১৭ শতকের নবরত্ন মন্দির

রাজু আহমেদ সাহান, উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) থেকে | ২০১৪-১০-২৩ ৮:৩৫
নবরত্ন মন্দির। ১৭ শতকে এটি নির্মিত হয়েছিল। অনেকে বলেন, এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন রামানাথ ভাদুড়ী নামে এক ব্যক্তি। সম্ভবত ১৬৬৪ সালের দিকে। আর এটি নির্মাণ করা হয়েছিল দিনাজপুরের কান্তজী মন্দিরের অনুকরণে। এই মন্দিরের ৫০ মিটার দূরে রয়েছে শিবমন্দির এবং পূজা অর্চনার জন্য আরও একটি মন্দির। এসব মন্দিরের নির্মাণশৈলী এবং ভিতর বাইরের কারুকার্য সবাইকে মুগ্ধ করে। তিনশ’ বছরের পুরনো এই স্থাপত্য এখন অবহেলায় পড়ে আছে। অনেকটাই পোকা মাকড়ের রাজত্ব এখানে। মুসলিম শাসনামলের হিন্দু স্থাপত্যের প্রাচীন এই পুরাকীর্তিটি জেলা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে মন্দিরে যাতায়াতের জন্য মহাসড়ক থেকে ১ কিলোমিটার রাস্তা এখনও কাঁচা। দেশী-বিদেশী পর্যটকদের জন্য এখানে কোন খাবার হোটেল ও রাতযাপনের সুব্যবস্থা নেই। মন্দিরটি শোভাবর্ধনের জন্য নেই কোন ফুলের বাগান, নেই নিরাপত্তা প্রাচীর। তাই এ পুরাকীর্তিটি সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করলে হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম একটি পর্যটন কেন্দ্র। উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দিরটি অবস্থিত অজপাড়াগায়ে সবুজ গাছগাছালি বেষ্টিত শান্ত সুনিবিড় পরিবেশে অবস্থিত। অনেকে বলেন, সে সময়ে এই গ্রামের রমানাথ ভাদুরী নামের এক ব্যক্তি নবাব মুর্শিদকুলি খানের অধীনে মুর্শিদাবাদে নায়েবের চাকরিতে নিযুক্ত ছিলেন। তিনিই এটি নির্মাণ করেন। তিনি ছিলেন হাটিকুমরুল গ্রামের একজন বাসিন্দা। সে সময়ে নবারের কোষাগারে রাজস্ব প্রদানের অনিয়মের জন্য নবাব মুর্শিদকুলি খান দিনাজপুরের মহারাজা সুখদেবকে বন্দি করে মুর্শিদাবাদে নিয়ে যাওয়ার জন্য নায়েবে দেওয়ান রামানাথ ভাদুরিকে দিনাজপুরে পাঠান। এ সংবাদে মহারাজা সুখদেব ভীত হয়ে ওঠেন। কারণ তিনি জানতেন, রাজস্ব আদায়ে অনিয়মের জন্য মুর্শিদকুলি খান জমিদারের প্রজা এমনকি রাজা-মহারাজা কেউ অবাধ্য হলে তাদেরকে ‘বৈকণ্ঠে’ বাসে বাধ্য করতেন। বৈকণ্ঠ বাস হলো সে সময়ের এক নির্মম মানসিক নির্যাতনের পদ্ধতি। মহারাজা সুখদেব বৈকণ্ঠ বাসের ভয়ে নায়েবে দেওয়ান রামানাথকে লক্ষাধিক টাকা উপহার প্রদান করেন। সেই টাকায় রামানাথ ভাদুরী তার নিজ গ্রাম হাটিকুমরুলে দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দিরের অনুকরণে একটি মন্দির নির্মাণ করেন তার নামকরণ করেন ‘নবরত্ন মন্দির’।  তিনতলা মন্দিরের মূলত চূড়া ছিল নয়টি। পোড়ামাটি দিয়ে লতাপাতা ফলমূল এবং দেবদেবীর চিত্র ফলক খচিত এই নয়টি চূড়াবিশিষ্ট মন্দিরের নামকরণ করা হয় ‘নবরত্ন মন্দির’। বর্গাকার এই মন্দিরের আয়তন ১৫ দশমিক ৪ মিটার। অর্থাৎ চারদিকে ইট-সুরকির গাঁথুনির পুরু দেয়াল। মন্দিরের মূল স্তম্ভের ওপরে পোড়ামাটির সুশোভিত চিত্রফলক। ফুল-ফল, লতা-পাতা, আর দেব-দেবীদের মূর্তি খচিত এই ফলক মধ্যযুগীয় শিল্পকর্মে পরিপূর্ণ ছিল। শুধু ফলক নয়, পাতলা ইটের সুরকির গাঁথুনির দেয়ালে মধ্যযুগীয় স্পর্শের ছোঁয়া স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মন্দিরের প্রবেশপথ পূর্বদিকে, কুঠুরির উত্তরে ওপরে ওঠার সিঁড়ি। ভিতর থেকে মূল ভবনের উপরের ছাদ গোলাকার গম্বুজে আচ্ছাদিত। মন্দিরের কেন্দ্রীয় কক্ষ বা উপাসনালয় কক্ষের ঠিক ওপরে একই আকৃতির আরও একটি কক্ষ আছে এবং এই কক্ষের চারদিকে বারান্দা রয়েছে। এটা আকারে অপেক্ষাকৃত ছোট এবং ওপরে গম্বুজ আকৃতির আরও একটি ছাদ রয়েছে। মন্দিরের পাশেই রয়েছে একটি পুকুর। এই পুকুরটি ঘিরে রয়েছে নানা জনশ্রুতি। কেউ কেউ বলেন, এখানে দেব-দেবীর আস্তানা রয়েছে। আবার কেউ বলেন, জমিদারের গুপ্তধন লুকানো রয়েছে সেখানে। কালের বির্বতনে নবরত্ন মন্দিরের অনেক কিছুই এখন ধ্বংসপ্রায়। গত ৫ বছরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মন্দিরের নিচের তলায় ৪টি স্তরের মধ্যে ৩টি স্তর ধসে পড়েছে। খসে পড়ছে দেয়াল। নওগাঁ থেকে আসা দর্শনার্থী সুমন, পরিমল, জসিম ও নিতিশ সরকার, বগুড়া থেকে আসা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী সোমা ঘোষ, তমা রায়, তুশিন ও তাশিন জানান, উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ‘নবরত্ন মন্দির’। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটি সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। এদিকে মন্দিরের পাশে রয়েছে আরও ৩টি ছোট মন্দির। এগুলোও একই সময়ে নির্মাণ করা। এর মধ্যে একটি শিব, একটি দোচালা চণ্ডি মন্দির ও অপরটি শিব-পার্বতী মন্দির। নানা নকশায় ও কারুকার্যে তৈরি করা এসব মন্দির সংস্কারের অভাবে নষ্ট হতে বসেছে। স্থানীয় কালীমন্দির ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি শংকর কুমার দাশ জানান, আমরা ছোটবেলায় দেখেছি এখানে নিয়মিত পূজা-পার্বণ আর বাৎসরিক মেলা বসতো। কিন্তু এখন আর তা হয় না। আরাধনার জন্য নবরত্ন মন্দিরে নেই কোন দেবতা। ফলে হিন্দু সমপ্রদায় দিন দিন এ মন্দিরের প্রতি আকর্ষণ হারাতে বসেছে। সুতরাং মন্দিরে চালু করতে হবে অতীতের মতো সব কর্মকাণ্ড। তবেই আকৃষ্ট হবে পর্যটকরা। ১৭শ’ শতাব্দীর মধ্যযুগে নির্মিত এ মন্দিরের শিল্পকর্ম এবং মুসলিম শাসনামলে হিন্দু স্থাপত্যের এ নির্মাণশৈলী দেখার জন্য এখনও দেশী-বিদেশী বহু পর্যটক প্রতিদিন এ এলাকায় ভিড় জমায়। ঢাকা থেকে সড়ক পথে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু পার হয়ে পশ্চিম সংযোগ সড়কের অদূরে সিরাজগঞ্জ চৌরাস্তা মোড় বা রোড নামক স্থানে নামতে হবে। সিরাজগঞ্জ রোড থেকে ৩ কিলোমিটার উত্তরে হাটিকুমরুল। এরপর মেঠোপথ ধরে পূর্বদিকে এক কিলোমিটার পেরোলেই হাটিকুমরুল নবমন্দির।