বেধড়ক পেটায়। নিহত শাহিন ছিলেন মেধাবী শিক্ষক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক্স বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করেন। তিন বছর আগে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অ্যান্ড কলেজের কম্পিউটার বিভাগের প্রভাষক পদে যোগ দেন।


 
< পূর্বে   পরে >




 

সর্বশেষ খবর