একটি জন্মদিন
Monday, 16 August 2010
সাযযাদ কাদির: ১৫ই আগস্ট শোক দিবসে বেগম খালেদা জিয়া’র জন্মদিন পালন নিয়ে এক বিশেষ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় প্রতি বছরই। বক্তৃতা বিবৃতি বিতর্ক হয় নানা রকম। শোক দিবসে ঘটা করে জন্মদিন পালন থেকে বিরত থাকার জন্য তাঁকে অনুরোধ করেন অনেকে। তাঁর এ জন্মদিন যে ভুয়া তা প্রমাণের চেষ্টা করেন কেউ কেউ। এ ব্যাপারে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের কথাও শুনেছি।
জন্মতারিখ নিয়ে একটা তৈরি করা সমস্যা আছে এ দেশের বেশির ভাগ নাগরিকেরই। আসল তারিখটাকে এড়িয়ে ম্যাটরিকুলেশন/এসএসসি পরীক্ষায় নিবন্ধিত হওয়ার সময় অন্য একটা তারিখ লিখে দেয়া হয় ফরমে। সেখানে কমিয়ে লেখা হয় বয়সের হিসাব। এটা করা হয় ভবিষ্যতের চাকরিজীবনকে কিছুটা দীর্ঘ করার আশায়। এ কাজটি করেন অভিভাবক বা স্কুলের শিক্ষক। ওই তারিখটিকে বলা হয় ‘সারটিফিকেটের তারিখ’। এ তারিখটিই শেষ পর্যন্ত কর্মজীবনে, পাসপোর্টে, ভোটার তালিকায়, পরিচয়পত্রে ও আরও অনেক ক্ষেত্রে নিবন্ধিত থাকে সবার। যেমন, এ সারটিফিকেট থেকেই আমি জানতাম আমার জন্মতারিখ ১৩ই জুলাই। কিন্তু অনেক পরে বাবার এক পুরনো ডায়েরি পড়ে জানতে পারি- মাতৃগর্ভ থেকে আমার ভূমিষ্ঠ হওয়ার তারিখটি আসলে ১৪ই এপ্রিল। তবে সন ঠিকই আছে। অর্থাৎ আমার যে শুভানুধ্যায়ী এ কাজটি করে দিয়েছেন তিনি খুব বেশি কমাতে পারেননি আমার বয়স। মাত্র তিন মাস। এ ভুল সংশোধনের কথা আমি ভেবেছি, কিন্তু তত দিনে দেরি হয়ে গেছে অনেক। এখন সংশোধন করতে গেলে বহু কাঠখড় পোড়াতে হবে, বহু হুড়হাঙ্গামা হ্যাপা-ও সইতে হবে।
সারটিফিকেটের তারিখ ছাড়াও সমস্যা আছে ‘বাংলা তারিখ’ অর্থাৎ বঙ্গাব্দের তারিখ নিয়ে। ১৯৬৬ সালে প্রণীত ‘শহীদুল্লাহ বর্ষপঞ্জি’ ১৯৮৮ সাল থেকে চালু হওয়ার পর এ সমস্যা কেটে গেছে অনেকখানি। যেমন, বাংলা পঞ্জিকার হিসাবে আমার জন্মতারিখ ১লা বৈশাখ। খ্রিস্টাব্দের ক্যালেনডার অনুযায়ী সেদিন ছিল ১৪ই এপ্রিল। কিন্তু কোন কোন বছর তা ১৩ই বা ১৫ই এপ্রিলও হতো। এ কারণে বঙ্গাব্দের তারিখ থেকে খ্রিস্টাব্দের তারিখ মেলাতে গিয়ে তৈরি হতো আরও একটি জন্মতারিখ। ‘শহীদুল্লাহ বর্ষপঞ্জি’তে দুই অব্দের সমন্বয় ঘটায় এ সমস্যা আর নেই ১৯৮৮ থেকে। তবে এর আগে জন্মগ্রহণকারীদের মধ্যে থেকেই যাবে সমস্যাটি। ব্যতিক্রম আছে অবশ্য। যেমন, ‘শহীদুল্লাহ বর্ষপঞ্জি’তে ১লা বৈশাখকে ১৪ই এপ্রিল ধরে নেয়া হয়েছে। এতে আমার মতো যাঁদের জন্ম ১লা বৈশাখ ১৪ই এপ্রিলে হয়েছে তাঁদের সমস্যা থাকছে না আর। কিন্তু যে বছর ১লা বৈশাখ ছিল ১৩ই বা ১৫ই এপ্রিল, সে বছরে যাদের জন্ম- তাঁদের জন্য বাড়তি একটি তারিখের সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। এছাড়া বহু প্রচলিত লোকনাথ পঞ্জিকা ঐতিহ্যিক বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করে চলায় এ সমস্যার আর অবসান হচ্ছে না সহসা।
এ তো গেল জন্মদিন-জন্ম তারিখ নিয়ে এক সমস্যার দিক। এবার বলি এ দিন উপলক্ষে অনুষ্ঠান-উৎসব আয়োজনের কথা। আমার শৈশবে তা দেখেছি বিভিন্ন ধর্মের মহাপুরুষদের আবির্ভাব উপলক্ষে আয়োজিত হতে। সরকারি ছুটি থাকে ঈদ-ই-মিলাদুন্নবি, বড়দিন, জন্মাষ্টমী, বুদ্ধপূর্ণিমা উপলক্ষে। তারপর ছিল রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল জয়ন্তি। মাঝখানে কয়েক বছর সমাজতন্ত্র ছাড়া গীত ছিল না, তখন যুক্ত হয়েছিল সুকান্তের জন্মদিন। এক সময় সারা দেশে এক সঙ্গে পালিত হতো রবীন্দ্র নজরুল সুকান্ত জয়ন্তি। আশির দশক থেকে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে “শুভ জন্মদিন” কলাম। সূচনা হয়েছিল রাশিচক্র-চর্চা ও অ্যালবাম থেকে। এরপর শুরু হয় কবি-সাহিত্যিকদের জন্মদিন পালনের অনুষ্ঠান। এ ব্যাপারে পথিকৃৎ হিসেবে কৃতিত্ব পাবেন কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন। পরে সাংবাদিক, শিক্ষক, শিল্পী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিকদের মধ্যে এ সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে ক্রমে। এর পেছনে ছিল কার্ড ব্যবসায়ী, উপহার সামগ্রী বিক্রেতাসহ বিভিন্ন প্রকাশক-প্রচারক মহলের বিশেষ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য। এ ক্ষেত্রে মিডিয়াও নিয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সেই প্রীতি-অনুষ্ঠান কিভাবে স্থান করে নিয়েছে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। এরপর এক ইস্যু-ও হয়ে উঠেছে এখন।
১৫ই আগস্টে দেশে-বিদেশে জন্ম নিয়েছেন অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি। তবে দেশের কথাই বলি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে সবার আগে যে শিক্ষক গভীর স্নেহের আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়েছিলেন আমাকে- সেই স্যার, কবি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের জন্ম ১৯৩৬ সালের এ তারিখে। গভীর বেদনার সঙ্গে এই মুহূর্তে স্মরণ করছি- দু’বছর আগে, ২০০৮ সালের ২রা সেপ্টেম্বর আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন তিনি।
পঁচাত্তরের শোকাবহ ঘটনার পর স্যার জন্মতারিখের প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলতেন সাধ্যমতো। কোন অনুষ্ঠান তো নয়ই, এমনকি প্রীতি-শুভেচ্ছাও নয়। কোন কোন ক্ষেত্রে দেখেছি তিনি ব্যবহার করেছেন বাংলা তারিখ।
সর্বজনশ্রদ্ধেয় কবি আবুল হোসেনের জন্ম ১৯২২ সালের এ দিনে। তাঁকে নিয়ে কোন অনুষ্ঠানের কথা শুনিনি এ দিনে। কয়েক বছর আগে একটি সচিত্র সংবাদ দেখেছিলাম-কোন এক ভক্ত ফুলের তোড়া নিয়ে তাঁর বাসায় গিয়ে জানিয়েছেন শুভেচ্ছা। এমন খবর পড়েছি ওই একবারই।
“লাল সালু” খ্যাত অমর কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র জন্ম ১৯২২ সালের ১৫ই আগস্ট। বিশিষ্ট লেখিকা ও শিক্ষাবিদ খোদেজা খাতুনের জন্মও ১৯১৭ সালের এ দিনে। ১৯৪৭ সালের এ দিনে জন্ম নিয়েছেন আলোচিত রাজনীতিক, সাবেক এমপি, আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ। তালিকা আরও বাড়ানো যায়। সকালে ফেসবুক-এ দেখেছি আমার তিন বন্ধুর জন্মদিনের খবর ও প্রীতি-শুভেচ্ছা বিনিময়।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আবুল হোসেন ও মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্ব-স্ব ভুবনে কীর্তিধন্য ব্যক্তিত্ব। আমাদের উপলক্ষ-সুখী সাময়িকী সম্পাদকেরা তাদের উপেক্ষা করলেও এদেশের কবিতা ও কথাশিল্পে তারা অক্ষয় অবস্থানে সমুজ্জ্বল। তাদের জন্মদিনও গর্বের সঙ্গে স্মরণীয় ও বরণীয়। কিন্তু সে অনুষ্ঠানের অভাবে তারা কেউ মহিমাচ্যুত হবেন না কোন দিন।
১৫ই আগস্টের মর্মান্তিকতা এত গভীর যে আমাদের দেশ, জাতি ও ইতিহাসের অন্তরমূলে তা হয়ে উঠেছে এক অক্ষয় শোকস্তব্ধতা। এ দিনে ঘটা করে বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালনে অনেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য খুঁজে পান, অনেকে দেখতে পান রুচির অভাব। আমি বলি, এখানে শুভ জন্মদিনের সেই শুভতা কোথায়? একজন বরেণ্য মানুষের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে না পারলে আরেক জন কি সম্মান পেয়ে বরেণ্য থাকবেন? আমি আরও মনে করি, জন্মদিন পালনের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে কবি-লেখকদের, দেশ জাতি জনগণের জন্য আরও অনেক গুরুতর দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে রাজনীতিবিদদের। [১৫.০৮.২০১০]

 
< পূর্বে   পরে >




 

সর্বশেষ খবর