গুপ্তচর কাকন বিবি

মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী, দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) থেকে | ২০১৪-১২-১৩ ৮:১৬
কাকন বিবি পাহাড়ি খাসিয়া নারী। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও তিনবেলা অন্ন আর ন্যূনতম জীবনযাপনের ভাগ্য হয়নি তার। খেয়ে না খেয়ে অর্ধাহারে পরিণত বয়সে উপনীত হয়ে নানাবিধ রোগবালাই নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে এখনও শান্তিতে নেই ওই বীরাঙ্গনা। স্থানীয়ভাবে নানা ষড়যন্ত্রের রোষানলে পড়ে এখনও লাঞ্ছিত হওয়ার ভয়ে আঁতকে ওঠেন তিনি। জীবনের এই শেষ মুহূর্তে এসে ধন নয়, সম্পদ নয়, জীবনের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চান তিনি। খাসিয়া সমপ্রদায়ের নারী কাকন বিবির বাড়ি ছিল ভারতের খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে। ১৯৭০ সালে তার বিয়ে হয় দিরাই উপজেলার জনৈক শহিদ আলীর সঙ্গে। তখন তার নাম হয় নুরজাহান বেগম। ১৯৭১ সালের ১৬ই মার্চ কন্যা সন্তানের জন্ম দেন কাকন বিবি। কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ার কারণে স্বামী শহিদ আলীর সঙ্গে তার মনোমালিন্য দেখা দেয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে মৌখিক ছাড়াছাড়ি হয়। পরবর্তীতে এপ্রিল মাসে ইপিআর সৈনিক মজিদ খানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। মজিদ খান তখন সিলেট ইপিআর ক্যাম্পে চাকরিরত ছিলেন। স্বামীর সঙ্গে ২ মাস সিলেটে থাকার পর কাকন বিবি তার মেয়ে সখিনাকে আনতে যান। মেয়েকে নিয়ে সিলেট আসার পর স্বামী মজিদ খানকে আর খুঁজে পাননি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন তার স্বামীকে দোয়ারাবাজার সীমান্ত এলাকার কোনও এক ক্যাম্পে বদলি করা হয়েছে। স্বামীর খোঁজে তিনি সিলেট থেকে দোয়ারাবাজার সীমান্তে যান। তখন ছিল জুন মাস। যুদ্ধ চলছিল। শিশুকন্যা সখিনাকে সীমান্তবর্তী ঝিরাগাঁও গ্রামে জনৈক শাহিদ আলীর আশ্রয়ে রেখে দোয়ারাবাজারের টেংরাটিলা ক্যাম্পে তিনি স্বামীকে খুঁজতে যান। কিন্তু পাননি। তখন পাকবাহিনী তাকে আটক করে বাঙ্কারে নিয়ে যায়। বাঙ্কারে রেখে তাকে কয়েকদিন নির্যাতনের পর ছেড়ে দেয়। নির্যাতিতা কাকন বিবি এরপর স্বামীর আশা বাদ দিয়ে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠেন। জুলাই মাসে তিনি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন দেখা হয় মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর সঙ্গে। রহমত আলী তাকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর শওকতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। মীর শওকত তাকে গুপ্তচরের দায়িত্ব দেন। কাকন বিবি সাহসিকতার সঙ্গে গুপ্তচরের কাজ করতে থাকেন। গুপ্তচরের কাজ করতে গিয়ে পশ্চিম বাংলাবাজারে তিনি পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তারা তাকে একনাগাড়ে ৭ দিন নির্যাতন চালায়। পরে তাকে অজ্ঞান অবস্থায় মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায়। সাতদিন পর তার জ্ঞান ফিরে এলে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে বালাটে নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। চিকিৎসা শেষে পুনরায় তিনি বাংলাবাজারে আসেন। সেখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর কাছে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নেন। রহমত আলীর দলের সদস্য হয়ে অস্ত্র সহকারে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে টেংরাটিলায় পাকসেনাদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে করেন তিনি। সেই যুদ্ধে কয়েকটি গুলি তার শরীরে বিদ্ধ হয়। উরুতে কয়েকটি গুলির ক্ষতদাগ এখনও আছে। টেংরাটিলা যুদ্ধের পর আমবাড়ি, বাংলাবাজার, টেবলাই, বালিউরা, মহব্বতপুর, বেতুরা, দুর্বিনটিলা, আধারটিলাসহ প্রায় ৯টি স্থানে তিনি অস্ত্রসহকারে যুদ্ধ করেন। আমবাড়ি বাজার যুদ্ধে তার পায়ে গুলি লাগে। সেই গুলির চিহ্ন আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। নভেম্বর মাসের শেষদিকে তিনি রহমত আলীসহ আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে জাউয়া ব্রিজ অপারেশনে যান। ব্রিজ অপারেশনে তারা সফল হন। এভাবেই যুদ্ধে যুদ্ধে দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কাকন বিবি দোয়ারা বাজার উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ঝিরাগাঁও গ্রামে জনৈক এক ব্যক্তির কুঁড়েঘরের বারান্দায় মেয়ে সখিনাসহ আশ্রয় নেন। ’৭১-এর এই যোদ্ধা স্বাধীনতার পর লোকচক্ষুর আড়ালে ছিলেন বহুদিন।