‘বড় বড় কথা বাদ দিয়ে এখনকার নির্মাতাদের ভাল ছবি নির্মাণ করতে হবে’

মোহাম্মদ আওলাদ হোসেন | ২০১৫-০৬-০১ ৮:৩৫
এখনকার তরুণ প্রজন্ম, যারা সিনেমা নির্মাণ করছেন তাদেরকে বড় বড় কথা বাদ দিয়ে ভাল ছবি নির্মাণ করতে হবে। দর্শক যে ধরনের সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে বসে দেখেন সে ধরনের বিনোদনমূলক সিনেমা নির্মাণের মাধ্যমে চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে। সেই সঙ্গে নিজেদেরও গড়ে তুলতে হবে। কথাগুলো ঢাকার সিনেমার গ্রামীণ চরিত্রের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক ফারুকের। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা কথায় কথায় চলচ্চিত্র শিল্পের চেহারা পাল্টে দেয়ার কথা বলেন, পরিবর্তনের কথা বলেন। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে বদলে দেয়া কিংবা পরিবর্তন করা এত সহজ কাজ নয়। আমাদের রক্ত ঘামে গড়া যে চলচ্চিত্র গৌরবময় ঐহিত্য ধারণ করে চলেছে, সোনালী অধ্যায় বলে পরিচিত, সেই চলচ্চিত্রের কি পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব সেটা আমার মাথায় আসে না। ফারুক বলেন, আমরা কথা একটু বেশি বলি, কাজ করি কম। আমাদের এখন কথা কম বলে বেশি বেশি কাজ করতে হবে। ভাল ভাল ছবি নির্মাণ করতে হবে। তিনি বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি বর্তমানে চলচ্চিত্রে বেশ গুরুত্ব বহন করে। এ প্রযুক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলেই বর্তমানের চলচ্চিত্র সমৃদ্ধ হবে এমন আশাবাদ আমারও। ফারুক বলেন, নতুন যারা সিনেমা বানাচ্ছেন, তাদের অনেকের সঙ্গেই আমার ভাল পরিচয় আছে। তারা যথেষ্ট মেধাবী এবং যোগ্যতাসম্পন্ন। ছবি নির্মাণে তাদের এই মেধা আর যোগ্যতাকে প্রকৃত অর্থে কাজে লাগাতে হবে। তাদের ছবি দিয়ে দর্শকদের মন জয় করতে হবে। আমার বিশ্বাস তারা একদিন পারবে। কারও কাছে তিনি ‘হিরো ফারুক’, কারও কাছে ‘মিঞা ভাই’। দর্শকদের কাছে প্রতিবাদী এক যুবক। নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘লাঠিয়াল’,
খান আতার ‘সুজন সখি’ এবং আমজাদ হোসেনের ‘নয়ন মনি’ দিয়েই প্রতিবাদী যুবক হিসেবে ফারুকের প্রতিষ্ঠা লাভ এবং গ্রামীণ চরিত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী অভিনেতার স্বীকৃতি। ১৯৭৫ সালে প্রণীত প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘লাঠিয়াল’ ছবিতে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার পাওয়ার মাধ্যমে সুঅভিনেতা হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অভিনেতা ফারুকের চলচ্চিত্রে আগমন ১৯৭১ সালে। প্রথম ছবি এইচ আকবরের ‘জলছবি’। বিপরীতে নায়িকা কবরী। ১৯৭১ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি মুক্তি পায় ছবিটি। সেই হিসেবে অভিনয় জীবনের ৪৫ বছর পূর্ণ করেছেন চলচ্চিত্রের অন্যতম জীবন্ত কিংবদন্তি ফারুক। এ সময়ে শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। এর মধ্যে অধিকাংশই সুপার-ডুপার হিট এবং প্রতিটি ছবিতেই পর্দায় দেখা গেছে জীবন্ত এক ফারুককে। গ্রামীণ চরিত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার পাশাপাশি শহুরে এমনকি অ্যাকশন ছবিতে ফারুক নিজেকে সফল একজন অভিনেতা হিসেবে প্রমাণ
করেছেন। প্রেমের ছবিতেও তিনি অনবদ্য। মুক্তিযুদ্ধের ছবি খান আতার ‘আবার তোরা মানুষ হ’ এবং নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘আলোর মিছিল’-এরও পরিপূর্ণ এক অভিনেতা ফারুক। কোথাও কোন কমতি নেই। এজে মিন্টুর ‘প্রতিজ্ঞা’ ছবিতেও দুর্দান্ত এক অ্যাকশন হিরো। আবার সাহিত্যনির্ভর ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘বিরাজ বউ’ এবং কল্পকাহিনী ‘বেহুলা লখিন্দর’-এর অনন্য এক অভিনেতা তিনি। সমসাময়িক নায়কদের তুলনায় কম ছবিতে অভিনয় করলেও বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করেছেন তাদের চেয়ে বেশি। অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের নেতৃত্বেও সফলতার পরিচয় দিয়েছেন
তিনি। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিবেশক সমিতির সভাপতি হিসেবে চলচ্চিত্র ব্যবসার উন্নতিতে দারুণ ভূমিকা রেখেছেন। আর মানুষ হিসেবে সবার কাছেই প্রিয় পাত্র। শিল্পী হিসেবে শ্রদ্ধেয়। কাজের বেলায় তার নিষ্ঠা, মনোযোগ এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস সব শিল্পীর জন্য অনুকরণীয়। কালিগঞ্জের ছেলে ফারুকের পুরো নাম আকবর হোসেন পাঠান। জন্ম ১৮ই আগস্ট। সিংহ রাশির জাতক ফারুক। তার অভিনীত অসংখ্য ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘সুজন সখি’, ‘নয়নমনি’, সূর্যগ্রহণ’, ‘সারেং বউ’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘নদের চাঁদ’, ‘সূর্যসংগ্রাম’, ‘প্রিয় বান্ধবী’, ‘নাগর দোলা’, ‘সখি তুমি কার’, ‘কথা দিলাম’, ‘প্রতিজ্ঞা’, ‘জনতা এক্সপ্রেস’, ‘তাসের ঘর’, লাল কাজল’, ‘তৃষ্ণা’, আরশিনগর’, ‘এতিম’, ‘সাহেব’, ঝিনুক মালা’, ‘সোনার তরী’, ‘বেহুলা লখিন্দর’, বিরাজ বৌ’, ‘মিয়া ভাই’, ‘লটারী’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘বন্ধু আমার’, ‘চিৎকার’, ‘জীবন সংসার’, ‘পৃথিবী তোমার আমার’, ‘এখনো অনেক রাত’, ‘কোটি টাকার কাবিন’ ইত্যাদি। অভিনয়নের পাশাপাশি ফারুক চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করেছেন। তার একটি প্রোডাকশন থেকে নির্মিত হয়েছে ‘সুখের সংসার’, ‘তাসের ঘর’, ‘ইজ্জত’, ‘মান অভিমান’, ‘সাহেব’, ‘সুদ আসল’, কর্তব্য’, ‘মিয়া ভাই’সহ অনেক ছবি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পী যাদের কল্যাণে সমৃদ্ধ হয়েছে, যাদের অভিনয় নৈপুণ্যে সোনালি একটি যুগের অধিকারী হতে পেরেছে, তাদের মধ্যে ফারুক একজন। বর্তমানে অভিনয় থেকে দূরে তিনি। ব্যস্ত ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে। তবে অভিনয় করতে চান, কিন্তু পারেন না ভাল গল্পের অভাবের কারণে। বললেন, কোন ছবিতে অভিনয় করব। কার পরিচালনায়। কে আমাদের অভিনয়ের জন্য নির্দেশনা দেবেন? কোথায় একজন খান আতা, নারায়ণ ঘোষ মিতা, কাজী জহির। চাষী নজরুল ইসলামও তো চলে গেলেন। যারা আছেন তাদের মধ্যে সিনিয়ার দুজন আমজাদ হোসেন ও আজিজুর রহমান সিনেমা বানান না। এদের পরেও যারা আমাদের নিয়ে ছবি বানিয়েছেন তারাও তো এখন পরিচালনার বাইরে। তাহলে অভিনয় করব কিভাবে? ফারুক বলেন, দেশে তো অবশ্যই, বিদেশে গেলেও আমাকে শুনতে হয় অভিনয় করেন না কেন? তখন কষ্ট হয়। বলতে পারি না, কার ছবিতে অভিনয় করব? কে আমাদের নিয়ে ছবি বানাবেন?